ইসলামের ইতিহাস

মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর (সা) সমসাময়িক শাসকবৃন্দ

রচনায়: এ. কে. এম. নাজির আহমদ

১। লোম্বার্ডি রাজ্য

এক সময় ইতালী, জার্মানী, পোল্যাণ্ড, রুমানিয়া, ফ্রান্স, ইংল্যাণ্ড, গ্রীস, মেসিডোনিয়া, স্পেন, তুর্কী, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, মিশর, লিবিয়া, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া, মরক্কো, মৌরতানিয়া প্রভৃতি অঞ্চল নিয়ে গঠিত ছিলো বিশাল সাম্রাজ্য।

অখণ্ড রোমান সাম্রাজ্যের সর্বশেষ শাসক ছিলেন সম্রাট প্রথম থিওডোসিয়াস। তিনি খৃষ্টীয় ৩৯৫ সনে মৃত্যু বরণ করেন। তার মৃত্যুর পর বিশাল রোমান সাম্রাজ্য দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। যথাঃ ওয়েষ্টাৰ্ণ রোমান এম্পায়ার (পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্য) ও ইষ্টাৰ্ণ রোমান এম্পায়ার (পূর্ব রোমান সম্রাজ্য বা বাইজেনটাইন সাম্রাজ্য)। ওয়েষ্টাৰ্ণ রোমান এম্পায়ারের রাজধানী থাকে রোম নগরী। ইষ্টাৰ্ণ রোমান এম্পায়ারের রাজধানী হয় কনষ্ট্যান্টিনোপল যার পূর্ব নাম ছিলো বাইজেন্টয়াম।

খৃষ্টীয় ৪৭৬ সনে ওডোয়েসার (Odoacer) নামক একজন জার্মেন গোত্রপতি সর্বশেষ রোমান সম্রাট রোমিউলাস অগাস্তুলাস (Romulus Augustulus) কে পরাজিত করে রোম নগরী দখল করেন। এইভাবে ওয়েস্টার্ণ রোমান এম্পায়ারের বিলুপ্তি ঘটে।

খৃষ্টীয় ৫৬৮ সনে লোম্বার্ড নামে আরেকটি জার্মান গোত্র গোত্রপতি অ্যালবোইনের (Alboin) নেতৃত্ব ইতালীতে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এই নব প্রতিষ্ঠিত রাজ্যের নাম হয় লোম্বার্ডি। লোম্বার্ডির রাজা আলবোইনের শাসনকালে খৃষ্টীয় ৫৭১ সনে আরব উপদ্বীপে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা. জন্মগ্রহণ করেন।

অ্যালবোইনের পর লোম্বার্ডির রাজা হন অথরি (Authari)। তিনি খৃষ্টীয় ৫৮৪ সন থেকে ৫৯০ সন পর্যন্ত রাজ শাসন করেন। তাঁর পর রাজা হন এগিলোলফ (Agilulf)। তিনি খৃষ্টীয় ৫৯১ সন থেকে ৬১৫ সন পর্যন্ত রাজত্ব করেন। তাঁর শাসনকালে খৃষ্টীয় ৬১০ সনে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) নবুওয়াত লাভ করেন।

সম্ভবত এগিলোলফের পুত্র অ্যাভালোয়াল্ড (Adaloald) খৃষ্টীয় ৬১৫ সন থেকে ৬৩৫ সন পর্যন্ত লোম্বার্ডি শাসন করেন। খৃষ্টীয় ৬২২ সনে মুহাম্মাদ (সা) মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করেন। খৃষ্টীয় ৬৩২ সনে তিনি ইন্তিকাল করেন।

২। ইষ্টাৰ্ণ রোমান এম্পায়ার

সম্রাট দ্বিতীয় জাস্টিন খৃষ্টীয় ৫৬৫ সন থেকে ৫৭৮ সন পর্যন্ত ইষ্টাৰ্ণ রোমান এম্পায়ার শাসন করেন। তার শাসনকালেই খৃষ্টীয় ৫৭১ সনে আরব উপদ্বীপে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) জন্মগ্রহণ করেন।

দ্বিতীয় জাষ্টিনের পর সম্রাট টাইবেরিয়াস (খৃষ্টীয় ৫৭৮-৫৮২), সম্রাট মরিস (খৃষ্টীয় ৫৮২৬০২) ও সম্রাট ফোকাস (খৃষ্টীয় ৬০২-৬১০) ইষ্টাৰ্ণ রোমান এম্পায়ার শাসন করেন।

