নারী

নিলার অহংকার, পর্ব ২

নিলার অহংকার, পর্ব ২

বিষয়: আমার কোরআন আমার অহংকার !

(ক)

রফিকুল ইসলাম স্যারের ইংরেজী লেকচার শেষে ক্যাম্পাসের নিচে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে আর বার বার সাথী আপুর পথের দিকে তাঁকাচ্ছে তুলি ৷ কি যে হলো, এখনো আসছে না ৷

সাথী মূলত দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ৷ সেও ইংরেজী ডিপার্টমেন্টের ছাত্রী ৷ কাল মার্ক্সের মত কিছু লোকের দর্শন পড়ে এখন কোরআনকে সে হেও জ্ঞান করে ৷ তবে সে তুলির কোন আপন বোন নয় ৷ তুলি এখানে আসার পরে সাথীর কাছ থেকেই সংশয়বাদীতার সবরকম উপকরণ পেয়েছে ৷ সে যখন তুলির মুখ থেকে নিলার সাথে হিজাব নিয়ে কথপোকথনের ব্যাপারটি জানতে পারল তখন সে নিজেই নিলার সাথে কথা বলার পরিকল্পনা করল ৷

অপেক্ষার পালা শেষ করে অবশেষে সাথী এলো ! তুলিকে জিজ্ঞেস করল, কিরে নিলা কোথায় !

—সে তো আজ আসেনি

—কেন ! তার সাথে আমার কথা বলতে চাওয়ার ব্যাপারটি কি সে জানে

—আরে না আপু ! তা কিভাবে জানবে ! আর তাছাড়া ও কারও কথাকে ভয় পেয়ে ক্লাস মিস করার মেয়ে নয়, অন্তত এই এক বছরে আমি এমনটি দেখিনি !

—তাহলে এক কাজ কর !

—ওদের বাড়ি চিনিস !

—হ্যাঁ !

—তোর যদি কাজ না থাকে চল ওদের বাসায় যাই ৷

—ঠিকাছে চলো !

(খ)

ক্রিং ক্রিং ! ক্রিং ক্রিং !

—কে?

খিল ঘুরিয়ে দরজা খুলল নিলার মা

—আরে তুলি তুমি ! এসো এসো ঘরে এসো ৷ বসো !

এই বলে নিলার মা ও তারা দুজন দু পাশ থেকে মুখোমুখি হয়ে সোফায় বসল !

—কিন্তু মা! তোমাকে তো চিনলাম না !

—আমি সাথী ৷ নিলার সিনিয়র ব্যাঁচের ছাত্রী ! নিলা আমাকে আপু বলেই ডাকে !

—কি নিয়ে পড় মা !

—চাচী আমিও ইংরেজী ডিপার্টমেন্টের ছাত্রী ৷

—ঠিকাছে ! তোমরা বসো ! আমি নিলাকে ডাক দিচ্ছি !

(গ)

পুনরায় আপাদমস্তক ঢাকা অবস্হায় নিলা হাজির ৷ এখন কেবল মুখটা খোলা ৷

সাথী তাঁকে দেখে নাঁক সিঁটকাচ্ছে ৷— ঊম়…হ ! যেমন মা তেমন তার মেয়ে ৷ কিন্তু মুখে কিছুই বলল না সাথী ৷ কেন যেন বলতে গিয়েও বলতে চাইল না ৷

কুশল বিনিময়ের কিছুক্ষণ পর কথা শুরু হলো ৷

সাথী বলল, আচ্ছা নিলা তোরা তো বলিস কোরআন নারীকে অনেক মর্যাদা দেয় !

—জী আপু ! তুমি ঠিক শুনেছ !

—তাহলে কোরআন নারীকে শস্যক্ষেত্র বলে কিভাবে আখ্যায়িত করতে পারে? এটা কি সম্মামহানিকর নয় ?

