তাওহীদ

কালিমা শাহাদাত ও এর শর্ত (পর্ব-১)

লেখক : সানাউল্লাহ নজির আহমদ

ইসলামের গোড়া পত্তন হয়েছে শিরকের কলঙ্ক ও পৌত্তলিকতার নোংড়ামী মুক্ত খাঁটি, নিভের্জাল তাওহিদ তথা একত্ববাদের উপর। যার রূপকার لاإله إلا الله ও محمد رسول الله এর শাহাদাত বা সাক্ষ্য প্রদান।

لاإله إلا الله এর শাহাদাতের উদ্দেশ্য: বিনয়-নম্র ভাবে নিজেকে আল্লাহর সমীপে সপে দেয়া, তার বশ্যতা মেনে নেয়া। তিনি এক তার কোন শরীক নেই, এটা ঘোষণা দেয়া।

محمد رسول الله এর শাহাদাতের উদ্দেশ্য: নিজেকে সপে দেয়ার পদ্ধতি ও এবাদতের বিশদ বর্ণনা মুহাম্মদ সা. এর নিকট হতে গ্রহণ করা। উভয় শাহাদাতের মৌখিক উচ্চারণ ইসলাম গ্রহণ ও ইসলামকে আলিঙ্গন করার বহিঃপ্রকাশ।

ক্বিয়ামতের দিন দুইটি প্রশ্নের উত্তর না দেয়া পর্যন্ত কোন আদম সন্তান স্বীয় অবস্থান ত্যাগ করতে পারবে না।

প্রথম প্রশ্ন : তোমরা কার ইবাদাত করতে ?

দ্বিতীয় প্রশ্ন : রসূল সা.কে কি জাওয়াব দিয়েছ ?

প্রথম প্রশ্নের উত্তর : ইলম তথা আল্লাহর পরিচয় লাভ, মৌখিক স্বীকৃতি প্রদান এবং আমলের মাধ্যমে لاإله إلا الله এর বাস্তবায়ন।

দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর: ইলম তথা রসূল সা. এর পরিচয় লাভ, মৌখিক স্বীকৃতি প্রদান এবং আনুগত্যের মাধ্যমে محمد رسول الله এর বাস্তবায়ন।

لاإله إلا الله এর সাক্ষ্য প্রদানের তাৎপর্য :

সংবেদনশীল, তাৎপর্যপূর্ণ এ সাক্ষ্য প্রদানের অর্থ হল: ‘সত্যিকারার্থে আল্লাহ ছাড়া কেউ এবাদতের উপযুক্ত নয়। যেহেতু একমাত্র আল্লাহ তাআলা সৃষ্টিকর্তা, অধিপতি, রিযিকদাতা, কল্যাণ সাধনকারী, ক্ষতিসাধনকারী ও পরিচালনাকারী, সেহেতু আল্লাহ তাআলার প্রাপ্য বান্দা স্বীয় নিবেদন, আশা, ভয়, মহববত, মীমাংসা, ভরসা এবং সমস্ত কর্মকান্ডের ব্যাপারে একমাত্র তার শরণাপন্ন হবে, অন্য কারো নয়।

শাহাদাতের মূল ভিত্তি :

শাহাদাত বা لاإله إلا الله এর সাক্ষ্য মূল দুইটি ভিত্তির উপর নির্ভরশীল—

১. প্রত্যাখ্যান।

২. স্বীকৃতি প্রদান।

لاإله : প্রত্যাখ্যান। অর্থাৎ এবাদতের উপযুক্ত যে কোনো উপাস্যের অস্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা, একমাত্র আল্লাহ তাআলা ব্যতীত।

إلا الله : স্বীকৃতি প্রদান। একমাত্র আল্লাহ তাআলাই এবাদতের উপযুক্ত অন্য কেউ নয়, এর স্বীকৃতি প্রদান করা।

لاإله إلا الله এর শর্ত সমূহ :

আলোচিত কালেমায়ে তাওহিদ জান্নাতে প্রবেশের চাবি স্বরূপ, জাহান্নাম তাতে মুক্তির ঢাল স্বরূপ। এরশাদ হচ্ছে-

من ماة وهو يعلم أن لاإله إلا الله دخل الجنة.