খৃষ্টীয় ৬১০ সনে সম্রাট হন হিরাক্লিয়াস। আর ঐ সনে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) নবুওয়াত লাভ করেন। খৃষ্টীয় ৬২২ সনে তিনি মদীনাতে ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করেন।

খৃষ্টীয় ৬২৮ সনে মাক্কার মুরশিকদের সংগে মুহাম্মদ (সা) দশ বছর মিয়াদী একটি ‘যুদ্ধ নয় চুক্তি’ স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তিকেই হুদাইবিয়ার চুক্তি বলা হয়। এই চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে যুদ্ধাবস্থার অবসান হওয়ায় মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) নব গঠিত রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ মজবুতি সাধনের দিকে মনোযোগ দেবার সুযোগ পান। অন্য দিকে বিভিন্ন দেশের শাসকদের নিকট ইসলামের আহবান পৌছানোর জন্য চিঠি লিখেন। তিনি ইষ্টাৰ্ণ রোমান এম্পায়ারের (বাইজেনটাইন সাম্রাজ্য) সম্রাট হিরাক্লিয়াসের নিকটও একটি চিঠি প্রেরণ করেন। দাহইয়া কালবী (রা) এই চিঠি বহন করে নিয়ে যান।

সম্রাট হিরাক্লিয়াস তখন তার সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রদেশ সিরিয়াতে অবস্থান করছিলেন। তার নিকট মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর (সা) চিঠি পৌছানোর সময় মাক্কার অন্যতম বিশিষ্ট ব্যক্তি আবু সুফইয়ান একটি বাণিজ্য কাফিলা নিয়ে সিরিয়ায় অবস্থান করছিলেন। হিরাক্লিয়াস তাকে দরবারে ডেকে নেন ও অনেকগুলো প্রশ্ন করেন। প্রশ্নের উত্তরে আবু সুফইয়ান জানান যে মুহাম্মাদ উচ্চ বংশীয় ব্যক্তি, তার পূর্ব পুরুষদের কেউ রাজা ছিলেন না, সমাজের নিপীড়িত শ্রেণী তার প্রতি আকৃষ্ট, তিনি কখনো মিথ্যা কথা বলেন না, তার অনুসারীদের সংখ্যা বেড়েই চলছে, যুদ্ধে তিনি কখনো হারেন কখনো জিতেন, তিনি কখনো ওয়াদা ভংগ করেন না, সাম্প্রতিককালে কেউ আর এমন বক্তব্য নিয়ে ময়দানে আসেনি এবং তিনি সালাত কায়েম, যাকাত আদায়, পারস্পরিক সম্পর্ক সংরক্ষণ ও নিষিদ্ধ কাজ বর্জন করার নির্দেশ দেন। এইসব শুনে হিরাক্লিয়াস বলেন, “তুমি যা বলেছে তা যদি সত্যু হয়, তাহলে অবশ্যই তিনি নবী। আমি জানতাম তিনি আবির্ভূত হবেন। যদি আমি বুঝতে পারতাম যে তার কাছে পৌছতে পারবো, তাহলে আমি সাক্ষাত করতাম। আর আমি তার কাছে থাকতে পারলে তার পা দুইটি পানি ঢেলে ধুয়ে দিতাম। তার রাষ্ট্র আমার পায়ের নীচের জায়গা পর্যন্ত সম্প্রসারিত হবে।”

অতপর মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর (সা) চিঠি পড়া হলো এবং দরবারে হৈচৈ পড়ে গেলো।

“রোমানগণ, তোমরা কি স্থায়ী সাফল্য ও হিদায়াত চাও? তোমরা কি তোমাদের রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব কামনা কর?” রোমানগণ বুঝতে পেলো যে সম্রাট তাদেরকে ইসলাম গ্রহণের পরামর্শ দিচ্ছেন। আসন ছেড়ে তারা কামরা থেকে বের হয়ে যাবার জন্য দরওয়াজার দিকে যেতে থাকে। এমতাবস্থায় হিরাক্লিয়াস ঘাবড়ে যান। ফলে ঈমানের পথে তিনি আর অগ্রসর হতে পারলেন না। বরং রোমানদেরকে শান্ত করার জন্য তিনি বললেন,

