শিরক

শিরক (اَلشِّرْكُ)

রচনায়: নাফি

আলহামদুলিল্লাহ্ ওয়াসসলাতু ওয়াসসালামু ‘আলা রসূলিল্লাহ্ (স:)

সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য এবং সলাত ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের নাবী মুহাম্মাদ (স:) এর উপর। অতঃপর শিরকের মত মহাপাপকাজ থেকে সতর্ক করার জন্য মুসলিম সমাজে সংঘটিত কয়েকটি শিরকী কার্যক্রমের বর্ণনা কুর’আন ও সহীহ হাদীসের আলোকে এই লিফলেটটিতে তুলে ধরা হলো। এতে কুর’আনের রেফারেন্স বুঝানোর জন্য সূরাহ্-সংখ্যা ও আয়াত-সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে, যেমন: [১২:১০৬] দ্বারা ১২ নং সূরাহ্ অর্থাৎ ‘সূরাহ্ ইউসুফ’ এর ১০৬ নং আয়াত বুঝানো হয়েছে।

শিরকের অর্থ: শাব্দিক অর্থে শিরক/শিরক (اَلشِّرْكُ) মানে অংশীদারিত্ব; কোন কিছুতে অংশীদার সাব্যস্ত করা। ইসলামের পরিভাষায় এর অর্থ আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সাথে কোন বিষয়ে (তাঁর রুবুবিয়্যাতের ক্ষেত্রে, তাঁর ইবাদাতের ক্ষেত্রে কিংবা তাঁর নাম ও গুণাবলীর ক্ষেত্রে) কোন অংশীদার বা সমকক্ষ স্থির করা।

শির্কের ব্যাপকতা: আমাদের সমাজে অনেকের ধারণা শির্ক বলতে শুধু মূর্তি পূজাকেই বুঝানো হয়। কিন্তু ঈমান আনার পাশাপাশি মানুষ তার কথা, চিন্তা ভাবনা, নিয়্যত বা কর্মের মাধ্যমে বিভিন্নভাবে প্রতিনিয়ত শির্ক করে যাচ্ছে। আল্লাহ্’র তাওহীদ সম্পর্কে সহীহ জ্ঞানের অভাব, প্রচলিত রীতি-নীতি রসম-রেওয়াজের অন্ধ অনুসরণ, তথাকথিত ওলী-বুযুর্গদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি শির্ক বিস্তারের কারণ। আল্লাহ্ বলেন: অধিকাংশ লোক আল্লাহ্’র প্রতি ঈমান আনা সত্ত্বেও মুশরিক। [১২:১০৬] আল্লাহ্ তা’আলা আরো বলেন: যারা ঈমান এনেছে এবং নিজ ঈমানকে যুলম (শির্ক) দিয়ে কলুষিত করেনি প্রকৃতপক্ষে তাদের জন্যই রয়েছে শান্তি-নিরাপত্তা এবং তারাই হচ্ছে হিদায়াতপ্রাপ্ত।[৬: ৮২]

আয়াতের মর্মার্থযাদের ঈমানের সঙ্গে শির্কের সামান্যটুকুও মিশ্রণ নেই তাদেরকেই শুধু হিদায়াত ও নিরাপত্তাপ্রাপ্ত বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

শির্কের প্রকারভেদ: শির্ক মূলত দু’প্রকার: বড় শির্ক (اَلشِّرْكُ الأَكْبَرُ) ও ছোট শির্ক (اَلشِّرْكُ الأَصْغَرُ)। ইবাদাত সমূহের যে কোন ইবাদাত আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো জন্য করা বড় শির্ক। বড় শির্ক যে কোন ব্যক্তিকে সাথে সাথেই ইসলামের গণ্ডী থেকে বের করে দেয়। আন্তরিক তাওবা (تَوْبَةً نَّصُوحًا: [৬৬:৮]) ছাড়া আল্লাহ্ তা’আলা এ ধরনের শির্ক কখনো ক্ষমা করবেন না। ছোট শির্ক বলতে এমন কাজ ও কথাকে বুঝানো হয় যাতে লিপ্ত ব্যক্তিকে ইসলামের গণ্ডী থেকে সম্পূর্ণরূপে বের করে দিবেনা বটে, তবে তা কবীরা গুনাহ্ তথা মহাপাপ এবং তা বলবৎ রাখলে বড় শির্কের দিকে নিয়ে যায়। ছোট শির্কের মধ্যে একটি বিশেষ প্রকার হচ্ছে ‘গুপ্ত শির্ক’ (الشرك الخفي) অর্থাৎ ইবাদাত প্রদর্শন করার ইচ্ছা বা ‘রিয়া’।

