ইসলামিক গল্প

মন্দির থেকে মসজিদে

আমি এখন থেকে পঞ্চাশ বছর আগে বাহরাইচ-এর রাজপুত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছি। আমার বাবা সরকারী স্কুলের হেড মাষ্টার ছিলেন। বাহরাইচে ইন্টার পাস করার পর আমি ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি হই। দিল্লী ইউনিভার্সিটি থেকে সিভিলে বি এ পাস করার পর ডিডিএতে একটি চাকুরী পেয়ে যাই। এমনিতেই আমার মেজাজ একটু বেশি গরম। খান্দানিভাবে জমিদার মেজাজ বলে। তাছাড়া ঘুষ দেয়া-নেয়া অনেক পাপ এ কথা পিতাজি আমাদেরকে বারবার পড়িয়েছেন। অফিসার এবং নেতাদের সাথে আমার এ নিয়ে ঝগড়া হতো। যে কারণে আমাকে সাসপেন্ড করে দেয়া হয়। তারপর আমি রাগ করে রিজাইন দিয়ে দিই এরপর অন্য একজনের সাথে মিলে একটি কনস্ট্রাকশন ফার্ম খুলি। প্রাইভেট ঠিকাদারির কাজ করতে শুরু করি। কাজ-কাম ভালোই চলতে থাকে। আমাদের কর্মের পরিধি যখন প্রসারিত হলো তখন এল এফ এর কাজও নিতে থাকি।

এর বাইরেও কয়েকটি বড় বড় কোম্পানির কাজ করি। আমাদের ব্যবসা যখন বড় হলো তখন দিল্লিতে একটি শপিংমলের ঠিকাদারী নিলাম। আশা ছিল এই কাজটিতে আমাদের অনেক মুনাফা হবে। কিন্তু আমার পার্টনারের মনে দুষ্ট বুদ্ধি ঢুকে গিয়েছিল। শপিংমলের মালিকও আমাদের সাথে প্রতারণা করলো। ফলে হঠাৎ করেই আমাদের কোম্পানি লসে পড়ে গেল। এদিকে লোহা ও সিমেন্টের দাম বেড়ে গেল। এটা ছিল বিপদের ওপর বিপদ। দিল্লীর নয়টি প্লট ও সাতটি ফ্ল্যাট বিক্রি করেও লোকসান কভার করতে পারলাম না। তারপর আদালতে মোকদ্দমা শুরু হলো। এক সময় আমার গাড়িটিও বিক্রি করে ফেলতে হলো। মাত্র পঁচিশ হাজার টাকার একটি গাড়িতে চলাফেরা করতে লাগলাম। পাওনাদাররা আমার জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুললো। আর তখনই আমার প্রতি সৃষ্টিকর্তার করুণা হলো। অন্ধকারের সামনে দাঁড়িয়ে ঈমানের আলো দেখতে পেলাম। এই পাপী কৃষ্ণ বান্দার জীবনে তিনি ঈমানের নূর জ্বেলে দিলেন।
তের অক্টোবর আমার জীবনে একটি কালো তারিখ। আমাকে পুলিশ এবং পাওনাদাররা তুলে নিয়ে গেল। আমার সাথে পাওনাদাররা এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করলো যা ভাষায় ব্যক্ত করা সম্ভব নয়। আমি আমার পনের বছরের ছেলের সাথে আমার স্ত্রী ও সন্তানদেরকে ইজ্জত রক্ষার জন্য পাঠিয়ে দিলাম। চৌদ্দ অক্টোবর সকালে মোকাদ্দমার একটি প্রয়োজনে আমাকে দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হয়েছিল। সেখানে গাফফার মঞ্জিলে একজন উকিলের সাথে পরামর্শ করার প্রয়োজন ছিল। আমি সকালে পৌঁছালাম, পরামর্শ শেষে সকাল সাড়ে নয়টায় আমি