ইসলামিক গল্প

এবং হিমু যখন প্র্যাকটিসিং মুসলমান (পর্ব – ৫)

১ম পর্বের লিংক              ২য় পর্বের লিংক                   ৩য় পর্বের লিংক          ৪র্থ পর্বের  লিংক

বদরুল সাহেব তার বিখ্যাত খাসির গোশতের বাটি নিয়ে এসেছেন। গোশত বলে সেখানে কিছু ণেই। জ্বালের চটে সব গোশত গলে কালো রঙের ঘণ স্যুপের মত একটা বস্তু তৈরি হয়েছে। চুমুক দিয়ে খেয়ে ফেলা যায়। তবে বদরুল সাহেবের বিবেচনা আছে। তিনি সঙ্গে চা এর চামচ এনেছেন। আমি সেই চামচে তরল খসির গোশত নিয়ে বিসমিল্লাহ বলে এক চুমুক মুখে দিয়ে বললাম অসাধারণ। আরাবিয়ান খাবসার কাছাকাছি।

বদরুল সাহেব উজ্জ্বল মুখ করে বললেন, বাসি হওয়ায় টেস্ট আরও খুলেছে তাই না? গোসতের ঐ মজা , যত বাসি তত মজা । টেস্ট খুলেছে না?

খুলেছে বললে কম বলা হবে এক্কেবারে ডানা মেলে দিয়েছে।

গরম গরম পরাটা দিয়ে খেলে আরও আরাম পেতেন। আপনি একটু ওয়েট করুন আমি দৌড় দিয়ে গিয়ে দুটা পরাটা নিয়ে আসি। সাতটা বাজে , মোবারকের স্টলে পরোটা ভাজা শুরু করেছে।

পরোটা আনার কোন দরকার ণেই। আপনি আরাম করে বসুন তো। বরং এক কাজ করুন, আরেকটা চামচ নিয়ে আসুন , দুজনে মিলে মজা করে খাই।

না না অল্পই আছে।

নিয়ে আসুন তো চামচ। ভাল জিনিস একা খেয়ে আরাম ণেই।

এটা একটা সত্য কথা বলেছেন।

বদরুল সাহেব চামচ আনতে গেলেন। ভদ্রলোকের জন্য আমার মায়া লাগছে। গত দু’মাস ধরে তার কোন চাকরি নেই। ব্যংক এ ভালো চাকরি করতেন । ভালোই একটা পোষ্ট এ ছিলেন।ইসলাম প্র্যাকটিস করা শুরু করার পর, যখন শুনেছেন ব্যংকের চাকরির টাকা হালাল হবে না । তখন এক ধাক্কায় চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে চলে এসেছেন। এই বয়সে একজন মানুষের চাকরি চলে গেলে আবার চাকরি যোগাড় করা কঠিন। ভদ্রলোক কিছু জোগাড় করতে পারছেন না। মেসের ভাড়া তিন মাস বাকি পরেছে। যতদুর জানি মেসের খাওয়াও তার বন্ধ। ফিস্টে তার নাম থাকার কথা না, বাজার- টাজার করে দিয়েছেন , রান্নার সময় কাছে থেকেছেন এই বিশেষ কারণে হয়ত তার খাবার ব্যবস্থা হয়েছে।

চামচ নিয়ে এসে বদরুল সাহেব আরাম করে খাচ্ছেন। তাকে দেখে এই মূহুর্তে মনে করার কোন কারণ নেই যে , পৃথিবীতে নানান ধরনের দুঃখ -কষ্ট আছে। যুদ্ধ চলছে আফগান , ইরাক, সিরিয়ায়। ফিলিস্থিনে অকারণে নিরীহ মুসলিমদেরকে হত্যা করা হচ্ছে। তার নিজের সমস্যাও নিশ্চয়ই অনেক। দু মাস বাড়িতে মানি অর্ডার যায়নি। বাড়ির লোকজন নিশ্চয়ই অতংকে অস্থির হচ্ছে। ভদ্রলোক নির্বিকার।

হিমু ভাই।

জ্বি

হাড়গুলি চুষে চুষে খান, মজা পাবেন। ইংরেজিতে একটা কথা আছে, Nearer the bone, Sweeter is the meat.