শির্ক করার শাস্তি: 

“নিশ্চয়ই শির্ক হলো বড় যুলম।” [সূরাহ লুকমান, আয়াত ১৩] শির্কের মাধ্যমে মানুষের সব সৎ আমল নষ্ট হয়ে যায়। [সূরাহ যুমার, আয়াত ৬৫] শির্কে লিপ্ত ব্যক্তির জন্য জান্নাত হারাম; জাহান্নামই হবে তার চিরস্থায়ী ঠিকানা।

কুর’আন থেকে দালীল: আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

‘‘নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তাঁর সাথে শরীক করা ক্ষমা করবেন না। তবে তিনি এটা ছাড়া অন্য সব (গুনাহ্) যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করবেন।’’ [৪:৪৮]

‘‘যে ব্যক্তি আল্লাহ্ তা’আলার সাথে কাউকে শরীক করে আল্লাহ্ তা’আলা তার উপর জান্নাতকে হারাম করে দেন এবং জাহান্নামকে করেন তার ঠিকানা। এরূপ অত্যাচারীদের জন্য তখন আর কোন সাহায্যকারী থাকবে না।’’ [৫:৭২]

হাদিস থেকে দালীল: রসূল (স:) বলেন, “যে ব্যক্তি এমতাবস্থায় মৃত্যু বরণ করলো যে, সে আল্লাহ্ তা’আলার সাথে কোন বস্তু বা ব্যক্তিকে শরীক করছে তাহলে সে নিশ্চিতভাবে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” [বুখারী ১২৩৮, ৪৪৯৭, ৬৬৮৩ মুসলিম ৯২]

কতিপয় শির্কের তালিকা: 

আহ্বান / ফরিয়াদের শির্ক: পুণ্যার্জন বা মানুষের নিজের সাধ্যের বাইরে কোন পার্থিব লাভের আশায় বা কোন পার্থিব ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার উদ্দেশ্যে আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়া অন্য কাউকে আহ্বান করা বা কারো কাছে দুআ করা শির্ক। গাছ, পাথর, বিভিন্ন ‘মাজারের’ কচ্ছপ, কুমির ইত্যাদি অক্ষমদের কাছে চাওয়া, মনের আবেদন বলা, তাদের বরকতময় মনে করাও শির্কের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন: তার চেয়ে অধিক বিভ্রান্ত কে, যে আল্লাহ্’র পরিবর্তে এমন কিছুকে ডাকে যা কিয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়া দিবে না? আর তাদের আহ্বান সম্পর্কেও তারা অবহিত নয়। [৪৬:৫]

জবাইয়ের শির্ক: একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়া অন্য কারোর নৈকট্য লাভের জন্য বা অন্য কারোর নামে (নাবী, ওলী, বুযুর্গ বা জিনের নামে) কোন পশু জবাই করা শির্ক। “আপনি বলুন: আমার সলাত, আমার কোরবানী এবং আমার জীবন ও মরণ বিশ্ব-প্রতিপালক আল্লাহ্র-ই জন্যে। তাঁর কোন অংশীদার নেই।” [৬:১৬২-১৬৩; দ্রষ্টব্য ৬:১২১]

মানতের শির্ক: একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়া অন্য কারোর জন্য বা অন্য কারোর নামে কোন কিছু মানত করা শির্ক। বর্তমান যুগে যারা তথাকথিত ওলী-বুযুর্গদের উদ্দেশ্যে বা তাদের কবরের জন্য মানত বা উৎসর্গ করে যাচ্ছে তাদের ও মক্কার মুশরিকদের মধ্যে সামান্যটুকুও পার্থক্য নেই। আল্লাহ্ মক্কার মুশরিকদের সম্পর্কে বলেন: “মুশরিকরা আল্লাহর দেয়া শস্য ও পশু সম্পদের একাংশ আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করে অতঃপর তাদের ধারণানুযায়ী বলে এ অংশ আল্লাহর জন্য আর এ অংশ আমাদের শরীকদের (তাদের ভ্রান্ত উপাস্যদের)।” [৬:১৩৬] কিন্তু মু’মিন শুধু মাত্র আল্লাহ’র উদ্দেশ্যে মানত করে:  দ্রষ্টব্য [৩:৩৫]।

