শবে-মিরাজ পালন করা বিধান

শবে-মিরাজঃ 
প্রতি বৎসর ২৭শে রজব বিভিন্ন দেশে বহু মুসলমান ভক্তি ও উদ্দীপনার সাথে ‘শবে-মিরাজ’ পালন করে থাকেন। তারা এই রাত্রে ইবাদাত করেন ( বিশেষ পদ্ধতিতে১২ রাকআত নামায পড়েন, নামায শেষে ১০১ বার দরূদ শরীফ পাঠ করে দু’আ ও মুনাজাত করেন) এবং পরদিন রোযা রাখেন। কেউ কেউ ভাড়াটিয়া হুযুর দিয়ে মিলাদ পড়ান, ভাড়াটিয়া হাফেয দিয়ে কুরআনখানি বা শবীনা পাঠ করান। তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সাওয়াব অর্জনের উদ্দেশ্যে এ সকল ইবাদাত করেন। কিন্তু পবিত্র কুরআন কারীমের শিক্ষা ও আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর শিক্ষার আলোকে বিচার করলে দেখা যায় যে, তাদের এ সকল করম অযৌক্তিক ও অবশ্য-বর্জনীয়। নিম্নের কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করুনঃ-
প্রথমতঃ ২৭শে রজব মি’রাজ হয়েছিল এ কথা প্রমাণিত নয়।
আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে মহান আল্লাহ্ বিশেষ মর্যাদা দান করেন এবং এক রাতে তাকে মক্কা শরীফ থেকে বোরাকে করে জেরুজালেমের মসজিদে আকসায় এবং সেখান থেকে নিজের সান্নিধ্যে নিয়ে যান। মিরাজের এই ঘটনা পবিত্র কুরআনে ও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু কোথাও মিরাজের তারিখ বলা হয়নি।

মিরাজ কোন তারিখে সংঘটিত হয়েছিল এ কথা পবিত্র কুরআন বা কোন বিশুদ্ধ হাদীসে উল্লেখ করা হয়নি। এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, তা পালন করা তো দূরের কথা ; রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ও তাঁর সাহাবাগণ মি’রাজের তারিখ জানা বা জানানোর ব্যাপারে কোন গুরুত্ব দেন নি। পরবর্তী যামানার ঐতিহাসিকগণ পরস্পরবিরোধী বিভিন্ন মত পোষণ করেছেন। কেউ বলেছেন, মিরাজ রবিউল আওয়াল মাসে সংঘটিত হয়েছিল। কেউ বলেছেন, মুহাররাম মাসে। কেউ বলেছেন, রমাযান মাসে। আবার কেউ বলেছেন , রজব মাসে। তারিখের ব্যাপারেও বিভিন্ন মতভেদ রয়েছে। আর কোন মতটাই সথিকরূপে প্রমাণিত নয়। এমতাবস্থায় ২৭শে রজবেই মিরাজ হয়েছে বলে বিশ্বাস করা এবং এই দিন বা রাতকে কোন অনুস্থানের মাধ্যমে পালন করা যে একেবারেই ভিত্তিহীন তা আমরা সহজেই বুঝতে পারছি।