—আপু ! তোমাকে বুঝতে হবে শস্যক্ষেত্র নিছক কোন ভক্ষণশীল সম্পত্তি নয় বরং তা হচ্ছে কৃষকের কাছে সাঁত রাজার ধনের মত তথা অমূল্য সম্পদ ৷ ঠিক তেমনি একজন পূন্যবতী স্ত্রী একজন পুরুষের জন্য অমূল্য সম্পদ যেমন আমাদের নবী বলেছেন,

الدنيا متاع – وخير متاعها المرأة الصالحة –

“দুনিয়ার সবকিছুই মূল্যবান সম্পদ ৷ তবে দুনিয়ার অমূল্য সম্পদ হচ্ছে পূণ্যবতী নারী ৷”(১)

কৃষক ও শস্যক্ষেত্র পরস্পরের পরিপূরক ৷ ঠিক তেমনিভাবেই স্বামী ও স্ত্রী পোষাকের মতই একে অন্যের পরিপূরক ৷ যেমন মহান মহান আল্লাহ বলেন—

هن لباس لكم وانتم لباس لهن –

“তাঁরা (স্ত্রীরা ) তোমাদের পোষাক এবং তোমরা তাঁদের পোষাক ৷”(সূরা বাক্বারাহ ২:১৮৭)

কৃষকের দায়িত্ব হলো সে শস্যক্ষেত্রের যাবতীয় খরচ, প্রতিরক্ষা ইত্যাদির ব্যবস্হা করবে ৷ ঠিক একইভাবে নারীর প্রতি পুরুষের দায়িত্ব হলো সে তাঁর ভরণ পোষণের দায়িত্ব নেবে, তাঁর সুরক্ষা ও প্রতিরক্ষার ব্যাপারটি খেয়াল রাখবে, তাঁকে পরিচালনা করবে ৷ এ ব্যাপারটিই বোঝানো হয়েছে এইভাবে

الرجال قومون علي النساء بما فضل الله بعضهم علي بعض وبما انفقوا من امولهم-

“পুরুষ নারীর কর্তা, সংরক্ষক ও প্রতিপালনকারী

৷(২) কারণ আল্লাহ তাদের মধ্যে একের উপর অন্যকে বৈশিষ্ট্য দান করেছেন এবং তাঁরা তাঁদের সম্পদ থেকে ব্যায় করে ৷” (সূরা নিসা ৪:৩৪)

সবশেষে শস্যক্ষেত্র হলো কৃষকের কাছে তাঁর পরম সাধনার ধন ,তাঁর ভবিষ্যতের একমাত্র সম্বল ৷ ঠিক একইভাবে নারীর মাধ্যমে আসা সন্তান-সন্ততি তাঁর ভবিষ্যতের সম্বল ৷ এভাবে পুরো ব্যাপারটি বোঝানো হয়েছে এইভাবে –

تساؤكم حرث لكم – فاتوا حرثكم اني شئتم – وقدموا لانفسكم – واتقوا الله واعلموا انكم ملقوه – وبشر المؤمنين ٥

“তোমাদের স্ত্রীরা তোমাদের জন্য শস্যক্ষেত্র ৷ তোমাদের শস্যক্ষেত্রের কাছে তোমরা যেভাবে ইচ্ছা গমন কর ৷ আর নিজেদের জন্য পাথেয় জোগার কর ৷ আর আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রাখ যে আল্লাহর সাথে তোমাদেরকে সাক্ষাৎ করতেই হবে ৷ আর মুমিনদেরকে অর সুসংবাদ দাও ৷ “(সূরা বাক্বারাহ -২:২২৩)

দেখেছ আপু কত সুন্দর, কত ভাবগাম্ভির্যপূর্ণ ও মনোমুগ্ধকর,কতই না মর্যাদা ও ইনসাফপূর্ণ এই আবেদন !

জানো কি ! কোরআনই একমাত্র সে গ্রণ্থ যা সন্তানের জন্য মায়ের অবদানকে অত্যন্ত সম্মানসূচক ও অতুলনীয় মর্যাদার ভঙ্গীতে উল্লেখ করে ! (৩)

কোরআনই একমাত্র সে গ্রণ্থ যা ভাইয়ের প্রতি বোনের মমত্ববোধকে একটি সুন্দর, মমতামাখা ও ভালাবাসায় পরিপূর্ণ একটি ঘটনার মাধ্যমে উল্লেখ করে ৷ (৪)

জানো কি ! কোরআনই একমাত্র সে গ্রণ্থ যা স্বতী-স্বাধী নারীকে অপবাদ আরোপকারীকে অত্যন্ত কঠোর রাষ্ট্রীয় আইনে বিচার সাব্যস্ত করেছে ৷ (৫)