‘‘যে لاإله إلا الله(অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবূদ নেই) এর অর্থ, তাৎপর্যের জ্ঞান নিয়ে মৃত্যু বরণ করল সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’’

রসূল সা. আরো বলেন-

إن الله حرم على النار من قال لاإله إلا الله يبتغي بذلك وجه الله.

‘‘অবশ্যই আল্লাহ তাআলা ঐ ব্যক্তির উপর জাহান্নাম হারাম করে দিয়েছেন, যে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যে لاإله إلا الله কালিমাটি পাঠ করেছে।’’

আফসোস! অনেক মানুষ কালেমায়ে শাহাদাত শুধু মুখে উচ্চারণ করে পরমানন্দে নিশ্চিন্ত বসে আছে, অথচ এর শর্ত, এর দাবী বাস্তবায়ন যে কত অপরিহার্য তা একেবারে বেমালুম ভুলে আছে। ওহাব ইবনে মুনাবিবহ রহ.কে প্রশ্ন কর হয়েছিল,

أليس لاإله إلا الله مفتاح الجنة؟ قال: بلى، ولكن ما من مفتاح إلا وله أسنان، فإن جئت بمفتاح له أسنان فتح لك، وإلا لن يفتح لك.

لاإله إلا الله কি জান্নাতের চাবি নয়? তিনি উত্তর দিলেন- অবশ্যই। তবে প্রতিটি চাবির কিন্তু দাঁত থাকে। যদি তুমি দাঁত আছে এমন চাবি নিয়ে আস, তোমাকে দরজা খুলে দেয়া হবে। অন্যথায় দরজা খুলে দেয়া হবে না।

কতেক প্রজ্ঞাময় ওলামায়ে কেরাম নিম্নের পংতির মাধ্যমে لاإله إلا اللهএর শর্তগুলো একত্রিত করে বর্ণনা করে দিয়েছেন।

علم يقين وإخلاص وصدقك محبة وانقياد والقبول لها.
وزيد ثامنها الكفران منك بما سوى الإله من الأوثان قد ألها.

 

১.ইলম।

২.দূঢ় বিশ্বাস।

৩.ইখলাছ।

৪.সততা আন্তরিকতা।

৫.ভালবাসা।

৬.আত্নসমর্পণ।

৭. لاإله إلا الله কে মনে প্রাণে গ্রহণ করা।

৮. আল্লাহর বিপরীতে উপাস্য সকল মূর্তি পত্যাখ্যান করা।

আটটি মূল ভিত্তির উপর সামান্য আলোকপাত :

১. এই কালেমার অর্থ, আবেদন ও দাবী সর্ম্পকে জ্ঞান অর্জন করা, অজ্ঞতা পরিহার করা :

বান্দাকে অবশ্যই জানতে হবে لاإله إلا الله (প্রত্যাখ্যান ও গ্রহণ) অস্বীকৃতি ও স্বীকৃতি দুইটি বিষয়ের সমন্বয়। এই কালিমার দাবি হচ্ছে- আল্লাহ ছাড়া যে কোন জিনিসের এবাদতের উপযুক্ততা প্রত্যাখ্যান করা এবং একমাত্র আল্লাহ তায়ালার জন্য স্বীকৃতি প্রদান করা। এরশাদ হচ্ছে-

فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْبِك.َ (سورة محمد:১৯)

‘জেনে রাখুন, আল্লাহ তাআলা ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। ক্ষমা প্রার্থনা করুন আপনার ত্রুটির জন্যে।’[i]

রসূল সা. বলেছেন-

من ماة وهو يعلم أن لا إله إلا الله دخل الجنة.

