স্বলাতে মুবাশ্‌শির (পর্ব ১৫)

রচনায় : আব্দুল হামীদ ফাইযী

মসজিদের প্রতি আসক্তি ও তথায় অবস্থানের ফযীলত

মহান আল্লাহ বলেন,

إِنّمَا يَعْمُرُ مَسَاجِدَ اللهِ مَنْ آمَنَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ وَأَقَامَ الصَّلاَةَ وَآتَى الزَّكَاةَ وَلَمْ يَخْشَ إِلاَّ اللهَ، فَعَسَى أُولئِكَ أَنْ يَّكُوْنُوْا مِنَ الْمُهْتَدِيْنَ
অর্থাৎ, নি:সন্দেহে তারাই আল্লাহর মসজিদ আবাদ করবে, যারা আল্লাহতে ও পরকালে ঈমান রাখে, নামায কায়েম করে, যাকাত প্রদান করে, আর আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করে না। আশা করা যায়, তারা সৎপথপ্রাপ্তদের দলভুক্ত হবে। (সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত নং-১৮)

আল্লাহর রসূল (সাঃ) বলেন, “আল্লাহ তাআলা সাত ব্যক্তিকে সেই দিনে তাঁর (আরশের) ছায়া দান করবেন যেদিন তাঁর ছায়া ব্যতীত আর  কোন ছায়া থাকবে না; (তারা হল,)
১। ন্যায় পরায়ণ বাদশাহ্‌ (রাষ্ট্রনেতা),
২। সেই যুবক যার যৌবন আল্লাহ আযযা অজাল্লার ইবাদতে অতিবাহিত হয়, সেই  ব্যক্তি যার অন্তর মসজিদ  সমূহের সাথে লটকে থাকে (মসজিদের প্রতি তার মন সদা আকৃষ্ট থাকে।)
৩। সেই দুই ব্যক্তি যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা স্থাপন করে; যারা এই ভালোবাসার উপর মিলিত হয় এবং এই ভালোবাসার উপরেই চিরবিচ্ছিন্ন (তাদের মৃত্যু) হয়।
৪। সেই ব্যক্তি যাকে কোন কুলকামিনী সুন্দরী (অবৈধ যৌন-মিলনের উদ্দেশ্যে) আহ্বান করে কিন্তু সে বলে, ‘আমি আল্লাহকে ভয় করি।
৫। সেই ব্যক্তি যে দান করে গোপন করে; এমনকি তার ডানহাত যা প্রদান করে তা তার বাম হাত পর্যন্তুও জানতে পারে না। আর সেই ব্যক্তি যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে; ফলে তার উভয় চোখে পানি বয়ে যায়।” (বুখারী ৬৬০নং, মুসলিম, সহীহ ১০৩১নং)

“কোন ব্যক্তি যখন যিক্‌র ও নামাযের জন্য মসজিদে অবস্থান করা শুরু করে তখনই আল্লাহ তাআলা তাকে নিয়ে সেইরুপ খুশী হন যেরুপ প্রবাসী ব্যক্তি ফিরে এলে তাকে নিয়ে তার বাড়ির লোক খুশী হয়।” (ইআশা:, ইবনে মাজাহ্‌, সুনান, ইবনে খুযাইমাহ্‌, সহীহ, ইবনে হিব্বান, সহীহ,হাকেম, মুস্তাদরাক, সহিহ তারগিব ৩২২নং)

 “মসজিদ প্রত্যেক পরহেযগার (ধর্মভীরু) ব্যক্তির ঘর। আর যে ব্যক্তির ঘর মসজিদ সেই ব্যক্তির জন্য আল্লাহ আরাম, করুণা এবং তার সন্তুষ্টি ও জান্নাতের প্রতি পুলসিরাত অতিক্রম করে যাওয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন।” (ত্বাবারানী, মু’জাম কাবীর ও আওসাত্ব, বাযযার, সহিহ তারগিব ৩২৫ নং)

“যখন তোমাদের মধ্যে কেউ নিজ ঘরে ওযু করে মসজিদে আসে, তখন ঘরে না ফিরা পর্যন্ত সে নামাযেই থাকে। সুতরাং সে যেন হাতের আঙ্গুলগুলোর মাঝে খাঁজাখাঁজি না করে।” (হাকেম, মুস্তাদরাক, মিশকাত ৯৯৪, সিলসিলাহ সহীহাহ, আলবানী ১২৯৪নং)