আনুগত্যের শির্ক: শরীয়তের গ্রহণযোগ্য কোন দালীল ছাড়াই হালাল-হারাম, জায়েয-নাজায়েযের ব্যাপারে আলেম, বুযুর্গ, নেতা / উপরস্থ কারোর সিদ্ধান্ত/নীতি অন্ধভাবে সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেয়া শির্ক; যেমন: সুদ, ঘুষ, ব্যভিচার বা মদ জাতীয় হারাম বস্তুকে বিভিন্ন যুক্তি তর্ক দ্বারা হালাল করা, পুরুষ ও মহিলার ওয়ারিসি সম্পত্তির সমবন্টন কিংবা পর্দাহীনতার নীতি সমর্থন ও পালন এসবই আল্লাহর রুবুবিয়্যাতের ক্ষেত্রে শির্ক। আল্লাহ্ বলেন: “তারা আলিম ও ধর্ম যাজকদের রব হিসেবে গ্রহণ করেছে আল্লাহকে ছেড়ে এবং মারইয়ামের পুত্র মাসীহ্ (ঈসা) কেও।” [৯:৩১] অথচ “সকল সৃষ্টি আল্লাহ্র-ই এবং হুকুমের অধিকারীও একমাত্র তিনি।” [৭:৫৪; আরো দ্রষ্টব্য ১২:৪০]

তাওয়াক্কুল / ভরসার শির্ক: মানুষের অসাধ্য ব্যাপার সমূহ সমাধানে বা বিপদ-আপদে একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়া অন্য কারোর উপর ভরসা করা শির্ক। পীর ফকির কে সম্মান করে বা দেনেওয়ালা বিশ্বাস করে তার কাছে সন্তান, ব্যবসায় উন্নতি চাওয়া, তাকদীর ফেরানো, তাদেরকে মুশকিল আসানকারী মনে করা সবই শির্কের অন্তর্ভুক্ত। শির্কমুক্ত ঈমানের শর্ত হচ্ছে: “তোমরা একমাত্র আল্লাহ্’র উপরই ভরসা করো যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাকো।” [৫:২৩; দ্রষ্টব্য ৮:২]

শাফায়াত / সুপারিশের শির্ক: আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়া অন্য কারোর কাছে পরকালের সার্বিক মুক্তির জন্য কোন সুপারিশ কামনা করা শির্ক, যেমন: শাফায়াত লাভের আশায় পীর, হুজুর, ইমামদের কাছে মুরীদ হওয়া শির্ক। “সমস্ত সুপারিশ আল্লাহ্রই ক্ষমতাধীন।” [৩৯:৪৪; আরো দ্রষ্টব্য ২:২৫৫, ৬:৫১, ১০:৩, ১১:১০৫, ২০:১০৯, ২১:২৮, ৩২:৪, ৫৩:২৬, ৭৪:৪৮, ৭৮:৩৮] কিয়ামতের দিন রসূল (স:) এর সুপারিশ পাওয়ার ভাগ্য শুধু তাদের হবে যারা শির্কমুক্ত অবস্থায় ইন্তিকাল করবে। [বুখারী ৯৯ (ইল্’ম অধ্যায়), ৬৫৭০ (আর-রিক্বক), মুসলিম, ঈমান অধ্যায় ১৯৯ (দারুসসলাম ৪৯১), তিরমিযী: নং ২৪৪১, ৩৬০২]

ওসীলার শির্ক:  মৃত ব্যক্তির (এমনকি নাবী, রসূল, অলীদের) অসীলা দেওয়া বা মাধ্যম সাব্যস্ত করা শির্ক। “আল্লাহ্-কে বাদ দিয়ে তোমরা যাদেরকে ডাক, তারা সবাই তোমাদের মতই বান্দা।” [৭:১৯৪; দ্রষ্টব্য ১৭:৫৭]

কসমের শির্ক: আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর নামে কসম কাটা (যেমন: আমার মায়ের কসম, কুর’আনের কসম, নাবীর কসম) বা কুর’আন ছুয়ে শপথ করা শির্ক। “যে ব্যক্তি আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়া অন্য কোন ব্যক্তি বা বস্তুর কসম খাবে সে মুশরিক হয়ে যাবে।” [তিরমিযী ১৫৩৫; দ্রষ্টব্য বুখারী ২৬৭৯, ৬১০৮, ৬৬৫০]