গাফফার মঞ্জিল থেকে বেরিয়ে আসছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয় বাউণ্ডারির পাশ দিয়ে আমি একাই গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলাম, সেখানেই পথে একজন ইমামকে হেঁটে যেতে দেখি। তাঁকে দেখে আমার মনে হলো, কোন ধার্মিক মানুষ হবেন। মনে-মনে ভাবলাম একজন ভালো মানুষ! পায়ে হেঁটে যাচ্ছেন। আমি তাঁকে গাড়িতে তুলে নিই। হয়তো বা তিনি আমাকে কোন চিকিৎসা বলে দিবেন।
আমি তাঁর পাশে গাড়ি থামালাম। বললাম- আসুন! আপনাকে মেইন সড়কে নামিয়ে দেব। তিনি বললেন- অনেক শুকরিয়া, আসলে আমি আজ মর্নিং ওয়ার্ক করতে পারিনি। এজন্যেই হেঁটে যাচ্ছি। আমি বললাম- অনুগ্রহ করে আসুন! আমাকে একটু সেবা করার সুযোগ দিন। তিনি তখন উঠে আমার পাশের সিটে বসলেন। আমি জানতে চাইলাম- কোথায় যাচ্ছেন? তিনি বললেন- বাটলা হাউজ খলিলুল্লাহ মসজিদে যাচ্ছি। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা পার হবার পর প্রধান সড়কে এসে তিনি নেমে যেতে চাইলেন। কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল আরো কিছুক্ষণ তাঁর সাথে কথা বলি। বললাম, মাত্র পাঁচ মিনিটের ব্যাপার! আমি আপনাকে বাটলা হাউজে পৌঁছে দিচ্ছি। তাঁর বারংবার নিষেধ সত্ত্বেও আমি গাড়ি থামালাম না।
তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন- আপনার নাম? বললাম- উত্তর পাল সিং চৌহান। নাম জানার পর তিনি আমাকে বারবার শুকরিয়া জানালেন। বললেন- দেখুন কেবলমাত্র মানবিক কারণেই আপনি আমার প্রতি এই সদয় আচরণ করেছেন। আপনার ব্যবহারে আমার ভালো লেগেছে। আমার মন চাইছে বর্তমান জীবন ও আগামী জীবনে কাজে আসতে পারে এমন কোন উপহার আমি আপনাকে দিই। যে স্রষ্টা আমাদের এ সংসার চালাচ্ছেন, নিয়ন্ত্রণ করছেন তাঁর অনেক সুন্দর সুন্দর গুণবাচক নাম রয়েছে। তারমধ্যে দুটি নাম হলো- ‘আল-হাদী, আর-রহীম।’ হাদী অর্থ- পথপ্রদর্শক / যিনি মানুষকে তাঁর গন্তব্যে পৌঁছে দেন। আর-রহীম অর্থ সবচাইতে ক্ষমাশীল / সর্বাধিক করুণাময় এবং সবচে’ বড় দাতা। প্রতিদিন এই নাম দুটি পড়বেন। পড়ার সময় মনে-মনে ধ্যান করবেন- আমি আমার মালিককে স্মরণ করছি। তারপর পরিবার, ব্যবসা কিংবা অন্য যে কোন সমস্যায় সরাসরি মালিকের কাছে প্রার্থনা করবেন, ইনশাআল্লাহ তিনি অবশ্যই বিপদ দূর করে দেবেন। আমি আপনাকে মালিকের ফোন লাইন ও ই-মেইল লাইন বলে দিলাম।