“ওহে লোকেরা, আমি তোমাদের ধর্ম বিশ্বাসের দৃঢ়তা পরীক্ষা করছিলাম। তোমাদের কাছ । থেকে যা আশা করেছিলাম তা পেয়েছি।”

খৃষ্টীয় ৬৩১ সনে রোমান সৈন্যগণ মাদীনা ইসলামী রাষ্ট্রের উত্তর সীমান্তে চাপ সৃষ্টি করে। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) রোমান বাহিনীর মুকাবিলা করার জন্য ত্রিশ হাজার মুজাহিদ নিয়ে তাবুক নামক স্থানে এসে পৌছেন। তার আগমনের কথা জানতে পেরে হিরাক্লিয়াস সীমান্ত থেকে রোমান সৈন্যদেরকে সরিয়ে নেন।

খৃষ্টীয় ৬৩২ সনে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) ইন্তিকাল করেন।

সম্রাট হিরাক্লিয়াস মারা যান খৃষ্টীয় ৬৪১ সনে।

ঈজিপটাস জোভিয়া

মিসর তখন তিনটি রাজ্যে বিভক্ত ছিলো। উত্তর মিসরকে বলা হতো ঈজিপটাস জোভিয়া (Aegyptus Jovia) । এই রাজ্যের প্রধান নগরী ছিলো আলেকজান্দ্রিয়া।

গ্ৰীক বীর আলেকজাণ্ডার খৃষ্টপূর্ব ৩৩২ সনে আলেকজান্দ্রিয়া নগরীর পত্তন করেন। রোমান সাম্রাজ্যের গৌরবের যুগে রোম নগরীর পরেই আলেকজাণ্ডিয়া ছিলো গুরুত্বপূর্ণ নগরী। এই নগরীর ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য বাইজেনটাইন সম্রাট ও ইরান সম্রাটের মধ্যে বিভিন্ন সময় যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

খৃষ্টীয় ৬১০ সনে মুহাম্মাদ (সা) নবুওয়াত লাভ করেন। খৃষ্টীয় ৬২২ সনে তিনি ইয়াসরিবে (মাদীনায়) ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করেন। খৃষ্টীয় ৬২৮ সনে হুদাইবিয়ার চুক্তি সম্পাদনের পর মুহাম্মাদ (সা) বিভিন্ন দেশের শাসকদের নিকট ইসলাম গ্রহণের আহবান জানিয়ে চিঠি লিখেন। এই সময় ঈজিপটাস জোভিয়ার শাসক ছিলেন আর্চবিশপ মুকাওকিস সাইরাস। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর (সা) দূত হাতিব ইবনু আবী বালতায়া (রা) তার নিকট চিঠি পৌছান।

মুকাওকিস মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর (সা) দূতকে সাদরে গ্রহণ করেন। চিঠির উত্তরে তিনি লিখেন, “আমি আপনার চিঠি পড়েছি ও বিষয়বস্তু অনুধাবন করেছি। আমি জানতাম একজন নবীর আবির্ভাব ঘটবে ও ধারণা করতাম যে তিনি সিরিয়ায় আবির্ভূত হবেন। আপনার দূতের আমি যথোপযুক্ত সম্মান করেছি। কিবতীদের মধ্যে বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিতা দুইটি বালিকা, কিছু কাপড় ও একটি খচ্চর পাঠাচ্ছি।” উল্লেখ্য যে উক্ত বালিকা দুইটির নাম ছিলো মারিয়া (মেরী) ও শিরিন। খচ্চরটির নাম ছিলো দুলদুল।

৪। হাবশাহ (আকসুম সাম্রাজ্য)

লোহিত সাগরের ওপারে সুদানের গা ঘেঁষে আজকের ইথিওপিয়া ও নিকটবতী অঞ্চল নিয়ে গঠিত ছিলো আকসুম সাম্রাজ্য। খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতকের গোড়ার দিকে আকসুম সাম্রাজ্যের সম্রাট ছিলেন এল্লা আসবেহা (Ella Asbeha)। তার সময়ে নাজরানে (তখন ইয়ামানের অংশ) হাবশীদের একটি সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়।