ভক্তিভালবাসার শির্ক: সলাতে দাঁড়ানোর মত অন্যের সামনে বা স্মৃতি স্তম্ভ, স্মৃতি সৌধ, শহীদ-মিনার, শিখা-চিরন্তন বা শিখা-অনির্বাণের সামনে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা পেশ করা/নিরবতা পালন করা এ সবই শির্ক। “মানুষের মধ্যে অনেকেই এমন যে, তারা আল্লাহ্র সাথে অন্যান্যকে শরীক করে এবং তাদের প্রতি তেমনি ভালবাসা পোষণ করে যেমন ভালবাসা হয়ে থাকে আল্লাহ্র প্রতি।” [২:১৬৫] আল্লাহ্-কে ভালোবাসার নিদর্শন সমূহ: আল্লাহ্’র ইচ্ছাকে নিজ ইচ্ছার উপর প্রাধান্য দেয়া এবং সকল বিষয়ে আল্লাহ্’র বিধি-বিধান ও রসূল (স:) এর সুন্নাহ্ মেনে চলা [৯:২৪, ৩:৩১, ৪৮:২৯, ৫:৫৪, ৪:৫৯]। প্রসঙ্গত: উল্লেক্ষ্য “যে ব্যক্তি এ ব্যাপারে সন্তুষ্ট যে, মানুষ তার জন্য মূর্তির মত দাঁড়িয়ে থাকুক তাহলে সে যেন নিজ বাসস্থান জাহান্নামে বানিয়ে নেয়।” [তিরমিযী, কিতাবুল আদাব ২৭৫৫]

১০ ভয়ের শির্ক: একমাত্র আল্লাহ্ ছাড়া কেউ (যেমন: কোন মূর্তি, মৃত ‘কামেল’ ব্যক্তি, অদেখা কোন জিন, ‘জিন্দা পীর’ বা কবরে শায়িত পীর) অপ্রকাশ্যভাবে দুনিয়া বা আখিরাত সংক্রান্ত কোন ক্ষতি সংঘটন করতে পারে বলে অন্ধ বিশ্বাস করে তাকে ভয় পাওয়া শির্ক। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন: “নিশ্চয়ই এ শয়তান; যে সবসময় তোমাদেরকে নিজ বন্ধুদের ব্যাপারে ভয় দেখিয়ে থাকে। তোমরা ওদেরকে ভয় করোনা। শুধু আমাকেই ভয় করো যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাকো।” [৩:১৭৫] তেমনি ভাবে ইবাদতের ক্ষেত্রে অন্যকে ভয় বা লজ্জা করা শির্ক (মানুষ কি বলবে? যদি সলাত পড়ি তাহলে কি চাকুরী থাকবে? দাড়ি রাখলে তো অন্যেরা হাসে, পর্দা করলে মানুষ উপহাস করে); যেখানে আল্লাহ্ বলছেন: “তাদেরকে ভয় করোনা; শুধু আমাকেই ভয় করো।” [৫: ৩]

১১ হিদায়াতের শির্ক: আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়া অন্য কেউ কাউকে হিদায়াত দিতে পারে (বা নিয়ে নিতে পারে) এমন বিশ্বাস করা অথবা এ বিশ্বাসে কারোর নিকট হিদায়াত কামনা করা শির্ক। এমনকি আমাদের প্রিয় নাবী মুহাম্মাদ (স:) ও নিজ ইচ্ছায় কাউকে হিদায়াত দিতে পারেননি। আল্লাহ্ তা’আলা রসূল (স:) কে উদ্দেশ্য করে বলেন: “তাদেরকে সুপথে আনার দায়িত্ব তোমার উপর নেই, বরং আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত করেন।” [২:২৭২; দ্রষ্টব্য ২৮:৫৬]