‘যে ব্যক্তি لاإله إلا الله এর তাৎপর্য ও অর্থ জানাবস্থায় মারা গেল, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’

২. এই কালেমার উপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখা, সংশয়-সন্দেহ পরিত্যাগ করা:

لاإله إلا الله এর অর্থ ও তাৎপর্যকে দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করার মানে, এর ব্যাপারে কোনো ধরনের সংশয়, সন্দেহ বা কিংকর্তব্য বিমূঢ়তার বিন্ধুমাত্র শংমিশ্রন থাকতে পারবে না। এরশাদ হচ্ছে-

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آَمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوا وَجَاهَدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أُولَئِكَ هُمُ الصَّادِقُونَ ﴿15﴾. (سورة الحجرات:১৫)

‘তারাই মুমিন, যারা আল্লাহ ও তার রসূলের প্রতি ঈমান আনার পর সন্দেহ পোষণ করে না এবং আল্লাহর রাস্তায় ধন-সম্পদ ও জীবন দ্বারা জেহাদ করে। তারাই সত্যনিষ্ঠ।’[ii]

রসূল সা. আবূ হুরায়াকে বলেন,

يا أبا هريرة اذهب بنعلي هاةين- وأعطاه نعليه- فمن لقية من وراء هذاالحائط يشهد أن لا إله إلا الله مسةيقنا بها قلبه فبشره بالجنة.

‘হে আবূ হুরায়রা! তুমি আমার এ দু’টি জুতো নিয়ে যাও- তাকে জুতো দু’টি প্রদান করলেন- এ দেয়ালের ওপাশে অন্তরের অন্তস্থল হতে দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে لاإله إلا الله এর সাক্ষ্য প্রদানকারী যার সাথেই তুমি সাক্ষাত করবে তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও।’

৩. এই কালেমার আবেদন ও দাবী স্বতঃস্ফুর্ত গ্রহণ করা, প্রত্যাখ্যান না করা :

অন্তর ও অঙ্গ-প্রতঙ্গের মাধ্যমে এই কালেমার আবেদন সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করা। যে ব্যক্তি এই কালেমার আবেদনকে প্রত্যাখ্যান করবে, আন্তরিক ভাবে মেনে না নিবে সে কাফের। সাধারণত প্রত্যাখ্যান করা হয়ে থাকে অহংকার, বিরোধিতা, হিংসা, বাপ-দাদার অন্ধানুকরণ ইত্যাদি কারণে। যেমন পবিত্র কুরআনের ভাষায় অহংকার বশত لاإله إلا الله এর অর্থ ও তাৎপর্যকে প্রত্যাখ্যানকারী কাফেরদের ঔদ্ধত্য প্রকাশ সম্পর্কে হয়েছে। এরশাদ হচ্ছে-

إِنَّهُمْ كَانُوا إِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ يَسْتَكْبِرُونَ ﴿35﴾ وَيَقُولُونَ أَئِنَّا لَتَارِكُوا آَلِهَتِنَا لِشَاعِرٍ مَجْنُونٍ ﴿ سورة الصافات:35-36﴾

‘‘তাদের যখন বলা হত আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, তখন তারা ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করত এবং বলত, আমরা কি এক উন্মাদ কবির কথায় আমাদের উপাস্যদের পরিত্যাগ করব?’’[iii]

অতীত উম্মাতের ভিতর যারা এই কালেমার আহবান প্রত্যাখ্যান করেছে, আন্তরিক ভাবে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, তাদের থেকে নেয়া প্রতিশোধ চিত্র পবিত্র কুরআনে তুলে ধরা হয়েছে। এরশাদ হচ্ছে-

وَكَذَلِكَ مَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ فِي قَرْيَةٍ مِنْ نَذِيرٍ إِلَّا قَالَ مُتْرَفُوهَا إِنَّا وَجَدْنَا آَبَاءَنَا عَلَى أُمَّةٍ وَإِنَّا عَلَى آَثَارِهِمْ مُقْتَدُونَ ﴿23﴾ قَالَ أَوَلَوْ جِئْتُكُمْ بِأَهْدَى مِمَّا وَجَدْتُمْ عَلَيْهِ آَبَاءَكُمْ قَالُوا إِنَّا بِمَا أُرْسِلْتُمْ بِهِ كَافِرُونَ ﴿24﴾ فَانْتَقَمْنَا مِنْهُمْ فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُكَذِّبِينَ ﴿25﴾. (سورة الزخرف:23-25)