ইয়ামানের বানু হিমূইয়ার বংশীয় রাজা আবু কারব হাসসান ইবনু তুব্বান আসআদ ইয়াসরিবে এসে ইয়াহুদী ধর্ম গ্রহণ করেন। দেশে ফিরে তিনি লোকদেরকে ইয়াহুদী হবার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন। তার প্রথম ও দ্বিতীয় পুত্রের পর রাজা হন তৃতীয় পুত্র যুরআ যু-নাওয়াস। তিনি জোর করে লোকদেরকে ইয়াহুদী বানাতে থাকেন। এই সময় নাজরানে বহু সংখ্যক খৃষ্টান বসবাস করতো। তাদের নেতা ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনু সামের খৃষ্টীয় ৫২৩ সনে যু-নাওয়াস সসৈন্যে-নাজরান এসে খৃষ্টানদেরকে ইয়াহুদী হতে বলেন। তারা অস্বীকার করে। ফলে ইয়াহুদী সৈন্যগণ বড়োবড়ো গর্ত তৈরি করে সেগুলোতে আগুন জ্বেলে ২০ হাজার খৃষ্টানকে ফেলে হত্যা করে।

পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের সম্রাট আকসুম সাম্রাজ্যের সম্রাট এল্লা আসবেহকে এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতে বলেন।

খৃষ্টীয় ৫২৫ সনে সেনাপতি আরইয়াতের নেতৃত্বে হাবশী খৃষ্টানের ইয়ামান আক্রমণ করে রাজা যু-নাওয়াসসহ বহু ইয়াহুদীকে হত্যা করে। আরইয়াত ইয়ামানের মসনদে বসেন। পরে অন্যতম সেনাপতি আবরাহা তাঁকে হত্যা করে ইয়ামানের রাজা হয়। এই আবরাহা খৃষ্টীয় ৫৭১ সনে মাক্কার কা’বা গৃহ ধ্বংসের জন্য এগিয়ে এসে মুহাসসির নামক স্থানে বিধ্বস্ত হয়।

খৃষ্টীয় ৫৭১ সনে মাক্কার কা’বা গৃহ ধ্বংসের জন্য এগিয়ে এসে মুহাসসির নামক স্থানে বিধ্বস্ত হয়।

খৃষ্টীয় ৫৭১ সনের মুহাররাম মাসে আবরাহ বাহিনী পর্যুদস্ত হয়। আর ঐ বছরই রবিউল উলা মাসে মুহাম্মাদ (সা) জন্ম গ্রহণ করেন।

খৃষ্টীয় ৫৭২ মতান্তরে ৫৭৫ সনে ইরান সম্রাট প্রথম খসরুর শাসনকালে ইয়ামানে ইরানীদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।

খৃষ্টীয় ৬১০ সনে মুহাম্মাদ (সা) নবুওয়াত লাভ করেন। সেই সময় আকসুম সাম্রাজ্যের নাজাসী বা সম্রাট ছিলেন আসহামাহ। তিনিও ছিলেন একজন খৃষ্টান। তবে নায় পরায়ণ শাসক হিসেবে তার খ্যাতি ছিলো।

খৃষ্টীয় ৬১৫ সনে মাক্কার মুশরিকদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশে একদল মুসলিম হাবশাহ হিজরাত করেন। তারা সেখানে নিরাপত্তা লাভ করেন।

মাক্কার মুশরিক নেতৃবৃন্দ তাদেরকে ফেরত আনার জন্য আবদুল্লাহ ইবনু আবী রাবীয়াহ ও আমর ইবনুল আসকে দূত হিসেবে আসহামাহ-র নিকট পাতায় তাদের অভিযোগ শুনে সম্রাট মুসলিমদেরকে রাজ-দরবারে ডাকেন। মুসলিমদের পক্ষ থেকে জাফর ইবনু আবী তালিব (রা) বক্তব্য পেশ করেন। তার বক্তব্য শুনে সম্রাট মাক্কার দূতদেরকে ফেরত যেতে বলেন ও মুসলিমদেরকে তার সাম্রাজ্যে নিরাপদে বসবাস করতে দেন।