আমি তখন বললাম- মিয়া সাহেব! বর্তমানে আমি খুব পেরেশানির ভেতর আছি। আমার অবস্থার কথা শুনলে আপনারও হয়তো চোখ ভিজে উঠবে। এ কথা বলতেই আমার চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরতে লাগলো। তিনি আমার অবস্থা দেখে বললেন- আমাকে শুনিয়ে আর কী লাভ হবে! আমরা সবাই তো নানান সমস্যার মধ্যে ডুবে আছি। যে নিজেই বিপদের শিকার তাঁকে বিপদের কথা শুনিয়ে কী লাভ! আপনি বরং আল-হাদী এবং আর-রহীম পড়ে বিপদের কথা আপনার মালিককে বলুন। তাঁকে বিপদের কথা বলতে কোন লজ্জা নেই, কোন অপমান নেই। আর তিনিই সবকিছু করতে পারেন। তবে এই যপের জন্য একটি বাছ আছে। একমাত্র এই মালিক ছাড়া আর করো পূজা কিংবা কারও সামনে মাথা নত করা যাবে না। কারও সামনে হাত জোড় করা যাবে না। পীরের সামনেও না, দেবীর সামনেও না। ভালো হয় ঘরে মূর্তি থাকলে সেগুলো বের করে ফেলবেন। আমি তাঁকে শুকরিয়া জানালাম। বিদায় জানাবার উদ্দেশ্যে হাত জোড় করলাম। তিনি সাথে-সাথে বললেন- এ থেকেই তো বেঁচে থাকতে বললাম। আমি দুঃখিত বলে ক্ষমা চাইলাম।
পরদিন সকালে স্নান সেরে চোখ বন্ধ করে একশ বার আল-হাদী ও আর-রহীম পাঠ করলাম। আমি আপনাদের বলে বুঝাতে পারবো না, তখন আমার অনুভূতি কী হয়েছিল! মনে হয়েছিল, আমার মালিক আমার সামনে, আমি আমার বেদনাভরা ইতিহাস তাঁকে শুনিয়েছি। প্রার্থনা করেছি ও তাঁকে বলেছি- মালিক! আপনাকে আমি কী শোনাবো! আপনি আমার থেকে ভালো জানেন। প্রায় আধা ঘণ্টা যাবত মালিকের দরবারে কেঁদেছি আধা ঘণ্টা পর যদিও আমার পূর্ব সমস্যার কোন পরিবর্তন হয়নি তবুও আমার কাছে মনে হয়েছে আমার অন্তর এবং মাথা থেকে বিরাট বড় একটি বোঝা নেমে গেছে। মনে হয়েছে, আমি আমার মোকাদ্দমার ভার অন্য কারোও কাঁধে সঁপে দিয়েছি। পাওনাদাররা সেদিনও এলো। কিন্তু সেদিন তাদের আচরণ ছিল খুবই মার্জিত। সন্ধ্যায় আমার মন চাইল আমি এই দোয়া গুলো আবার পাঠ করি।
আবার মনে হলো- আমাকে তো একবারই পাঠ করতে বলা হয়েছিল। পরক্ষণে মনে হচ্ছিল- মালিকের নাম যতো পারি নেব, তাতে সমস্যা কি! সাথে সাথে এও মনে হলো- ওষুধ চিকিৎসকের কথামতই ব্যবহার করতে হয়। আমি সেদিন সেই ভদ্রলোকের নাম জিজ্ঞেস করিনি। এমনকি ফোন নাম্বারও না। আমি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার দিকে গাড়ি নিয়ে বের হলাম। বিকাল তিনটা থেকে রাত পর্যন্ত উখলা এবং তাঁর আশপাশে ঘুরতে লাগলাম। কিন্তু তাঁর সাথে দেখা হলো না। সন্ধ্যার পর ফিরে এলাম। সকালের অপেক্ষায় থাকলাম। সকালে স্নান করে আবার সেই নাম পাঠ করতে লাগলাম। এক সপ্তাহ এভাবে চলতে লাগলো। মনের অজান্তেই বারবার মুখে উচ্চারিত হচ্ছিল আল-হাদী, আর-রহীম। তিন দিন পর ঘর থেকে সবগুলো মূর্তি মন্দিরে রেখে এলাম। একুশ অক্টোবর শপিংমলের মালিকের বিরুদ্ধে আমাদের একটি মামলার রায় হওয়ার কথা। মামলাটি হাইকোর্টে চলছিল। হাইকোর্টে গেলাম। মামলার রায় হলো আমাদের পক্ষে। আদালত এক মাসের ভেতর পঁচাশি লাখ রুপি আদায় করার রায় দিলেন। আমার আনন্দের সীমা রইল না।
