আখলাক ইসলামিক গল্প

তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ (প্রথম কিস্তি)

বিসমমিল্লাহির রহমানীর রহীম।

গ্রীষ্মের দাবাদাহে জনজীবন অতিষ্ঠ।মাঠ ঘাট ফেটে চৌচির। নদী খালবিল সব শুকিয়ে গিয়েছে। বৃষ্টির নামগন্ধও নেই। পানির সন্ধানে তৃষ্ণার্ত এক কাক অনেক ক্ষন থেকে ঘুরে বেড়াচ্ছে এদিক সেদিক। পানির দেখা নেই। বহু খোঁজাখুজির পর মাটির এক কলসি দেখতে পেল সে। ততক্ষনাত উড়ে গেল কলসির কাছে। পানি!পানি! তৃষ্ণার পানি! কিন্তু কলসির কাছে যেয়ে হতাশ হতে হল তাকে। পানি কিছু আছে বটে তবে তা একেবারেই কলসির তলানিতে। এই পানির নাগাল পাওয়া ঐ কাকের পক্ষে পাওয়া সম্ভব নয়।হায়! প্রাণটা বোধহয় আজকে গেল।

পানির আশা ছেড়ে দিয়ে কাছেরই একটা নিম গাছের ডাল লক্ষ্য করে উড়াল দিল। ডালে বসে জিরিয়ে নিল কিছুক্ষন। তারপর আবার পানির খোঁজে উড়াল দিতে যাবে এমন সময় চোখ পড়লো নিম গাছের নিচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নুড়ি পাথরের ওপর চোখ পড়লো। কিছুক্ষন স্থির হয়ে বসে প্ল্যান করে নিল।”প্ল্যানমতো কাজ করতে পারলে ঐ কলসির পানি পান করা সম্ভব হতেও পারে”। ভাবলো কাক।

ঠোঁটে একটা একটা করে নুড়ি পাথর নিয়ে কাক পানির কলসিতে ফেলতে লাগলো,আর পানির স্তর কলসির মুখের দিকে একটু একটু করে উঠে আসতে লাগলো। যথেষ্ট পরিমান পাথর ফেলার পর পানি কলসির একেবারে মুখের কাছে চলে আসলো আর কাক বাবাজীও জান ভরে পানি পান করলো।

আহ! জীবন শান্তি!

দুই.

যুদ্ধক্ষেত্রে যে কোন সামরিক অভিযানের পরিকল্পনাগুলো এমন ভাবে করা  হয় যেন খুব কম সময়ের মধ্যে  শত্রুর হেড কোয়ার্টার  দখল করে নেওয়া যায় বা শত্রুর লীডারকে খতম করে দেওয়া যায়। একবার শত্রুবাহিনীর  কমান্ডারকে হত্যা করতে পারলে বা হেড কোয়ার্টারের নিয়ন্ত্রন নিতে পারলে বাকী কাজ পানির মতো সহজ।

শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। আল্লাহ (সুবঃ) কুরআনে বারবার সতর্ক করে দিয়েছেন ,” ঈমানদার গন! তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও এবং শয়তানের পদাংক অনুসরণ কর না। নিশ্চিত রূপে সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। [সূরা বাকারাঃ ২০৮] “

হে বনী-আদম! আমি কি তোমাদেরকে বলে রাখিনি যে, শয়তানের এবাদত করো না, সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু? এবং আমার এবাদত কর। এটাই সরল পথ। শয়তান তোমাদের অনেক দলকে পথভ্রষ্ট করেছে। তবুও কি তোমরা বুঝনি? [সূরা ইয়াসীনঃ ৬০-৬২]

মানুষের জন্ম থেকে শুরু করে সাকরাতুল মাউত  পর্যন্ত মানুষের সংগে শয়তানের লড়াই চলতেই থাকে। শয়তান নানা ছলে বলে কৌশলে চেষ্টা চালাতে থাকে মানুষকে পরাজিত করবার।ক্বলব বা হৃদয়কে তুলনা করা যেতে পারে মানুষের হেড কোয়ার্টার হিসেবে। ক্বলব বা হৃদয় দখল করতে পারলেই খেল খতম।

হাদীসের ভাষ্যেও অনেকটা এরকম এসেছে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ”  মানুষের শরীরে এমন একটি গোশত পিন্ড রয়েছে যা ঠিক থাকলে  পুরো শরীর ঠিক থাকে ; আর তা যদি নষ্ট হয়ে যায় তা হলে পুরো শরীর নষ্ট হয়ে। আর তা হল ক্বলব বা হৃদয়”। (বুখারী ও মুসলিম)