কবর পূজার শির্ক: কবরে শায়িত তথাকথিত কোনো ওলী বা বুযুর্গের সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে বা এমনিতেই কবরের চারপাশে তাওয়াফ করা, বিনম্রভাবে কবরের সামনে দাঁড়ানো, কবরের মুরাকাবা করা, কবরবাসীর উদ্দেশ্যে আহ্বান/ফরিয়াদ, সাজদাহ, টাকা-শিন্নি দেয়া, ইসালে সওয়াব করা এসবই শির্ক। আশ্চর্য! কবরের মৃত ব্যক্তি নিজেরই কোনো উপকার করতে পারে না সে কিভাবে অন্যের সমস্যার/বিপদের সমাধান করবে? আল্লাহ্ তা’আলা বলেন: “তারা আল্লাহ্ ছাড়া অন্য যাদেরকে ডাকে তারা কিছুই সৃষ্টি করে না; বরং ওরা নিজেরাই সৃজিত। তারা প্রাণহীন, মৃত তাদের কোনই চেতনা নেই কবে পুনরুত্থিত হবে।” [১৬:২০-২১]

 খেয়ালখুশি তথা নফসেরঅনুসরণের শির্ক:  ‘যে তার খেয়াল-খুশীকে স্বীয় উপাস্য স্থির করেছে’ [৪৫:২৩], সে-ই এই শির্ক করছে।  এই শ্রেণীর উদাহরণ:

() সলাত ত্যাগের শির্ক: নিজের খেয়াল-খুশিকে প্রাধান্য দিয়ে ইচ্ছাকৃত/অলসতা বশত নিয়মিতভাবে দৈনন্দিনের ফরয সলাত আদায় না করা মুশরিকের কাজ [৩০:৩১]

() শুধুমাত্র দুনিয়ার জন্য ও স্বার্থে কাজ করা, যেমন: পড়াশুনা করছি শুধু ভালো চাকুরীর জন্য, মাতাপিতার সেবা করছি সমাজের জন্য। কিন্তু জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য শুধু এক আল্লাহ্’র জন্য ইবাদত, সৎকর্ম [৫১:৫৬, ৬৭:২, ৩১:১৪]

আল্লাহ্ নিয়ামত অস্বীকার করার শির্ক: কোন নিয়ামত একমাত্র আল্লাহ্’র অনুগ্রহ স্বীকার না করে তা নিজ/অন্য কারোর মেধা বা যোগ্যতার পাওনা বলে দাবি করা শির্ক [১৬:৫৩, ১৬:৮৩; ১৭:৬৬, ৪১:৫০, ২৮:৭৮,৮১;বুখারী ৩৪৬৪]

১৫ তাবিজকবচের শির্ক: সমস্যা-মুসিবত ও রোগ-শোক দূর করার জন্য কিংবা সৌভাগ্য আনয়নের জন্য তাবিজ-কবচ, তাগা-বালা, পাথর, রিং, সুতা, নকশা ব্যবহার করা শির্ক। “বলো: তোমরা কি ভেবে দেখেছ যে, আল্লাহ্ আমার অনিষ্ট চাইলে তোমরা আল্লাহ্র পরিবর্তে যাদেরকে ডাকো তারা কি সেই অনিষ্ট দূর করতে পারবে? বা তিনি আমার প্রতি রহমত করতে চাইলে তারা কি সে রহমত বন্ধ করতে পারবে? বলো, আমার পক্ষে আল্লাহ্ই যথেষ্ট।” [৩৯:৩৮] “যে তাবিজ ঝুলালো সে শির্ক করল।” [আহমাদ ১৬৯৬৯, আস্-সিলসিলাহ আস্-সহীহ্ ৪৯২]

১৬ যাদুর শির্ক: সকল প্রকার কালো যাদু, যাদু করানো, যাদুকরদের সম্মান করা শির্ক। যাদুকরেরা জিনদের নামে পশু জবাই, তাদেরকে  সিজদা এরকম সব বড় শির্কের মাধ্যমে শয়তান জিনদের প্রিয়ভাজন হয় এবং তাদের সাহায্য নিয়ে পরস্পরের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি, কাউকে জ্ঞানশুন্য করে ফেলা ইত্যাদি ক্ষতি করে থাকে। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন: “বরং শয়তানরাই কুফরী করেছিল, তারা মানুষকে যাদু শিক্ষা দিত।” [২:১০২]