তারপর বাইশ অক্টোবর গ্রীন পার্কে এক পার্টির সাথে মিটিং করতে গেলাম। লোকজন মসজিদে যাচ্ছিল। আমি ভাবলাম মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করি- আল-হাদী এবং আর-রহীম আরও বেশি পড়া যায় কিনা। এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করলাম- আমি কি মসজিদের ইমাম সাহেবের সাথে সাক্ষাত করতে পারবো? তিনি বললেন, নামায শেষ হওয়ার পর আপনি অবশ্যই দেখা করতে পারবেন। আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম। নামায শেষ হয়ে গেলে এক ব্যক্তি আমাকে ইমাম সাহেবের কক্ষে নিয়ে গেল। আমি তখন বললাম- এক মিয়া সাহেব আমাকে আল-হাদী ও আর-রহীম পড়তে বলেছিলেন। এগুলো পড়ে আমি খুব উপকৃত হয়েছি। এখন আমি বেশি করে পড়তে চাইছি। এতে কোন ক্ষতি আছে কি? তিনি বললেন- আপনি এক ইমামের সাথে সাক্ষাত করুন। তিনি আপনাকে আরো ভালো পরামর্শ দিবেন। আমি তাঁর কাছে ইমাম সাহেবের ঠিকানা চাইলাম। তিনি বললেন- বাটলা হাউজ জামে মসজিদের ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞেস করুন। সেখানেই তাঁর অফিস।
আমি তখনই বাটলা হাউজ চলে গেলাম। ইমাম সাহেব বললেন- মসজিদের সামনে যে অফিস দেখতে পাচ্ছেন সেখানে গিয়ে জিজ্ঞেস করুন। সেখানে গিয়ে একজন হাফেয সাহেবের সাথে দেখা হলো। তিনি বললেন- খলিলুল্লাহ মসজিদের পাশেই তাঁর বাড়ি। সেখানে গিয়ে জিজ্ঞেস করুন। সম্ভবত তিনি এখন সফরে আছেন। আমি খলিলুল্লাহ মসজিদে অনেকক্ষণ খোঁজাখুজির পর তাঁর ফ্ল্যাট পেলাম। দরজায় নক করার পর একটা বাচ্চা এসে বলল- তিনি মাদ্রাজ সফরে গেছেন। এক সপ্তাহ পর ফিরবেন। আমি ওখান থেকে ফোন নম্বর নিলাম। মসজিদের বাইরে এসে লক্ষ্য করলাম টুপি মাথায় একজন লোক ঠেলা গাড়িতে করে ধর্মীয় বই-পুস্তক বিক্রি করছে। অনুমান করলাম ইসলামী বই হবে হয় তো। কাছে গিয়ে বললাম- হিন্দীতে কোন ভালো দোয়ার বই থাকলে আমাকে দাও। সে আমাকে ছোট সাইজের কয়েকটি বই দিল।’মাসনুন দোয়া’ ও ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর দোয়া’ বই দুটি কিনে নিলাম। তারপর মনে হলো ইসলাম সম্পর্কিত আরো অন্য কোন বই কিনি। আমি তাঁকে বললে সে আমাকে “ইসলাম কী?” ‘জান্নাতের চাবি’ ও ‘দোযখের শাস্তি’ কিতাব তিনটি দিল। এই পাঁচটি কিতাবের সাথে সে আমাকে ছোট্ট একটি বই ফ্রি দিল। নাম ‘আপনার আমানত’ সে বলল আপনি বইটি মনোযোগ দিয়ে পড়বেন। তারপর দোয়া করবেন। আপনার অনেক উপকার হবে।