ক্বলব বা হৃদয় ঠিক থাকলে ঈমান আমল সবই ঠিক থাকবে আর ক্বলব কলুষিত থাকলে ঈমান আমলের বারোটা বেজে যাবে।

শয়তান তাই প্রথমেই আপনার হৃদয়ের দখল নিয়ে নিতে চায়,যেন আপনাকে ইচ্ছেমত নাকে ছড়ি দিয়ে ঘোরানো যায়।  চোখের দৃষ্টি হল শয়তানের তুরুপের তাস।  এর  মাধ্যমে সে আরামসে আপনার হৃদয়ের দখল নিতে পারে।

আপনার রব আপনাকে অত্যন্ত ভালোবাসেন।আপনাকে যেন শয়তান তার খেলার পুতুল না বানাতে পারে একারনে তিনি কুর’আনে বেশ কয়েক জায়গায় টিপস দিয়েছেন।

ইরশাদ হচ্ছে,

” মুমীনদেরকে বলে দিন,তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাযত করে”। (সূরা নুর: আয়াত ৩০)

এরপরের আয়াতে আল্লাহ (সুবঃ) বলছেন,” ঈমানদার মহিলাদেরকে বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে”। (সূরা নুরঃআয়াত ৩১)

আল্লাহ (সুবঃ) মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি মানুষকে মানুষের নিজের চেয়েও ভালোমতো চেনেন।তিনি জানেন মানুষ চোখের হেফাজত করতে, পর্দা করতে ভুলে যাবে। তাই তিনি কুরআনে বারবার  মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। অনেকটা জিহাদ এবং সাওমের মতো। আল্লাহ (সুবঃ) জানেন যে মানুষকে একবার বললেই মানুষ সাওম পালন করবে। তাই সমগ্র কুরআনে তিনি মাত্র একবার সাওম পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। অপরদিকে বেশ কিছু আয়াতে জিহাদের আদেশ দিয়েছেন কারণ মানুষ জিহাদের ব্যাপারে উদাসীন। ইরশাদ হচ্ছে, ” আর তোমাদের কি হল যে, তেমারা আল্লাহর রাহে লড়াই করছ না দুর্বল সেই পুরুষ, নারী ও শিশুদের পক্ষে, যারা বলে, হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদিগকে এই জনপদ থেকে নিষ্কৃতি দান কর; এখানকার অধিবাসীরা যে, অত্যাচারী! আর তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য পক্ষালম্বনকারী নির্ধারণ করে দাও এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য সাহায্যকারী নির্ধারণ করে দাও।”( সুরা নিসাঃআয়াত ৭৫)

কুরআনে চোখের হেফাজতের ওপরে এত জোর দেওয়া স্বত্তেও আমরা এই ব্যাপারে চরম মাত্রার উদাসীন। গায়েই লাগাইনা আয়াত গুলো। কিছু মনেই করিনা।

ইনবক্সে প্রায়ই ভাইদের নক পাই। ভাইয়েরা বেশ হতাশ কন্ঠে জানান,”অনেক চেষ্টা করেও পর্ন দেখা বা মাস্টারবেট করা ছাড়তে পারলাম না। আপনাদের দেওয়া সব টিপস ফলো করার পরেও এই জঘন্য পাপগুলো থেকে বাঁচতে পারলাম না। অবস্থার কিছুটা উন্নতি অবশ্য হয়েছে,আগে যেখানে প্রত্যেকদিন করতাম এখন কয়েকদিন গ্যাপ দিয়ে করি”।

“গাইরে মাহরামদের সংগে উঠাবসা আছে? গান শোনেন বা মুভি সিরিয়াল দেখেন?”

উত্তর আসে,”জ্বী”।

“এই গুলো বন্ধ করতে হবে”

“মুভি সিরিয়াল দেখলে কি এমন সমস্যা ভাই? আর রাস্তা দিয়ে কোন ডানাকাটা পরী হেঁটে  গেলে ঘাড় ঘুরিয়ে না হয় একবার দেখলামই।  এতে কি এমন ক্ষতি হল?  আল্লাহর কি অপরূপ  সৃষ্টি, মাশা আল্লাহ!”