খৃষ্টীয় ৬২২ সনে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করেন। খৃষ্টীয় ৬২৮ সনে হুদাইবিয়ার সন্ধি হয়। অতপর মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) বিভিন্ন দেশের শাসকদের নিকট চিঠি পাঠাতে থাকেন। ইসলাম গ্রহণ করার আহবান জানিয়ে একটি চিঠিসহ তিনি আমর ইবনু উমাইয়াকে (রা) নাজাসী আসহামাহর নিকট পাঠান। আসহামাহ এই আহবানে সাড়া দিয়ে জাফর ইবনু আবী তালিবের (রা) নিকট ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি ষাটজন সংগীসহ তার পুত্রকে একটি জাহাজে করে মাদীনার উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। দু:খের বিষয় জাহাজ ডুবিতে সংগীগণসহ রাজকুমার প্রাণ হারান।

খৃষ্টীয় ৬৩১ সনে নাজাসী আসহামাহ ইন্তিকাল করেন।

খৃষ্টীয় ৬৩২ সনে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) ইন্তিকাল করেন।

৫। ইরান সাম্রাজ্য

আরব উপদ্বীপের পূর্ব সীমান্ত থেকে ভারতের পশ্চিম সীমান্ত ও উত্তরে আর্মেনিয়া পর্যন্ত ছিলো ইরান সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি।

খৃষ্টীয় ৫৩১ সন থেকে ৫৭৯ সন পর্যন্ত কিসরা (ইরান সম্রাটের উপাধি) প্রথম খসরু ইরান সাম্রাজ্য শাসন করেন। তার শাসন কালে খৃষ্টীয় ৫৭১ সনে আরব উপদ্বীপে মুহাম্মাদ (সা) জন্ম গ্রহণ করেন।

খৃষ্টীয় ৫৭১ সন থেকে ৬৯০ সন পর্যন্ত চতুর্থ হরমিজদ ইরানের কিসরা ছিলেন। খৃষ্টীয় ৫৯০ সনে দ্বিতীয় খসরু খসরু পারভেজ) অল্প সময়ের জন্য কিসরা হন। তার পর খৃষ্টীয় ৫৯০ সন ও ৫৯১ সনে কিসরা ছিলেন চতুর্থ বাহরাম।

দ্বিতীয় খসরু (খসরু পারভেজ) আবার মসনদ লাভ করেন খৃষ্টীয় ৫৯১ সনে। তখন থেকে ৬২৮ সন পর্যন্ত তিনি রাজ্য শাসন করেন। তার শাসনকালে খৃষ্টীয় ৬১০ সনে আরব উপদ্বীপে মুহাম্মাদ (সা) নবুওয়াত লাভ করেন। খৃষ্টীয় ৬২২ সনে তিনি ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করেন।

খৃষ্টীয় ৬২৮ সনে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) ও মাক্কার মুশরিকদের মধ্যে দশ বছর মিয়াদী একটি ‘যুদ্ধ নয় চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। অতপর মুহাম্মদ (সা) পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শাসকদের নিকট ইসলাম গ্রহণ করার আহবান সম্বলিত চিঠি প্রেরণ করেন।

ইরানের কিসরা দ্বিতীয় খসরুর (খসরু পারভেজ) উদ্দেশ্যে লিখিত চিঠি ইরান সাম্রাজ্যের বাহরাইন অঞ্চলের গভর্ণর মানযার ইবনু সাওয়া-র নিকট পৌছান মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর (সা) দূত আবদুল্লাহ ইবনু হুয়াইফাহ আসসাহমী (রা)। বাহরাইনের গভর্ণর মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর সা চিঠি দ্বিতীয় খসরুর (খসরু পারভেজ) নিকট পৌছান। চিঠি পড়ে কিসরা ভীষণ ক্ষেপে যান। তিনি মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর (সা) চিঠি টুকরা টুকরা করে ছিড়ে ফেলেন।

শুধু তাই নয় দাম্ভিক কিসরা দ্বিতীয় খসরু (খসরু পারভেজ) তার অন্যতম গভর্ণর ইয়ামানের বাযানকে নির্দেশ দেন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহকে (সা) গ্রেফতার করে তার নিকট পাঠাতে। বাযান দুইজন দূত পাঠান মাদীনায়। তারা মহানবীকে (সা) বলে, “ইরান সম্রাট আপনাকে তলব করেছেন। আপনি নির্দেশ অমান্য করলে আপনাকে ও আপনার দেশটিকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হবে।” মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) শান্তভাবে জবাব দেন, “তোমরা ফিরে যাও। তাকে এই সংবাদ জানাবে যে কিসরার মসনদ পর্যন্ত ইসলামী রাষ্ট্রের বিস্তৃতি ঘটবে।”