দ্বিতীয়তঃ শবে-মি’রাজ পালন করা বিদআত।
মি’রাজের তারিখ যদি নিশ্চিতরূপে জানা সম্ভব হতো , তাহলেও তা পালন করা আমাদের জন্য জায়েয হত না। কারণ, আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বা তাঁর প্রিয় সাহাবাগণ কেউ কখনো শবে মি’রাজ পালন করেননি। আর আমাদের কর্তব্য হল তাদের অনুসরণ করা। মহান আল্লাহ্ বলেনঃ “যারা সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছে প্রথম যুগের সেই মুহাজির ও আন্সার সাহাবীগণ এবং যারা তাদেরকে উত্তমভাবে অনুসরণ করেছে, আল্লাহ্ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। আল্লাহ্ তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন কাননকুঞ্জ, যার পাদদেশে বয়ে গেছে নদীসমূহ। সেখানে তারা অনন্তকাল থাকবে। আর এটাই হল সবচেয়ে বড় সফলতা।” (সূরা তাওবাহ ১০০ আয়াত) কাজেই আমরা যদি “সবচেয়ে বড় সফলতা” অর্জন করতে চাই, তাহলে তাদের অনুসরণ করতে হবে, তারা যা করেছেন তা করতে হবে এবং তারা যা করেননি তা থেকে বিরত থাকতে হবে।
যে কাজ রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বা তাঁর সাহাবাগণ করেননি, সে কাজ ধর্মীয় কাজ হিসাবে বা সওয়াব লাভের কামনায় করলে তাকে “বিদআত” বলা হয়। আর বিদআত জঘন্য অন্যায়। ,কারণ, বিদআত মূলতঃ এ কথা বলতে চায় যে, শবে মি’রাজ পালন করা একটি ভালো কাজ। অথচ রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তা আমাদেরকে বলে যাননি। উপরন্তু যদি সবাই ইচ্ছামত মনগড়া ইবাদাত করতে থাকে, তাহলে বিধেয়র সাথে অবিধেয় একাকার হয়ে যাবে এবং ইসলামের প্রকৃত রূপ বিকৃত হয়ে যাবে। এ জন্য রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদেরকে বিদআত থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন, “আমাদের এ বিষয়ে (দ্বীনে) যে নতুন কিছু উদ্ভাবন করবে, যে ব্যাপারে আমাদের কোন নির্দেশ নেই, তা বাতিল বলে গণ্য হবে, প্রত্যাখ্যাত হবে।”(বুখারী ও মুসলিম) তিনি আরো বলেছেন, “সবচেয়ে উত্তম বাণী হল আল্লাহর বাণী। সবচেয়ে ভাল শিক্ষা ও তরীকা হল মুহাম্মাদের শিক্ষা ও তরীকা। আর সবচেয়ে খারাপ কর্ম হল নব-উদ্ভাবিত কর্ম। সকল প্রকার নতুন কাজই বিদআত। আর সর্বপ্রকার বিদআতই গুমরাহী ও পথভ্রষ্টতা।” (মুসলিম) কাজেই কোন বিদআতকে (বিদআতে হাসানাহ) ভাল বলার অবকাশ নেই।
পরিশেষে প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব হল, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)এর সুনাহ ও শিক্ষার অনুসরণ করে চলা। তাঁর শিক্ষার বিপরীত সকল প্রকার বিদআতকে বর্জন করা এবং অপরকে এ পথে চলতে আহবান করা। (বিদআতি পরবের কোন দাওয়াত বা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ না করা) এ কথাই মহান আল্লাহ্ আমাদেরকে শিখিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “মহাকালের শপথ! সমস্ত মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত। তবে তারা নয়, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে, সৎ কর্ম করে, একে অপরকে সত্যের উপদেশ দেয় এবং একে অপরকে ধৈর্যের উপদেশ দেয়।”(সুরাহ আসর) মহান আল্লাহ্ অন্যত্র বলেছেন, “ন্যায়, সৎ ও আল্লাহভীতির কাজে তোমরা পরস্পরের সহযোগিতা কর এবং পাপ ও অন্যায় কাজে একে অপরের সহায়তা করো না।” (সূরা মাইদাহ ২ আয়াত)
হাদীস শরীফে মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, “ইসলাম ধর্মের মূল শিক্ষা হল আন্তরিকতা, হিতাকঙ্ক্ষা ও সৎ পরামর্শ দান করা।” সাহাবীরা প্রশ্ন করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! কাদের জন্য? তিনি বললেন, “আল্লাহর জন্য, তাঁর রাসূলের জন্য, তাঁর কিতাবের জন্য, মুসলিম নেতৃবৃন্দের জন্য এবং সকল মুসলিম জনসাধারণের জন্য।”(মুসলিম, মাজাল্লাতুদ দা’ওয়াহ ২৬/৬/১৪১৭ হিজরীর ১৫৬৬ সংখ্যা, ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ ১/৯৩,১১৬, মাজমূউ ফাতাওয়া শায়খ ইবনে উসাইমীন ২/২৯৭ দ্রষ্টব্য)
এই মাসের ২৭ তারিখে (শবে মি’রাজে) এশা ও বিতরের মাঝে নাকি ৬ সালামে ১২ রাকআত নামায আছে। আর নামাযের পর ১০০ বার কলেমায়ে তামজীদ (?) এবং নির্দিষ্ট দু’আ পাঠ করতে হয়। এই দিন দান করতে হয়। ঐ দিনের রোযা এবং ঐ রাতের ইবাদাত ১০০ বছর এবং ১০০ রাত ইবাদত করার সমান সওয়াব লাভ হয়! (মু’জামুল বিদা’ ৩৪১ ও ৩৪৫ পৃঃ)
আপনার মুর্শিদকে জিজ্ঞাসা করুন, এ সবের দলীল ও তাঁর মান কি?
বইঃ ১২ মাসে ১৩ পরব, লেখকঃ Abdul Hamid Madani Faizi

About Maksud

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Solve : *
29 − 16 =