‘এমনি ভাবে আপনার পূর্বে আমি যখন কোন জনপদে কোন সতর্ককারী প্রেরণ করেছি, তখন তাদেরই বিত্তশালীরা বলেছে, আমরা আমাদের বাপ-দাদাদের পেয়েছি এক পথের পথিক এবং আমরা তাদেরই পদাংক অনুসরণ করে চলি। সে বলত, তোমরা তোমাদের পূর্বপুরুষদেরকে যে বিষয়ের উপর পেয়েছ, আমি যদি তদপেক্ষা উত্তম বিষয় নিয়ে তোমাদের কাছে এসে থাকি, তবুও কি তোমরা তাই বলবে, তারা বলত তোমরা যে বিষয়সহ প্রেরিত হয়েছ, তা আমরা মানব না। ফলে আমি তাদের থেকে প্রতিশোধ নিয়েছি। অতঃপর দেখুন, মিথ্যারোপকারীদের পরিণাম কিরূপ হয়েছে।’[iv]

৪. এই কালেমার প্রতি সম্পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করা, পরিত্যক্ত করে না রাখা:

বাহ্যিক অঙ্গ-প্রতঙ্গ, আভ্যন্তরিণ মননশীলতার মাধ্যমে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এই কালিমার অর্থ, আবেদন ও তাৎপর্যকে সম্পূর্ণরূপে মেনে নেয়া। যার সত্যতা প্রমাণিত হবে, আল্লাহ তাআলার আদেশ বাস্তবায়ন, তার পছন্দনীয় বস্ত্তগুলো গ্রহণ, অপছন্দনীয় বস্ত্তগুলো বর্জন এবং তার গোস্বা ও রাগান্বিত বিষয়-বস্ত্তগুলো পরিহার করার মাধ্যমে। এরশাদ হচ্ছে-

وَمَنْ يُسْلِمْ وَجْهَهُ إِلَى اللَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَى وَإِلَى اللَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ ﴿22﴾ وَمَنْ كَفَرَ فَلَا يَحْزُنْكَ كُفْرُهُ. (سورة لقمان:২২-২৩)

‘যে ব্যক্তি সৎকর্ম পরায়ন হয়ে আল্লাহর নিকট আত্নসমর্পন করে, সে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে এক মজবুত হাতল। যাবতীয় কাজের পরিণাম আল্লাহর ইখতিয়ারে। যে ব্যক্তি কুফরী করে, তার কুফরী যেন আপনাকে ক্লিষ্ট না করে।’[v]

অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে-

فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا ﴿65﴾. (سورة النساء:৬৫)

‘অতএব তোমার পালনকর্তার শপথ! তারা কখনো ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক বলে মেনে না নেয়, তৎপর তুমি যে বিচার করবে তা দ্বিধাহীন অন্তরে গ্রহণ না করে।’[vi]

রসূল সা. বলেছেন-

لايؤمن أحدكم حتى يكون هواه تبعا لما جئت به.

‘তোমাদের কেউ মুমিন বলে গণ্য হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত আমার আনীত বিধানের প্রতি তার প্রবৃত্তি আনুগত্য প্রকাশ না করবে।’

৫. এই কালেমার ব্যাপারে নিরেট সততা প্রর্দশন করা, মিথ্যা ও কপটতা পরিহার করা :

বান্দার অন্তরে সুপ্ত অভিব্যক্তির সাথে মুখের উচ্চারণের এতটুকু সমন্বয় থাকতে হবে, যার দ্বারা তার অবস্থা মুনাফিক তথা কপটদের অবস্থা হতে সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে যায়- যারা মিথ্যা ও ধোকার আশ্রয় নিয়ে মুখে এমন সব কথা উচ্চারণ করে যা তাদের অন্তরে বিদ্যমান থাকে না। এরশাদ হচ্ছে-

وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَقُولُ آَمَنَّا بِاللَّهِ وَبِالْيَوْمِ الْآَخِرِ وَمَا هُمْ بِمُؤْمِنِينَ ﴿8﴾ يُخَادِعُونَ اللَّهَ وَالَّذِينَ آَمَنُوا وَمَا يَخْدَعُونَ إِلَّا أَنْفُسَهُمْ وَمَا يَشْعُرُونَ ﴿9﴾ فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ فَزَادَهُمُ اللَّهُ مَرَضًا وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ بِمَا كَانُوا يَكْذِبُونَ ﴿10﴾. (سورة البقرة:৮-১০)

‘আর মানুষের মধ্যে কিছু লোক এমন রয়েছে যারা বলে, আমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান এনেছি অথচ তারা আদৌ ঈমানদার নয়। তারা আল্লাহ এবং ঈমানদারগণকে ধোঁকা দেয়। অথচ এর দ্বারা নিজেদেরকে ছাড়া অন্য কাউকে ধোঁকা দেয় না। অথচ তারা তা অনুভব করতে পারে না। তাদের অন্তকরণ ব্যধিগ্রস্ত আর আল্লাহ তাদের ব্যধি আরো বাড়িয়ে দিয়েছেন। বস্ত্ততঃ তাদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে ভয়াবহ আযাব, তাদের মিথ্যাচারের দরুন।’[vii]

রসূল সা. বলেছেন:

ما من أحد يشهد ألا إله إلا الله صدقا من قلبه إلا حرمه الله على النار.

‘যে ব্যক্তি আন্তরিক ভাবেلاإله إلا الله এর সাক্ষ্য প্রদান করবে তার উপর আল্লাহ তাআলা জাহান্নাম হারাম করে দিবেন।’

৬. এই কালেমার প্রতি খাঁটি মহববত প্রদর্শন করা, বিদ্বেষ পোষণ না করা :

এই কালিমা ও তার আবেদনের প্রতি অগাধ ভালবাসা ও মহববত রাখা। অর্থাৎ এই কালেমা অনুযায়ী আমল পছন্দ করা, যারা এর উপর আমল করে এবং এর প্রতি আহবান করে তাদের মহববত করা। যারা এই কালেমাকে অপছন্দ করে এর সাথে প্রতারণা বা মিথ্যারোপ করে, এর থেকে পৃষ্ঠপ্রর্দশন করে ও এর প্রচার প্রসারকে বাধাগ্রস্ত করে, তাদেরকে অপছন্দ ও প্রতিহত করা। এই কালেমার প্রতি মহববতের প্রমাণ দেয়ার জন্য আরো প্রয়োজন- আল্লাহ তাআলার আদেশকৃত ও পছন্দনীয় জিনিসগুলো বাস্তবায়ন করা, যদিও তা প্রবৃত্তির বিপরীত হয়। অপরপক্ষে আল্লাহ তাআলার নিষেধকৃত ও অপছন্দনীয় জিনিসগুলোর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা, তা হতে দূরে থাকা, যদিও তার প্রতি অন্তর ধাবিত হয়। আল্লাহর বান্দাদের সাথে সর্ম্পক স্থাপন করা। আল্লাহর শত্রুদের সাথে সর্ম্পকচ্ছেদ করা। রসূলের অনুকরণ করা। তার দিক নির্দেশনার অনুসরণ করা। তার আনীত বিধানকে কবুল করা। এ ছাড়া মহববত শুধু একটি দাবী যার কোন বাস্তবতা নেই। এরশাদ হচ্ছে-

وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَنْدَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ وَالَّذِينَ آَمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ. (سورة البقرة:১৬৫)

‘আর কোন লোক এমন রয়েছে যারা অন্যান্যকে আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে এবং এদের প্রতি এমন ভালবাসা পোষণ করে, যেমন আল্লাহর প্রতি ভালবাসা হয়ে থাকে। কিন্তু যারা আল্লাহর প্রতি ঈমানদার তাদের ভালবাসা ওদের তুলনায় বহুগুণ বেশী।’[viii]