“যে ব্যক্তি ওযু করে মসজিদে আসে, সে ব্যক্তি আল্লাহর মেহ্‌মান। আর মেজবানের দায়িত্ব হল, মেহ্‌মানের খাতির করা।” (সিলসিলাহ সহীহাহ, আলবানী ১১৬৯ নং)

খেয়াল রাখার কথা যে, ই’তিকাফে বসা ছাড়া অন্যান্য দিনে মসজিদের মধ্যে নামাযের জন্য কোন এক কোণ বা স্থানকে নির্দিষ্ট করা বৈধ নয়। কারণ, মহানবী (সাঃ) নিষেধ করেছেন কাকের দানা খাওয়ার  মত (ঠকঠক করে) নামায পড়তে, নামাযে হিংস্র জন্তুদের মত হাত বিছিয়ে বসতে এবং উট যেমন একই স্থানকে নিজের জায়গা বানিয়ে নেয়, তেমনি মসজিদে নির্দিষ্ট জায়গা বানাতে। (আবূদাঊদ, সুনান, নাসাঈ, সুনান, দারেমী, সুনান, ইবনে মাজাহ্‌, সুনান, ইবনে খুযাইমাহ্‌, সহীহ, ইবনে হিব্বান, সহীহ,হাকেম, মুস্তাদরাক, আহমাদ, মুসনাদ, সিলসিলাহ সহীহাহ, আলবানী ১১৬৮নং)

মসজিদ যাওয়ার আদব

পূর্বে উল্লেখিত একহাদীসে এসেছে যে, ওযু করে মসজিদ যাওয়ার সময়ও আঙ্গুলসমূহের মাঝে খাঁজাখাঁজি করা নিষিদ্ধ। অনুরুপ এই সময় পথে ইকামত শুনলেও তাড়াহুড়ো করে বা ছুটাছুটি করে দৌড়ে যাওয়া বৈধ নয়। যেহেতু মহানবী (সাঃ) বলেন, “তোমরা ধীর ও শান্তভাবে (মসজিদে বা জামাআতে) যাও। ইমামের সঙ্গে নামাযের যতটুকু অংশ পাও ততটুকু পড়ে নাও এবং যেটুকু অংশ ছুটে যায় তা একাকী পূর্ণ করে নাও।” (বুখারী, মুসলিম,  মিশকাত ৬৮৬ নং)

মসজিদ যাওয়ার সময় পথে নিম্নের দুআ পড়তে হয়:-

اَللّهُمَّ اجْعَلْ فِيْ قَلْبِيْ نُوْراً وَّ فِيْ لِسَانِيْ نُوْراً وَّ اجْعَلْ فِيْ سَمْعِيْ نُوْراً وَّ اجْعَلْ فِيْ بَصَرِيْ نُوْراً وَّاجْعَلْ مِنْ خَلْفِيْ نُوْراً ، وَّ مِنْ أَمَامِيْ نُوْراً، وَّاجْعَلْ مِنْ فَوْقِيْ نُوْراً وَ مِنْ تَحْتِيْ نُوْراً،

 اَللّهُمَّ أَعْطِنِيْ نُوْراً।

উচ্চারণ- আল্লাহুম্মাজ্‌আল ফী ক্বালবী নূরা, অফী লিসানী নূরা, অজ্‌আল ফী সাময়ী নূরা,অজ্‌আল ফী বাস্বারী নূরা, অজ্‌আল মিন খালফী নূরা, অমিন আমা-মী নূরা, অজ্‌আল মিন ফাউক্বী নূরা, অমিন তাহ্‌তী নূরা, আল্লাহুম্মা আ’তিনী নূরা।

অর্থ- হে আল্লাহ! আমার হৃদয়, রসনা, কর্ণ, চক্ষু, পশ্চাত, সম্মুখ, ঊর্ধ্ব ও নিম্নে জ্যোতি প্রদান কর। হে আল্লাহ! আমাকে নূর (জ্যোতি) দান কর। (বুখারী ৬৩১৬, মুসলিম, সহীহ ৭৬৩ নং)

মসজিদে প্রবেশ ও বাহির হওয়ার সময় দুআ

মহানবী (সাঃ) যখন মসজিদ প্রবেশ করতেন, তখন ‘বিসমিল্লাহ্‌’ বলতেন এবং নিজের উপর দরুদ ও সালাম পড়তেন। অনুরুপ বের হওয়ার সময়ও পড়তেন। (ইবনে মাজাহ্‌, সুনান ৭৭১নং)

তিনি এই সময় নিম্নের দুআও পড়তেন,

أَعُوْذُ بِاللهِ الْعَظِيْمِ، وَبِوَجْهِهِ الْكَرِيْمِ، وَسُلْطَانِهِ الْقَدِيْمِ، مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ।