১৭ আল্লাহ্ সিফাতের শির্ক: বিভিন্ন ভাবে মানুষ এই শির্ক করে থাকে, যেমন:-

() একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়াও কোন নাবী, ওলী বা পীর-বুযুর্গ সব কিছু শুনতে বা দেখতে পান বা অন্তরের গোপন কথা বুঝতে পারেন এমন মনে করা শির্ক। এতে করে আল্লাহ্’র সাথে সমকক্ষ দাঁড় করানো হচ্ছে একমাত্র আল্লাহ্’র জন্য প্রযোজ্য সিফাত্গুলোর সাথে: সর্ব-শ্রোতা (السَّمِيعُ), সর্ব-দ্রষ্টা (الْبَصِيرُ) এবং সর্ব-জ্ঞানী (الْعَلِيمُ); দ্রষ্টব্য [২:১২৭, ৩:১৬৩, ২:২৯]।

() একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা ছাড়াও কোন নাবী, ওলী, গাওস, ক্বুতুব, আব্দালের এ বিশ্ব পরিচালনায় অথবা এর কোন কর্মকাণ্ডে হাত আছে (যেমন: ‘বুযুর্গের’ এক হুকুমে বৃষ্টি দেয়া, তুফান বন্ধ করা ইত্যাদি) এমন বিশ্বাস / মনে করা শির্ক। সমগ্র বিশ্বের নিয়ন্ত্রক একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা; দ্রষ্টব্য [১০:৩, ১০:৩১, ১৩:২, ৩২:৫]

() গণক, ভবিষ্যৎ বক্তা, ভাগ্যপরীক্ষকের কাছে যাওয়া, রাশি, তারকা-নক্ষত্র, জোতিষী, হস্তরেখা দিয়ে ভাগ্য যাচাই শির্ক। একইভাবে কোন নাবী, ওলী বা পীর-বুযুর্গ গায়েব জানেন এমন মনে করাও শির্ক। যা কোন ধরনের মানবেন্দ্রিয় বা মানব তৈরী প্রযুক্তি কর্তৃক উপলব্ধ বা জ্ঞাত হওয়া সম্ভবপর নয় তাই গায়েব (যেমন: গর্ভস্থ সন্তান ছেলে বা মেয়ে তা প্রযুক্তি দ্বারা জানা সম্ভব কিন্তু সে সন্তান কেমন মানুষ হবে, মুত্তাকি হবে কি হবে না তা ‘গায়েব’)। আল্লাহ্ বলেন: “বলো, আল্লাহ্ ব্যতীত নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলে কেউ গায়েবের খবর জানে না।” [২৭:৬৫; আরো দ্রষ্টব্য: ৬:৫০ ও ৬:৫৯, ৩১:৩৪]।

() একমাত্র আল্লাহ্ ছাড়া কেউ কাউকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দিতে পারে/কেউ কাউকে ধনী বা গরিব বানাতে পারে এমন মনে করা শির্ক: [৩:২৬; ১৩:২৬, ১৭:৩০]।

১৮ আল্লাহ্ নামের শির্ক: আল্লাহ্ তা’আলা কে তাঁর নাম বাদ দিয়ে অন্য নামে যেমন: দুয়া’র সময় ‘হে খোদা’, ‘হে বিধাতা’ ‘হে পাক-পরওয়ারদিগার’ ইত্যাদি নামে ডাকা শির্ক। কুরআন আর সহীহ্ হাদীস থেকে আল্লাহ্’র যে সব নাম (আসমা-উল-হুসনা) আমরা জানতে পারি সে সব নাম দিয়েই আল্লাহ্-কে ডাকতে হবে আর এটাই বৈধ অসীলা।  এ মর্মে আল্লাহ্ আমাদের সতর্ক করে দিচ্ছেন: “আর আল্লাহ্র জন্য রয়েছে সব উত্তম নাম। সুতরাং তোমরা তাঁকে সেসব নামেই ডাকো; আর তাদেরকে বর্জন কর যারা তাঁর নামের মধ্যে বিকৃতি ঘটায়। তারা নিজেদের কৃতকর্মের ফল শীঘ্রই পাবে।” [৭:১৮০] একমাত্র আল্লাহ্র জন্য প্রযোজ্য আল্লাহ্র সিফাতি নামে কোনো মানুষের নাম রাখা ও তাকে ডাকা গুরুতর পাপ যেমন: ‘আব্দুল’ ব্যবহার না করে ‘রাব্বি’ ‘রহমান’ ‘রকিব’ ‘রহিম’ ‘গফফার’ ‘খালেক’ ‘রাজ্জাক’ ইত্যাদি নাম রাখা / সংক্ষেপ করে এসব নামে মানুষকে ডাকা।