কোরআনই একমাত্র সে গ্রণ্হ যা অসন্তুষ্ট স্বামীকে তাঁর প্রতি স্ত্রীর পূর্ব অবদানের কথা স্মরণ করে শান্ত হতে বলে ৷ (৬)

যেখানে মানুষ নারীর রং রূপ নিয়ে কথা বলে মজা লুটে তাঁর পবিত্রতাকে অমর্যাদা করে সেখানে কোরআন নারীর পবিত্রতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব ও মর্যাদা স্বাপেক্ষে উল্লোখ করে ! এমনকি পুরুষকে তাঁর থেকে দৃষ্টি নামিয়ে চলতে বলে ! (৭)

কোরআনই একমাত্র সে গ্রণ্থ যা নারীকে উত্তরাধিকার সম্পত্তির মালিক বানিয়েছে এবং তাঁকে বিয়ে করতে গেলে সম্মানজনক মোহরানার ব্যবস্হা করেছে ৷ (৮)

জানো কি ! কোরআনই একমাত্র সেই গ্রণ্থ যা সেই ব্যাক্তিকে অত্যন্ত কঠোর ভঙ্গিতে তিরস্কার করে যে মেয়ে সন্তান জন্মনোতে অসন্তুষ্ট হয় ৷ (৯)

এছাড়াও আরও অনে…ক কিছু !

আমরা কোরআনকে ভালবাসি ৷ এই কোরআন আমাদের জীবন, আমাদের মরণ, আমাদের সবকিছু ৷ আর আমি একজন মুসলিমা হিসেবে একথা দ্বিধাহীনচিত্তে বুঁক ফুলিয়ে বলতে পারি, ‘আমার কোরআন আমার অহংকার ! আমার অলংকার !’

একথা বলতে বলতে নিলার চোখ দিয়ে পানি নেমে আসল ৷

সাথী বলল, ঠিকাছে নিলা ! আমি বুঝেছি ! আমি আজ তোর কাছ থেকে অনেক কিছু শিখলাম ৷ আজ থেকে আমিও ইসলামকে বুঝতে চেষ্টা করব ৷

এভাবে সময় বয়ে চলল ৷ তাদের আলোচনাও শেষ হয়ে এল ৷ এক পর্যায়ে সাথী ও তুলি উভয়ই বিদায় নিল ৷

তাঁরা চলে যাওয়ার পর নিলাকে তাঁর মা কাছে ডাকলেন ৷ অতঃপর অশ্রুশিক্ত চোখে তাঁর কপালে চুমু খেয়ে বললেন, ‘মা আমার ! আমি পর্দার আড়াল থেকে তোদের সব কথা শুনেছি ৷ দোয়া করি মা ! তুই অনেক বড় হ ! তোর মত নিলা যেন ঘরে ঘরে জন্ম নেয় !” অতঃপর নিলাও তখন অশ্রুশিক্ত চোখে তাঁর মাকে জঁড়িয়ে ধরল !

টীকা:

১৷ রিয়াদুস সালেহীন, হাদীস ২৮৫

২৷ দেখুন ইবনে কাসীর, সংশোধিত সংস্করণ, ড মুজিবুর রহমান অনূদিত, ৪র্থ-৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা ৩৪৩-৩৪৪ ৷ এছাড়াও দেখুন, সংক্ষিপ্ত তাফসীর, আবূ বকর মুহাম্মদ যাকারিয়া মাদানী, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ৪১৪, ২ ও ৩ নং টিকা ৷

৩৷ সূরা আহক্বাফ ৪৬:১৫

৪৷ সূরা কাসাস ২৮:১০-১১, সূরা তোহা ২০:৪০

৫৷ সূরা নূর ২৪:৪, ১১-১৮

৬৷ সূরা নিসা ৪:১৯

৭৷ সূরা নূর ২৪:৩০-৩১, সূরা আহযাব সূরা আহযাব ৩৩: ৩২,৩৩, ৫৩, সূরা মরিয়ম ১৯:১৬-১৮

৮৷ সূরা নিসা ৪:৪, ১১-১৩, ১৭৬

৯৷ সূরা নাহল ১৬:৫৮-৬০

বিশেষ কৃতজ্ঞতা: ডাবল স্ট্যান্ডার্ড – ডা শামসুল আরেফীন

আমার কোরআন আমার অহংকার/ মেরাজুল ইসলাম প্রিয়

মতামত দিন

Solve : *
26 − 10 =