উচ্চারণ:- আঊযু বিল্লা-হিল আযীম, অবিঅজ্‌হিহিল কারীম, অ সুলত্বা-নিহিল ক্বাদীম, মিনাশ শায়ত্বা-নির রাজীম।

অর্থ- আমি মহিমময় আল্লাহর নিকট এবং তার সম্মানিত চেহারা ও তাঁর প্রাচীন পরাক্রমের অসীলায় বিতাড়িত শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।

এই দুআ পড়ে মসজিদ প্রবেশ করলে শয়তান বলে, ‘সারা দিন ও আমার অনিষ্ট থেকে নিরাপত্তা লাভ করল।’ (আবূদাঊদ, সুনান, মিশকাত ৭৪৯ নং)

(بِسْمِ الله)، وَالصَّلاَةُ وَالسَّلاَمُ عَلى رَسُوْلِ الله، اَللّهُمَّ افْتَحْ لِيْ أَبْوَابَ رَحْمَتِك।

উচ্চারণ- বিসমিল্লা-হ্‌, অসসালা-তু অসসালা-মু আলা রাসূলিল্লা-হ্‌, আল্লা-হুম্মাফ্‌ তাহ্‌লী আবওয়া-বা রাহ্‌মাতিক।

অর্থ- আল্লাহর নাম নিয়ে শুরু করছি, সালাম ও দরুদ বর্ষিত হোক আল্লাহর রসূলের উপর। হে আল্লাহ! আমার জন্য তুমি তোমার করুণার দুয়ার খুলে দাও।(জামে১/৫২৮,মুসলিম, সহীহ ১/৪৯৪, ইবনুস সুন্নী ৮৮)

বের হওয়ার সময় বলতেন,

(بِسْمِ الله)، وَالصَّلاَةُ وَالسَّلاَمُ عَلى رَسُوْلِ الله، اللّهُمَّ إِنِّيْ أَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِكَ।

‘বিসমিল্লাহ্‌’ ও দরুদের পর এ দুআও পড়া যায়,

اَللّهُمَّ اعْصِمْنِيْ مِنَ الشَّيْطَان।

উচ্চারণ:- আল্লাহুম্মা’সিমনী মিনাশ শাইত্বান।

অর্থ:- হে আল্লাহ! আমাকে শয়তান থেকে রক্ষা কর। (নাসাঈ, সুনান,হাকেম, মুস্তাদরাক, বায়হাকী, ইবনে হিব্বান, সহীহ, জামে ৫১৪নং)

আনাস (রাঃ) বলেন, ‘এক সুন্নাহ্‌ (নবী (সাঃ) এর তরীকা) এই যে, যখন তুমি মসজিদ প্রবেশ করবে, তখন ডান পা আগে বাড়াবে এবং যখন মসজিদ থেকে বের হবে, তখন বাম পা আগে বাড়াবে।’ (হাকেম, মুস্তাদরাক ১/২১৮)

তাহিয়্যাতুল মাসজিদ নামায

তাহিয়্যাতুল মাসজিদ বা মসজিদ সেলামীর নামায (২ রাক্‌আত) মসজিদ প্রবেশ করার পর বসার পূর্বেই পড়তে হয়। এর জন্য কোন সময়-অসময় নেই। প্রিয় নবী (সাঃ) বলেন, “তোমাদের মধ্যে যে কেউ যখন মসজিদে প্রবেশ করবে, তখন সে যেন বসার পূর্বে ২ রাক্‌আত নামায পড়ে নেয়।” অন্য এক বর্ণনায় আছে, “সে যেন ২ রাক্‌আত নামায পড়ার পূর্বে না বসে।” (বুখারী, মুসলিম, সহীহ প্রমুখ ইরওয়াউল গালীল, আলবানী ৪৬৭নং)

এই দুই রাকআত নামায বড় গুরুত্বপূর্ণ। তাই তো জুমআর দিনে খুতবা চলাকালীন সময়েও মসজিদে এলে হাল্কা করে তা পড়ে নিতে হয়। (মুসলিম,  মিশকাত ১৪১১নং)

আযান চলাকালে মসজিদ প্রবেশ করলে না বসে আযানের জওয়াব দিয়ে শেষ করে তারপর ‘তাহিয়্যাতুল মাসজিদ’ পড়তে হবে। তবে জুমআর দিন খুতবার আযান হলে জওয়াব না দিয়ে ঐ ২ রাকআত নামায আযান চলা অবস্থায় পড়ে নিতে হবে। যেহেতু খুতবা শোনা আরো জরুরী। (ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ্‌, সঊদী উলামা-কমিটি ১/৩৩৫)