শুধুমাত্র এই চোখের হেফাজতের ব্যাপারে উদাসীনতার কারনে ভাইয়েরা পর্ন দেখা বা মাস্টারবেশন ছাড়তে পারেননা। বিস্তারিত আলোচনা করা যাক।

এই লিখার শুরুতে এক তৃষ্ণার্ত কাকের গল্প বলা হয়েছিল।  মনে আছে কাক কিভাবে কলসির তলানির পানি খেয়েছিল? একটা একটা করে নুড়ি ফেলেছিল আর পানি একটু একটু করে ওপরে উঠছিল। তারপর একসময় কাকের নাগালে পানি পৌঁছে গিয়েছিল।শয়তান আপনার হৃদয়ের দখল অনেকটা এভাবেই নেয়। একবারেই সে দখল করতে পারে না,  ধীরে ধীরে একটু একটু করে সে হৃদয় দখল করতে থাকে। আর তার নুড়ি পাথর হল আপনার চোখের অনিয়ন্ত্রিত দৃষ্টি। হাদীসে অনিয়ন্ত্রিত দৃষ্টিকে শয়তানের বিষাক্ত তীরের সংগে তুলনা করা হয়েছে। এটা এমন এক বিষাক্ত তীর, যা আপনার হৃদয়কে এফোঁড়ওফোঁড় করে দিবে।

মনে করুন, আপনি রাস্তায় কোন এক মেয়ের দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকলেন, শয়তান আপনার হৃদয়ের কিছুটা দখল পেল, গান দেখলেন শয়তান, হৃদয়ের আরেকটু দখল পেল, মুভি দেখলেন,মুভির নায়িকার ওপর ছোট খাটো একটা ক্রাশ খেলেন শয়তান আপনার হৃদয়ের আরো কিছুটা দখল পেল। এভাবে শয়তান একসময় আপনার পুরো হৃদয় দখল করে নেবে এবং আপনাকে দিয়ে সে তার যা মন চায় তা করিয়ে নেবে।

চোখের অনিয়ন্ত্রিত দৃষ্টি পর্ন দেখা বা মাস্টারবেশনের ট্রিগার হিসেবে কাজ করে। আপনি  একটা মুভি দেখতে বসলেন বা গান দেখতে,পর্ন দেখা বা মাস্টারবেশনের কোন ইচ্ছেই আপনার ছিল না,  কিন্তু মুভি/ গানের কোন দৃশ্য দেখে আপনি মাস্টারবেট করে ফেলেছেন বা পর্ন দেখেছেন, হয়েছে না এরকম অনেকবার? মাঝে মাঝে এরকমও তো হয় কোন মেয়েকে দেখার সংগে সংগেই  পর্নস্টারের কথা মনে হয়ে যায় বা  পর্নমুভির কোন দৃশ্য মাথায় ঘুরতে শুরু করে, তারপর আর সহ্য করতে না পেরে আপনি পর্ন দেখেন বা মাস্টারবেট করেন,তাইনা?

জিএফের সংগে ডেটিং করে আসার পর কিংবা জাস্ট ফ্রেন্ড,কাজিনদের সংগে হ্যাং আউট করার পর গভীর রাতে বা অন্য কোন অলস মুহূর্তে আপনি তাদের নিয়ে সেক্স ফ্যান্টাসিতে ডুবে যাননি, মাস্টারবেট করে নিজেকে শান্ত করেননি? অস্বীকার করে কি লাভ ভাই?

একবার চিন্তা করুন, আপনি যদি শুধুমাত্র চোখের হেফাযত করতে পারতেন তাহলে কতো অজস্র বার কতো অজস্র বার আপনি পর্ন দেখা বা মাস্টারবেশনের হাত থেকে বাঁচাতে পারতেন নিজেকে!  আপনার শরীরের এই বিশাল ক্ষতি হয়ে যেত না! ভবিষ্যত জীবন সংগিনীর কথা ভেবে এতো টেনশন অস্থিরতায় ভুগতে হতোনা।

একরাশ বিপদের মাঝখানে বসে পুরোনো দিনের কথা ভেবে আপনাকে হা হুতাশও করতে হতোনা।

আরবের এক কবি যথার্তই বলেছেন,

” আর তুমি কি জানো, কখন শুরু হয়েছিল তোমার দুঃখের কাহিনী?

যখন তোমার চোখ পড়েছিল সেই রূপসীর ওপর।

চলবে ইনশা আল্লাহ…..

Original Source

মতামত দিন

Solve : *
36 ⁄ 18 =