কিসরার নিকট এই বক্তব্য পৌছিয়ে দিয়ে দূতগণ যখন ইয়ামান পৌছে তখন তারা খবর পায় যে খসরু আপন পুত্র শিরওয়াহর হাতে নিহত হয়েছেন।

খৃষ্টীয় ৬২৮ সনে দ্বিতীয় খসরু নিহত হন। তার মৃত্যুর পর বিভিন্ন বিদ্রোহীদের উপদ্রবে ইরান সাম্রাজ্য টুকরো টুকরো হয়ে যায়।

খৃষ্টীয় ৬২৯ সনে রাজকুমারী বুরানদুখতকে মসনদে বসানো হয়। বুরানদুখত ইরানের সম্রাজী হওয়ার খবর শুনেই মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছিলেন, “সেই জাতি কখনো কল্যাণ পেতে পারেনা যেই জাতি রাষ্ট্র-পরিচালনার ভার কোন মহিলার ওপর ন্যস্ত করে।” খৃষ্টীয় ৬৩১ সন পর্যন্ত বুরানদুখত মসনদে আসীন ছিলেন। কিন্তু ইরান সাম্রাজ্যের দুৰ্গতি ঠৈকানোর জন্য তিনি কিছুই করতে পারেননি।

খৃষ্টীয় ৬৩২ সনে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) ইন্তিকাল করেন।

৬। চীন সাম্রাজ্য

খৃষ্টীয় ৫২০ সন থেকে ৫৭৭ সন পর্যন্ত চীনে অনেকগুলো ছোট ছোট রাজ্য ছিলো। ঐ সময় খৃষ্টীয় ৫৭১ সনে আরব উপদ্বীপে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) জন্মগ্রহণ করেন। খৃষ্টীয় ৫৭৭ সনে উত্তর চীনের রাজ্যগুলো পরস্পর যুক্ত হয়।

খৃষ্টীয় ৫৮১ সনে ইয়াং চিয়েন চীনে সুই রাজ বংশের শাসন কায়েম করেন। তিনি উত্তর চীনের মতো দক্ষিণ চীনেও তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। তিনি খৃষ্টীয় ৬০৪ সন পর্যন্ত চীন শাসন করেন।

সুই বংশের দ্বিতীয় সম্রাট ইয়াংতি খৃষ্টীয় ৬০৫ সন থেকে ৬১৮ সন পর্যন্ত দেশ শাসন করেন। ইয়াংতি যখন চীনের সম্রাট তখন খৃষ্টীয় ৬১০ সনে আরব উপদ্বীপে মুহাম্মাদ (সা) নবুওয়াত লাভ করেন।

খৃষ্টীয় ৬১৮ সনে লি-ইউয়ান চীনে তাঙ বংশের শাসন কায়েম করেন। তিনি খৃষ্টীয় ৬২৬ সন পর্যন্ত রাজ্য শাসন করেন। তার শাসনকালে আরব উপদ্বীপে মাদীনাতে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) খৃষ্টীয় ৬২২ সনে ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করেন।

উল্লেখ্য যে খৃষ্টীয় ৬২৬ সনে হাবশাহ (ইথিওপিয়া) থেকে আবু ওয়াক্কাস মালিক ইবনু ওহাইব (রা), কায়েস ইবনু হুযাইফা (রা), উরওয়াহ ইবনু আছাছা (রা), আবু কায়েস ইবনুল হারিস (রা) কিছু সংখ্যক হাবশী মুসলিমসহ দুইটি জাহাজে করে চীনে পৌছেন।

খৃষ্টীয় ৬২৬ সনে রাজকুমার লি-শিহ-মিন তার অন্যান্য ভাইদেরকে হত্যা করেন ও তার পিতাকে তার পক্ষে মসনদ ত্যাগ করতে বাধ্য করেন। তিনি তাই সুঙ উপাধি ধারণ করেন। তিনি খৃষ্টীয় ৬২৭ সন থেকে ৬৪৯ সন পর্যন্ত রাজ্য শাসন করেন। তার রাজত্বকালে আরবের মাদীনা ইসলামী রাষ্ট্রের প্রথম রাষ্ট্র প্রধান মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) খৃষ্টীয় ৬৩২ সনে ইন্তিকাল করেন।

চেরর রাজ্য

(মালাবার/কেরালা)