১৯ নাবী মুহাম্মদ (🙂 এর প্রতি অতিমানবীয় গুণ আরোপের শির্ক: রসূল (স:) কে () নূরের নাবী, () জিন্দা নাবী/হায়াতুন্নাবী, () আলিমুল গায়েব মনে করা শির্ক। () “বলো: আমিও তোমাদের মতই একজন মানুষ।” [১৮:১১০] () “নিশ্চয়ই তুমিও মরণশীল, তারাও মরণশীল।”  [৩৯:৩০; দ্রষ্টব্য ৩:১৪৪] () “বলো, আল্লাহ্ যা ইচ্ছা করেন তাছাড়া আমার নিজের ভালো বা মন্দ করার কোনো ক্ষমতা আমার নেই। আর আমি যদি গায়েবের কথা জেনে নিতে পারতাম, তাহলে বহু মঙ্গল অর্জন করে নিতে পারতাম, ফলে আমার কোন অমঙ্গল কখনও হতে পারত না।” [৭:১৮৮]

২০ কথা, কুসংস্কার মতবাদের শির্ক:

() অতীতে সংঘটিত ঘটনার ক্ষেত্রে ‘যদি’ ব্যবহার করা শির্ক; কারণ, এ ধরনের কথা তাক্বদীরে অবিচল বিশ্বাসের বিরোধী। যেমন: ‘যদি (মৃত) লোকটাকে অমুক দেশে/হসপিটালে নিয়ে যেত তো সে বেঁচে যেত’ ইত্যাদি। আবার যুগ/সময়/বাতাস ইত্যাদিকে গালি দেওয়াও শির্ক। এছাড়া অনেক কবিতা/গান ভয়াবহ শির্কপূর্ণ, যেমন: ‘খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া [বিদ্রোহী কবিতা, কাজী নজরুল ইসলাম]  

() কুসংস্কার (যেমন: হাত চুলকালে টাকা আসে), অশুভ আলামত (যেমন: কুকুর/কাক ডাকলে মানুষ মারা যায়/ক্ষতি হয়) ইত্যাদি বলা/বিশ্বাস করা শির্ক। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন: “আল্লাহ্ যদি তোমাকে কষ্ট দিতে চান তাহলে তিনি ছাড়া তা দূর করার কেও নেই। আর যদি তিনি তোমার কোন কল্যাণ করতে চান তাহলে তাঁর অনুগ্রহের গতিরোধ করার সাধ্য কারোরই নেই।” [১০:১০৭; ৩:১৫৪, ৩১:৬, ৪৫:২৪, বুখারী ৬১৮১, মুসলিম ২২৪৬, তিরমিযী ২২৫২]

() i. শক্তির অবিনাশিতাবাদ, ii. বিবর্তনবাদ/প্রকৃতিবাদ, iii. গণতন্ত্র (সকল ক্ষমতার উত্স জনগণ), সমাজতন্ত্র, ইসলামী-গণতন্ত্র (স্ববিরোধী-শব্দ) এরকম যাবতীয় তন্ত্র ও মতবাদ বিশ্বাস করা শির্ক; i. “সবকিছুই ধ্বংসশীল একমাত্র আপনার মহিমাময় ও মহানুভব রবের মুখমন্ডল (সত্তা) ছাড়া” [৫৫:২৬-২৭] ii. “আল্লাহ্ তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন একজন ব্যক্তি থেকে।” [৭:১৮৯] iii. “নিশ্চয়ই আল্লাহ্’র নিকট গ্রহণযোগ্য দ্বীন একমাত্র ইসলাম।” [৩:১৯]; আরো দ্রষ্টব্য: [৩:৮৫, ৫:৩, ১২:৪০]।

পরিশেষে:

اللَّهُمَّ  إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أُشْرِكَ بِكَ وَأَنَا أَعْلَمُ، وَأَسْتَغْفِرُكَ لِمَا لاَ أَعْلَم       [আহমাদ ১৯৬০৬]

 “হে আল্লাহ! আমি জ্ঞাতসারে আপনার সাথে শির্ক করা থেকে আপনার নিকট আশ্রয় চাই এবং অজ্ঞতাসারে (শির্ক) হয়ে গেলে তার জন্য ক্ষমা চাই।”

সূত্র:

মতামত দিন

Solve : *
16 + 9 =