আমি একটা হাড় মুখে ফেলে চুষতে লাগলাম।

তিনিও একটা মুখে নিলেন। আনন্দে তার চোখ প্রায় বন্ধ।

বদরুল সাহেব।

জ্বি

চাকরি -বাকরি কিছু হল?

এখনো হয়নি তবে ইন শ আল্লাহ হবে। আমার অনেক লোকের সঙ্গে জানাশোনা এদের বলেছি এরা আশা দিয়েছে ।

শুধু আশার ওপর ভরসা করাটা কি ঠিক হচ্ছে।

আমার খুব ক্লোজ একজনকে বলেছি। ইস্টার্ন গার্মেন্টস এর মালিক।স্কুলে এক সঙ্গে পড়েছি। এখন রমরমা অবস্থা। গাড়ি টারি কিনে হুলুস্থুল। বাড়ি করেছে গুলশানে।

তিনি কি আশা দিয়েছেন?

পরে যোগাযোগ করতে বলেছে। সেদিনই সে হং কং যাচ্ছিল। দারুণ ব্যস্ত। কথা বলার সময় ণেই। এর মধ্যেই সে পেস্ট্রি – কোক খাইয়েছে। পূর্বানীর পেস্ট্রি, স্বাদই অন্য রকম। মাখনের মত মোলায়েম মুখের মধ্যে গলে যায় চাবাতে হয় না ।

আপনার খুব ঘনিষ্ট বন্ধু?

বললাম না স্কুল জীবনের বন্ধু। নাম হল গিয়ে আপনার ইয়াকুব। স্কুলে সবাই ডাকতো বেকুব।

আসলেই বেকুব?

তখন তো বেকুবের মতই ছিল। তবে স্কুল জীবনের স্বভাব চরিত্র দেখে কিছু বোঝা যায় না। আমাদের ফার্স্ট বয় ছিল আব্দুর রশিদ। আরে সর্বনাশ কি ছাত্র ! অংকে কোন দিন ১০০এর নিচে পায় নাই। প্রিটেস্ট পরীক্ষায় এক্সট্রা ভুল করেছে। সাত নম্বর কাঁটা গেছে। কাঁদতে কাঁদতে চোখ ফুলিয়ে ফেলেছিল। সেই রশিদের সঙ্গে একুশ বছর পর দেখা। গাল টাল ভেঙ্গে চুল পেকে কি অবস্থা। চশমার একটা ডাণ্ডা ভাঙ্গা। সুতা দিয়ে কানের সাথে বেধে রেখেছে। দেখে মনটা খারাপ হল।

অংকে একশ পাওয়া ছেলের এই অবস্থা, মন খারাপ হবারই কথা। অংকে টেনে টুনে পাশ করলে কানে সুতা বেধে চশমা পরতে হতো না।

কারেক্ট বলেছেন। একুশ বছর পর দেখা। কোথায় কুশল জিজ্ঞেস করবো , ছেলে মেয়ে কতবড় এইসব জিজ্ঞেস করবো — তা না, ফট করে একশ টাকা ধার চাইলো।

ধার দিয়েছেন?

কুড়ি টাকা পকেটে ছিল, তা- ই দিলাম। খুশি হয়ে নিয়েছে।

মেসের ঠিকানা দেন নি তো? মেসের ঠিকানা দিয়ে থাকলে মহা বিপদে পড়বেন। দুদিন পরে পরে টাকার জন্যে বসে থাকবে। আপনার জীবন অতিষ্ট করে ফেলবে।

বদরুল সাহেব দুঃখিত গলায় বললেন,স্কুল জীবনের বন্ধু তো, দুরবস্থা দেখে মনটা এত খারাপ হয়েছে আমার নিজের চোখে প্রায় পানি এসে গিয়েছিল। সুতা দিয়ে কানের সাথে চশমা বাঁধা—

বদরুল সাহেব দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। তার নিজের ভবিষ্যতের চেয়ে বন্ধুর ভবিষ্যতের চিন্তায় তাকে বেশি কাতর বলে মনে হল।

হিমু ভাই।

জ্বি ।

ভাল একটা নাসতা হয়ে গেলো আলহামদুলিল্লাহ … নাকি বলেন?