আমি ক্ষুদ্র পুস্তিকাটির উপর লেখকের নাম দেখে বললাম- আমি তো এই ইমামের সাথেই দেখা করতে এসেছিলাম। তাঁর সাথে দেখা হলো না। হকার লোকটি বলল- তাঁর সাথে দেখা হওয়া তো খুব কঠিন। তবুও আপনি অবশ্যই দেখা করবেন আপনার ভালো লাগবে। আমি কিতাবগুলো নিয়ে বাসায় এলাম। ইমাম সাহেবের সাথে মোবাইলে কথা বলতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু পারলাম না। সেই রাতেই ‘আপনার আমানত’ পুস্তিকাটি পড়ে ফেললাম। তারপর দুইবার পড়লাম। বইটি পড়ার পর আমার মনে হচ্ছিল, কঠিন পিপাসার পর তৃপ্ত হবার মতো পানি পেয়েছি। তারপর ইমাম সাহেবর সাথে সাক্ষাতের আকুলতা আরও তীব্র হয়ে উঠলো। আল্লাহ আল্লাহ করে চতুর্থ দিন তাঁর সাথে কথা বলতে তাঁর আওয়াজ শুনে সন্দেহ হলো- ইনি কি সেই লোক? যিনি আমার গাড়িতে ওঠেছিলেন এবং আমাকে আল-হাদী ও আর-রহীম শিখিয়ে দিয়েছিলেন। তাছাড়া সেই পুস্তিকাটির পিছনেও লেখা ছিল আল-হাদী ও আর-রহীম।
চারদিন পর ইমাম সাহেব ফিরে এলেন। সেটা ছিল ৪ঠা নভেম্বর। সকাল সাড়ে দশটায় আমি খলিলুল্লাহ মসজিদে ইমাম সাহেবর সাথে দেখা করলাম। তাঁকে দেখে আমার খুশির আর সীমা রইলো না। দেখলাম তিনিই আমার দেখা সেই মিয়া সাহেব যিনি আমাকে গাফফার মঞ্জিল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথে আল-হাদী ও আর-রহীম এর সবক দিয়েছিলেন। আমি তাঁকে আমার অবস্থা জানালাম, তাঁর প্রতি শুকরিয়া জানালাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন- ‘আপনার আমানত’ পড়ে আপনি কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? আমি বললাম- এই পুস্তিকার প্রতিটি হরফ আমার অন্তরাত্মায় লেখা হয়ে গেছে। ইমাম সাহেব বললেন- তাহলে কি আপনি কালেমা পড়েছেন? আমি বললাম- পুস্তিকায় তো পড়েছি। এখন আপনি পড়িয়ে দিন। তিনি আমাকে কালেমা পড়ালেন এবং নাম রাখলেন নাঈম মুহাম্মদ। আমাকে বললেন- জীবনের প্রতিটি ক্ষণে, প্রতিটি পদক্ষেপে এই আল-হাদী ও আর-রহীম মালিকের সন্তুষ্টি মতে চলতে হবে। তিনি এমন মালিক যার সামনে চোখের পানি ফেললে মনে হয় যেন আমার বোঝা নেমে গেছে।
ইমাম সাহেবর পরামর্শে একজন স্থানীয় ইমামের কাছে গিয়ে নামায শিখেছি এবং এখন কুরআন শরীফ পড়ছি। এখন আমার তৃতীয় পারা শুরু হয়েছে।
আলহামদুলিল্লাহ! এরপর তিনটি মামলাতেই আমার পক্ষে রায় হয়েছে। আমি পুনরায় ঘর কিনেছি। আমি আমার ঘরের সবাইকে ডেকে পুরো কাহিনী শুনিয়েছি। আমার এই নতুন অবস্থা তাদের ভালো লেগেছে। দুই-তিন দিনের মধ্যেই আমার তিন সন্তান ও আমার স্ত্রী ইসলাম গ্রহণ করেছে। ইমাম সাহেব আমার স্ত্রীর নাম রেখেছেন খাদিজা এবং আমার সন্তানদের নাম রেখেছেন আমেনা, ফাতেমা ও মুহাম্মদ উমর।
