কুরআনের মতো একটি গ্রন্থ রচনার সম্ভাবনা প্রসঙ্গে

কুরআনের মতো একটি গ্রন্থ রচনার সম্ভাবনা প্রসঙ্গে

লেখক: এ কে মোহাম্মদ আলী

বিগত শতাব্দীর আশির দশকে মিসরের কম্পিউটার বিজ্ঞানী ড. রাশেদ আল খলিফা পবিত্র কুরআনকে কম্পিউটারে বাণীবদ্ধ করে অনেক প্রশ্নত্থাপন করেন। তার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল ১৯ সংখ্যার ভিত্তিতে কুরআন রচনা করা সম্ভব কি না?

উত্তরে কম্পিউটার জানায় এরূপ বুননের মাধ্যমে তা সংঘটিত হওয়ার সম্ভবনা হলো৬২৬,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০ভাগের একভাগ। অর্থাৎ কুরআনের মতো গ্রন্থ ১৯ সংখ্যার ভিত্তিতে রচনা করতে গেলে উপরোক্ত সংখ্যার গ্রন্থ রচনা করতে হবে;একটি গ্রন্থ পবিত্র কুরআনের মতো হলেও হতে পারে। উল্লেখ্য যে,পবিত্র কুরআনের ১৯ সংখ্যাভিত্তিক গ্রন্থ নিয়ে অনেক বই দেশে ও বিদেশে প্রকাশিত হয়েছে এবং এসব বইয়ের মূল তথ্যসূত্র হলো ড. রাশেদ আল খলিফা কর্তৃক কম্পিউটারের মাধ্যমে সৃষ্ট এই গুরুত্বপূর্ণ আবিস্কার।

 

যা হোক, উপরোক্ত সংখ্যাটিকে বলা হয়, ৬২৬ সেপ্টেলিয়ন ভাগের একভাগ,অর্থাৎ ৬২৬ এর পরে চব্বিশটি শুন্য দিলে যা হল তার একভাগ। এখন কথা হল আমরা জানি,পবিত্র কুরআনে কম বেশি ৬৬৬৬টি আয়াত আছে। এবং ঐ আয়াতগুলিতে কমবেশি ৮,৬৪,৪৩০ শব্দ আছে। আর ৮,৬৪,৪৩০টি শব্দ সম্বলিত গ্রন্থ প্রতিদিন যদি একটি করেও রচনা করা হয়,তাহলে ৬২৬,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০টি গ্রন্থ রচনা করতে সময় লাগবে ১,৭১৫,০৬৮,৪০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০ বছর। কম্পিউটারের মতে ১৯ এর গাণিতিক বুননের ভিত্তিতে পবিত্র কুরআন এর মতো গ্রন্থ রচনা আকস্মিকভাবে ঘটাতে হলে যে সময়ের প্রয়োজন হবে,সে সময়ের মধ্যে বহু লক্ষকোটি পৃথিবীই নয়;বরং বহু লক্ষকোটি মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়ে যাবে এবং বহু মহাবিশ্ব লয়ও পেয়ে যাবে। কিন্তু পবিত্র কুরআনের মতো গ্রন্থ রচনা করা যাবে না। তাই কম্পিউটার স্বীকার করেছে যে,পবিত্র কুরআনের মতো কোন গ্রন্থ রচনা করা কোন দিনই সম্ভব নয়।

যুগের জ্ঞান প্রসারের সাথে সাথে বর্তমানে এই পবিত্র কুরআন সম্পর্কে নতুন নতুন তথ্য উম্মোচিত হ্থতে চলেছে যা মানুষের মাঝে এক ঝলক আলোর রেখা প্রতিফলিত করেছে। পবিত্র কুরআনের শাব্দিক সামঞ্জস্য হল এই আলোর উপাদান। বিষয়টি বিশ্লেষণের জন্য প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ডঃ তারেক আল সুইদান গবেষলব্ধ কর্মের মাধ্যমে পবিত্র কুরআনে কিছু সামঞ্জস্যপূর্ণ শব্দের সহাবস্থান বের করতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি একটি ইমেইল http://www.ummah.net মাধ্যমে তার প্রকাশিত তথ্যটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন,কুরআনে এমন কিছু শব্দ আছে যা একটির বিপরীতে অন্য আর একটি শব্দ সমানভাবে বিদ্যমান।