হ্যাঁ হয়েছে। আপনি যে কষ্ট করে আমার অংশটা জমা করে রেখেছেন তার জন্য ধন্যবাদ। যাযাকাল্লাহু খাইর।

ওয়াইয়াক ভাই। তবে এটা কিন্তু ধন্যবাদের কোন বিষয়ই না। এতো দিন পর ফিস্ট হচ্ছে আপনি বাদ পরবেন এটা কেমন কথা। তাছাড়া আপনি যেদিন মেসে খান না সেদিনের খাওয়াটা আমি খেয়ে ফেলি।

ভাল করেন। অবশ্যই খেয়ে ফেলবেন। দেশে টাকা পাঠিয়েছেন?

গত মাসে পাঠিয়েছি। এই মাস বাদ পরে গেলো। তবে সমস্যা হবে না আল্লাহ চালিয়ে নেবেন। আর আমার স্ত্রী খুবই বুদ্ধিমতী, আলহামদুলিল্লাহ । মহিলা আল্লাহর ইচ্ছায় একভাবে না একভাবে চালিয়ে নেবে।

আপনি যে চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছেন সেই খবর কি স্ত্রীকে জানিয়েছেন?

জ্বি না আপনার ভাবী মনটা খারাপ করবে। কি দরকার। চাকরি তো পাচ্ছিই ইন শ আল্লাহ , মাঝখানে কিছুদিনের জন্যে টেনশোনে ফেলে লাভ কি? আজই ইয়াকুবের সঙ্গে দেখা করব। চা খাবেন হিমু ভাই?

জ্বিনা । দরজা টরজা বন্ধ করে জোহর পর্যন্ত ঘুম দেব। আমার স্বভাব হয়ে গেছে বাঁদুরের মত। দিনে ঘুমাই রাতে জেগে থাকি।

কাজটা ঠিক হচ্ছে না ভাই সাহেব। আল্লাহ বলেছেন রাত ঘুমের জন্য।শরীরের দিকেও তো লক্ষ্য রাখতে হবে। শরীর নষ্ট হলে – মন নষ্ট হয়। আমার শরীর ঠিক আছে বলেই এতো বিপদে আপদে মনটা ঠিক আছে। শরীর টা ঠিক রাখবেন।

আমার আবার উল্টা । মনটা ঠিক রাখি । যাতে শরীর টা ঠিক থাকে।

বদরুল সাহেব বাটি এবং চামচ নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। লজ্জিত ভঙ্গিতে বললেন, ছোট্ট একটা কাজ করে দেবেন হিমু ভাই!

জ্বি বলুন।

মেসের ম্যানেজার আমাকে বলেছে সোমবারের মধ্যে মেস ছেড়ে দিতে । আজেবাজে সব কথা, গালাগালি। আপনি যদি একটু বলে দেন! ও আপনাকে মানে।

আমি এখুনি বলে দিচ্ছি।

তাকে বললাম যে চাকরি হয়ে যাচ্ছে। ইয়াকুবকে বলেছি। এত বড় গার্মেন্টস এর মালিক। চাকরি তার কাছে কিছুই না। সে এক নিঃশ্বাসে দশজন লোককে চাকরি দিতে পারবে। আমার কথা বিশ্বাস করে না । আপনি বললে বিশ্বাস করবে।

( চলবে ইন শ আল্লাহ … )

মতামত দিন

Solve : *
32 ⁄ 16 =