খৃষ্টীয় ৬১৭ সনে এক সন্ধ্যায় মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) মিনাতে অবস্থান করছিলেন। আকাশে সদ্য উচিত চাঁদ হঠাৎ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার একত্রিত হয়ে যায়।

ভারতের দক্ষিণ পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত চেরর অঞ্চলে প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা বর্ণনা থেকে জানা যায় চেরর রাজ চেরুমল পেরুমল ঐ সময় কোন উন্মুক্ত স্থানে অবস্থান করছিলেন। তিনি চাঁদ দ্বি-খণ্ডিত হওয়ার ঘটনাটি নিজের চোখে দেখেন। অতপর তিনি নৌ-পথে আরবের মাক্কায় পৌছে ইসলাম গ্রহণ করেন। সম্ভবত রাজা চেরুমল পেরুমল ও রাজা চেরামন মালিক একই ব্যক্তি। মাক্কা থেকে ফেরার পথে তিনি শফর নামক স্থানে ইন্তিকাল করেন। অল্পকালের মধ্যেই চেরর রাজ্যে ইসলামের প্রসার ঘটতে থাকে। সেখানে পরপর দশটি মসজিদ নির্মিত হয়। প্রথম মাসজিদ নির্মিত হয়েছিলো রাজধানী কর্ণক্লোর বা ক্রাঙ্গানুরে।

থানেশ্বর-কনৌজ রাজ্য

এক সময় উত্তর ভারতে মগধ নামে এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিলো। এই সাম্রাজ্যের রাজধানীর নাম ছিলো গিরিব্রজ বা রাজগ্রহ। পরবর্তী কালে পাটলীপুত্র হয় রাজধানী।

খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে এই বিশাল সাম্রাজ্য ভেংগে যায়। অনেকগুলো ছোট ছোট রাজ্য গড়ে উঠে। এইসব রাজ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলো মালব রাজ্য, থানেশ্বর রাজ্য, কনৌজ রাজা ও গৌড় রাজ্য।

কনৌজের রাজা গ্রহবর্মন থানেশ্বরের রাজা প্রভাকর বর্ধনের কন্যা রাজ্যশ্রীকে বিয়ে করেন। উভয় রাজ্যে সখ্যতা গড়ে উঠে। পরবর্তী কালে উভয় রাজ্য একীভূত হয়ে পড়ে।

খৃষ্টীয় ৬০৬ সনে থানেশ্বর-কনৌজ রাজ্যের রাজা হন হর্ষবর্ধন। তিনি বৌদ্ধবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। তার শাসনকালে আরব উপদ্বীপে খৃষ্টীয় ৬১০ সনে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) নবুওয়াত লাভ করেন।

খৃষ্টীয় ৬৩২ মাদীনা ইসলামী রাষ্ট্রের স্থপতি মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) ইন্তিকাল করেন। থানেশ্বর-কনৌজ রাজ্যের শাসক হর্ষবর্ধন মৃত্যু বরন করেন খৃষ্টীয় ৬৪৭ সনে।

৯। গৌড় রাজ্য

খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে মগধ (দক্ষিণ বিহার) ও পুঞ্জ বর্ধন রাজ্য মিলে গড়ে উঠে গৌড় রাজ্য।

সম্ভবত খৃষ্টীয় ৬০১ সনে গৌড় রাজ্যের রাজা হন শশাংক। রাজা শশাংক উগ্র ব্রাহ্মণ্যবাদী ছিলেন। তিনি বৌদ্ধ প্রজাদের ওপর অত্যাচারের ষ্টীম রোলার চালিয়ে ছিলেন।

তার শাসন যুগে খৃষ্টীয় ৬১০ সনে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) নবুওয়াত লাভ করেন। তিনি খৃষ্টীয় ৬২২ সনে মাদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করেন ও দশ বছর রাষ্ট্র পরিচালনা করে খৃষ্টীয় ৬৩২ সনে ইন্তিকাল করেন। রাজা শশাংক রাজা হর্ষবর্ধনের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। হর্ষবর্ধন গৌড় রাজ্যের অনেক অংশ দখল করে নিতে সক্ষম হন। রাজা শশাংক খৃষ্টীয় ৬৩৭ সনে মৃত্যু বরণ করেন।

সূত্র: মাসিক পৃথিবী পুরনো সংখ্যা

মতামত দিন

Solve : *
11 × 28 =