মসজিদে প্রবেশ করে সুন্নাতে মুআক্কাদাহ পড়তে হলে ঐ নামায আর পড়তে হয় না। কারণ, তখন এই সুন্নতই ওর স্থলাভিষিক্ত ও যথেষ্ট হয়। (মাজাল্লাতুল বুহূসিল ইসলামিয়্যাহ্‌ ১৫/৬৭, লিকাউবাবিল মাফতূহ্‌, ইবনে উসাইমীন ৫৩/৬৯)

যেমন হারামের মসজিদে প্রবেশ করে (বিশেষ করে মুহ্‌রিমের জন্য) ‘তাহিয়্যাতুল মাসজিদ’ হল তওয়াফ; ২ রাকআত সুন্নত নয়। (মাজাল্লাতুল বুহূসিল ইসলামিয়্যাহ্‌ ৬/২৬৪-২৬৫)

মসজিদ হবে পবিত্র ও সুগন্ধময়

মসজিদ আল্লাহর ঘর। ইবাদতের জায়গা। তা হবে পবিত্র ও সুগন্ধময়। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, ‘আল্লাহর রসূল (সাঃ) মহ্‌ল্লায় মসজিদ বানাতে এবং তা পরিষ্কার ও সুগন্ধময় করে রাখতে আদেশ করেছেন।’ (আবূদাঊদ, সুনান ৪৫৫ নং,  তিরমিযী, সুনান, ইবনে মাজাহ্‌, সুনান, ইবনে হিব্বান, সহীহ আহমাদ, মুসনাদ)

সামুরাহ্‌ (রাঃ) নিজের ছেলেকে পত্রে লিখেছিলেন, ‘অতঃপর বলি যে, আল্লাহর রসূল (সাঃ) আমাদেরকে আমাদের মহ্‌ল্লায় মসজিদ বানাতে, তার তরমীম করতে এবং তা পবিত্র রাখতে আদেশ করতেন।’ (আবূদাঊদ, সুনান  ৪৫৬নং)

মহানবী (সাঃ) বলেন, “নিশ্চয়ই এই মসজিদসমূহে কোন প্রকার নোংরা, পেশাব-পায়খানা (ইত্যাদি ময়লা দ্বারা অপবিত্র করা) সঙ্গত নয়। মসজিদ তো কুরআন পাঠ, আল্লাহর যিক্‌র এবং নামাযের জন্য (বানানো হয়)। (আহমাদ, মুসনাদ, মুসলিম,  জামে ২২৬৮নং) তিনি মসজিদের দরজায় পেশাব করতে নিষেধ করেছেন। (জামে ৬৮১৩ নং)

মসজিদে থুথু বা কফ্‌ ফেলা গুনাহর কাজ। থুথু ইত্যাদি নোংরা বস্তু মসজিদ থেকে পরিষ্কার করা সওয়াবের কাজ। (আহমাদ, মুসনাদ, ত্বাবারানী, মু’জাম, জামে ২৮৮৫ নং) যেমন ঋতুমতী মহিলা প্রভৃতি অপবিত্রের জন্য মসজিদে অবস্থান করা বৈধ নয়। (বুখারী, মুসলিম,  মিশকাত ১৪৩১নং)

মহানবী (সাঃ) বলেন, “যে ব্যক্তি (কাঁচা) পিঁয়াজ, রসুন বা কুর্রাস খাবে, সে যেন আমাদের মসজিদে আমাদের নিকটবর্তী না হয়। কেননা, যে বস্তু দ্বারা মানুষ কষ্ট পায়, সেই বস্তুতে ফিরিশ্‌তারাও কষ্ট পেয়ে থাকেন।” (মুসলিম,  তিরমিযী, সুনান, নাসাঈ, সুনান, জামে ৬০৮৯ নং)

বলাই বাহুল্য যে, কাঁচা পিঁয়াজ-রসুন অপেক্ষা বিড়ি-সিগারেট, গুল-জর্দা, গালি-তামাক প্রভৃতি মাদকদ্রব্যের দুর্গন্ধ আরো বেশী। সুতরাং তা খেয়েও মসজিদে এসে মুসল্লী তথা আল্লাহর ফিরিশ্‌তাদেরকে কষ্ট দেওয়া বৈধ নয়। বরং এসব বস্তু খাওয়াইহারাম এবং তা বর্জন করা ওয়াজেব। (আদর্শ পরিবার ও পরিবেশ দ্র:)

About wj_admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Solve : *
23 − 11 =