আমার খান্দানের অতীত অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ। বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার সময় ইসলামের প্রতি বিরোধিতা খুব বেড়ে গিয়েছিল। আমাদের খান্দানে একজন পুলিশ ডিআইজি আছেন তিনি মুসলমান হয়ে হুযাইফা নাম ধারণ করেছিলেন। এ কারণে আমাদের খান্দানে ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি দূরত্ব আরও বেড়ে গিয়েছিলো। আমার ব্যবসা-বাণিজ্য যখন সম্প্রসারিত হলো তখন ধর্মীয় ও সামাজিক কর্তব্য মনে করে আমি বজরং দলকে অনেক পয়সা দিয়েছি। ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় অনেক মুসলমান ছেলের সাথে আমার বন্ধুত্ব ছিল। তাদের সাথে কথাবার্তার কারণে একটা প্রভাব তো ছিলই; তবে তাদের কারণে আমি বরং মুসলমানদের সম্পর্কে খারাপ ধারনাই করতাম বেশি। মূলত ইসলাম বিরোধী মানসিকতা আমাকে ইসলাম সম্পর্কে কিছু বুঝতে দেয়নি। তারপর যখন আমি জানতে শুরু করি তখন ধীরে-ধীরে আমার অন্তর ও মস্তিষ্ক থেকে পর্দাগুলো সরে যেতে থাকে। ইসলাম ছিল আমার ভেতরের একটা প্রয়োজন। আলহামদুলিল্লাহ! সেটা আমি পেয়েছি। আমার কাছে মনে হয় যেন আমি আমার আসল ঠিকানা হারিয়ে ফেলেছিলাম। আমার ঘর আমার হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল। সেই ঘর আবার ফিরে পেয়েছি।
আলহামদুলিল্লাহ! সেই ইমাম সাহেবকে বলেছি নতুন বছর থেকে প্রতি মাসে দীনি দাওয়াতের জন্য এক লাখ রুপি খরচ করতে চাই। তিনি আমাকে বলেছেন- জীবন এবং সম্পদ উভয়টিই খরচ করতে হবে। ভালো হয় আপনার সম্পদ আপনিই খরচ করুন। আমি ইমাম সাহেবর পরামর্শে ‘আপকি আমানত সেন্টার’ খোলার কর্মসূচি হাতে নিয়েছি। এজন্য একটি ফ্ল্যাট কিনেছি। দোয়া করুন আল্লাহ তায়ালা যেন আমার ইচ্ছা সফল করেন।
আমি মাত্র কয়েক মাসের মুসলমান। অন্য মুসলমানদের উদ্দেশ্যে বলবো, আমার কাছে মনে হয়েছে সমগ্র পৃথিবীর পিপাসা এখন ইসলাম। যাদের কাছে ইসলাম আছে তাদের কর্তব্য এই সকল তৃষ্ণার্তদের কাছে ইসলাম পৌঁছে দেয়া। তারা যদি এ কাজটা করেন তাহলে সমস্ত পৃথিবীর এই তৃষ্ণার্ত জাতি পরম ভালোবাসায় ইসলামকে গ্রহণ করবে। অথচ আমাদের মুসলমানদের অবস্থা হলো আমরা তাদের তৃষ্ণা নিবারণের পরিবর্তে তাদেরকে প্রতিপক্ষ ভাবি। এটা ইসলামের চরিত্র নয়। ইসলামের চরিত্র হলো তৃষ্ণার্তদের প্রতি বেদনাবোধ থাকবে এবং তাদের তৃষ্ণা মেটানোর জন্য চেষ্টা করা হবে। তারা এটা বোঝে না যে’ কোন অন্যায়ের পরিবর্তে কোন অন্যায় করা সাজে না।
লেখকঃ জনাব নাঈম মুহাম্মদ

মতামত দিন

Solve : *
17 − 15 =