 

যেমন পুরুষ বা রিজাল শব্দটি পবিত্র কুরআনে এসেছে ২৪ বার। তার বিপরীত শব্দ স্ত্রী বা ইমরাআহ শব্দটিও এসেছে ২৪বার। একটি কমও নয় বা একটি বেশিও নয়। এ সম্পর্কে আরো কিছু শব্দ তার তথ্য থেকে উদ্ধৃত করা যেতে পারেঃ

 

(1)   আমাদের দুনিয়ার জীবন ব্যাবস্থার সাথে আখেরাতের জীবন ব্যবস্থা ওতপ্রোতভাবে জড়িত বলেই দুনিয়া শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে ১১৫ বার এবং আখেরাত শব্দটিও ব্যবহৃত হয়েছে ১১৫ বার।

 

(2)  মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে জীবনের সাথে মৃত্যুর প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন তাই আল-হায়াতশব্দ উল্লেখ করা হয়েছে ১৪৫ বার এবং আল-মাউতশব্দ উল্লেখ করা হয়েছে ১৪৫ বার।

 

(3)  মালাইকাহশব্দ (ফেরেশতা) বলা হয়েছে ৮৮ বার এবং শায়াত্বীন (শয়তান) বলা হয়েছে ৮৮ বার।

 

(4)   পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে,পৃথিবীতে এমন কোন জাতি নেই, যে জাতির কাছে আমি রাসূল পাঠাইনি। সেই সূত্রে উম্মাহ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে ৫০ বার। অনুরূপ রাসূল শব্দটিও ব্যবহার করা হয়েছে ৫০ বার।

 

(5)   ইবলিশশব্দটি কুরআনে ব্যবহার করা হয়েছে ১১ বার এবং ইবলিশ থেকে আ্‌শ্রয় চাওয়ার জন্য বলা হয়েছে ১১ বার।

 

(6)  মুছিবতশব্দটি বলা হয়েছে ৭৫ বার আর মুছিবত থেকে আল্লাহর রহমতে উদ্ধারের পর শুকরিয়া আদায় করার জ্‌ন্য শুকরিয়া শব্দটি উল্লেখ করা হয়েছে ৭৫ বার।

 

(7) পবিত্র কুরআনে বিপথগামী জাতির কথা বলা হয়েছে ১৭ বার। আর মহান আল্লাহর কাছে বিপথগামী জাতিরাই হচ্ছে মৃত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত। অতএব, মৃত জাতির কথা বলা হয়েছে ১৭ বার।

 

(8)  মুসলমান ও জিহাদ একে অপরের পরিপূরক বলেই কি মহান আল্লাহ মুসলিম শব্দটি ৪১ বার এবং জিহাদ শব্দটিও ৪১ বার ব্যবহার করেছেন।

 

(9) যাকাত শব্দটির গুঢ় অর্থ পবিত্রকরণ। এটি ব্যবহৃত হয়েছে ৩২ বার। সম্পদের যাকাত প্রদান করলে মহান আল্লাহ ধন-সম্পদে বরকত প্রদান করেন বলেই কি পবিত্র কুরআনে বরকত শব্দটি উল্লেখ করছেন ৩২ বার?

 

(10)   আমাদের রাসূল মুহাম্মদ (ছাঃ) হলেন এই দুনিয়ায় শরীয়াহ প্রচলনের মূল। এই জন্যই বোধ হয় মুহাম্মাদ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে ৪ বার এবং শরীআহ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে ৪ বার।

 

সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হল, আমাদের এই পৃথিবীতে পানি-মাটির অবস্থান। আমরা সাধারণভাবে জানি, এই পৃথিবীর তিনভাগ জল আর একভাগ স্থল। কিন্তু সূক্ষ্ণ হিসাব কেউ জানেন কি?প্রায় ১৫০০ বছর আগে পবিত্র কুরআন সুক্ষ্ণাতিসুক্ষ্ণ হিসাব দিয়েছে। তা দেখে আজকের ভূগোলবিদ স্তম্ভিত। পবিত্র কুরআনে আল-বাহরবা সমূদ্র শব্দটি এসেছে ৩২ বার। তার বিপরীত শব্দ আল-বারবা স্থল-মাটি শব্দটি এসেছে ১৩ বার। অর্থাৎ এই জল-স্থল বা মাটি-পানি অর্থাৎ ৩২+১৩ মিলিয়ে আমাদের এই পূর্ণ পৃথিবী। ৩২+১৩=৪৫ স্থল ১০০% পৃথিবী। এবার হিসাব কষে পানির পরিমাণ বের করে নিন। সাথে একটি শক্তিশালী ক্যালকুলেটর থাকলে ভাল হয়। পানির পরিমাণ হল ৩২/৪৫*১০০%=৭১.১১১১,১১১১। অর্থাৎ পৃথিবীতে পানির পরিমাণ হল ৭১.১১১১,১১১১ ভাগ। এবার মাটির পরিমাণ বের করা যাক। মাটির পরিমাণ ১৩/৪৫*১০০%=২৮.৮৮৮৮,৮৮৮৯। আর এটাই হচ্ছে সামগ্রিকভাবে জল ও স্থলের সুক্ষ্ণ হিসাব যা বর্তমান যুগে বৈজ্ঞানিকদের নিকট প্রতিষ্ঠিত।

আল-কুরআনের অলৌকিকত্ব কোনদিনই শেষ হবে না। পবিত্র কুরআনের সম্পূর্ণ জ্ঞান অর্জন মানুষের মানুষের কাছে সম্ভব কি-না তা মহান আল্লাহই ভাল জানেন। মহান আল্লাহই তাঁর কুরআনের জ্ঞান এবং এর অলৌকিকত্ব ধীরে ধীরে উম্মোচন করবেন। সমপরিমাণ শব্দ সম্ভার দিয়ে এমন অংকের হিসাবে,বিপূল অর্থবোধক অসাধারণ সুন্দর ও লক্ষ্যভেদী কোন বই বা গ্রন্থ রচনা করা একমাত্র মহান আল্লাহ ছাড়া আর কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। এই জন্যই পবিত্র কুরআন অলৌকিক। এই জন্যই মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেছেন,

قُلْ أَرَأَيْتُمْ إِن كَانَ مِنْ عِندِ اللَّهِ ثُمَّ كَفَرْتُم بِهِ مَنْ أَضَلُّ مِمَّنْ هُوَ فِي شِقَاقٍ بَعِيدٍسَنُرِيهِمْ آيَاتِنَا فِي الْآفَاقِ وَفِي أَنفُسِهِمْ حَتَّىٰ يَتَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُ الْحَقُّ ۗ أَوَلَمْ يَكْفِ بِرَبِّكَ أَنَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ

’বল তোমরা ভেবে দেখেছ কি,যদি এই কুরআন আল্লাহর নিকট হ্থতে অবতীর্ণ হয়ে থাকে (আসলে বাস্তবেও এটাই)। আর তোমরা ইহা প্রত্যাখ্যা্‌ন কর,তবে যে ব্যাক্তি ঘোর বিরুদ্ধাচারণে লিপ্ত,তার অপেক্ষা অধিক বিভ্রান্ত আর কে?আমি তাদের জন্য আমার নিদর্শনাবলী ব্যক্ত করব। বিশ্বজগত ও তাদের নিজেদের মধ্যে। ফলে তাদের নিকট সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে যে,উহাই (আল কুরআন) সত্য। আপনার পালনকর্তা সর্ববিষয়ে সাক্ষ্যদাতা, এটা কি যথেষ্ট নয়? (সূরা ফুসসিলাত, আয়াত নং ৫২-৫৩)

পরিশেষে পবিত্র কুরআন যে অলৌকিক তা এই বিশ্বলোকে ধীরে ধীরে প্রস্ফুটিত হয়ে উঠবে মানুষের মাঝে। কারণ আল্লাহর বাণীর কোন পরিবর্তন নেই।(লা তাবদীলা লি কালিমাতিল্লাহ)।

About wj_admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Solve : *
48 ⁄ 24 =