অর্থাৎ কালেমায়ে তাওহিদ তাদের অন্তরে ও হৃদয়ে স্থায়ীরূপ নিয়েছে। তাদের অন্তর ও হৃদয় এ কালেমা পরিপূর্ণ করে দিয়েছে, বিধায় অন্য কোনো জিনিসের জন্য তাদের অন্তর উন্মুক্ত হয় না। তাদের অন্তরে যত মহববত-বিদ্বেষ দেখা যায় সব এই কালেমার অনুকরণে উৎসারিত হয়।

৭. এই কালেমার প্রতি পূর্ণ ইখলাস প্রদর্শন করা, লৌকিকতা, সুখ্যাতি ও অংশিদারিত্ব পরিহার করা :

সমস্ত ইবাদাতে একমাত্র আল্লাহর প্রতি নিবিষ্ট চিত্তে মনোনিবেশন করা। ছোট বড় সমস্ত শিরক হতে নিয়্যত পরিশুদ্ধ রাখা। এরশাদ হচ্ছে-

وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ وَيُقِيمُوا الصَّلَاةَ وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ وَذَلِكَ دِينُ الْقَيِّمَةِ ﴿5﴾. (سورة البينة:৫)

‘তাদেরকে এ ছাড়া কোন নির্দেশ করা হয়নি যে, তারা খাঁটি মনে একনিষ্ট ভাবে আল্লাহ তাআলার এবাদত করবে, নামায কায়েম করবে এবং যাকাত দেবে। এটাই সঠিক ধর্ম।’[ix]

রসূল সা. বলেছেন-

إن الله حرم على النار من قال لاإله إلا الله يبتغي بذلك وجه الله عز وجل.

‘আল্লাহ তাআলা ঐ ব্যক্তির উপর জাহান্নাম হারাম করে দিয়েছেন যে, আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য لاإله إلا الله বলেছে।’

وعن أبي هريرة ু رضي الله عنه- أنه قال: قلت يارسول الله من أسعد الناس لشفاعتك يوم القيامة؟ فقال: لقد ظننت يا أباهريرة أن لايسألني عن هذا أحد أول منك لما رأيت من حرصك علىالحديث. أسعد الناس بشفاعتي يوم القيامة من قال لاإله إلا الله خالصا من قبل نفسه.

‘আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত: তিনি বলেন আমি বলেছি হে আল্লাহর রসূল সা. কিয়ামতের দিন আপনার সুপারিশের মাধ্যমে কে সবচেয়ে বেশী সৌভাগ্যবান হবে? তিনি বললেন : হে আবু হুরায়রা, আমি নিশ্চিতভাবে ধারণা করেছিলাম যে, এ ব্যাপারে তোমার আগে কেউ আমাকে জিজ্ঞাসা করবে না। যেহেতু হাদিসের প্রতি তোমার অধিক আগ্রহ লক্ষ্য করেছি। (শুন!) কিয়ামতের দিন আমার শাফাআত বা সুপারিশ দ্বারা ঐ ব্যক্তি বেশী লাভবান হবে যে অন্তরের অন্ত:স্থল হতে নিবিষ্ট চিত্তে

لاإله إلا الله বলেছে।’[x]

(চলবে)

তথ্যসূত্র :

[i] সূরা : মুহাম্মদ-১৯

[ii] সূরা : আল হুযুরাত-১৫

[iii] সাফফাত:৩৫-৩৬।

[iv] সূরা : আয যুখরুফ- ২৩-২৫

[v] সূরা : লুকমান-২২-২৩

[vi] সূরা : নিসা- ৬৪

[vii] সূরা : আল বাক্বারা-৮-১০

[viii] সূরা : আল বাক্বারা-১৬৫

[ix] সূরা : আল বায়্যিনাহ-৫

[x] বুখারী।

মতামত দিন

Solve : *
3 × 15 =