ভ্রান্ত মতবাদ

ডারউইনিজম – সন্ত্রাসবাদের আঁতুড়ঘর

“ডারউইনিজম – সন্ত্রাসবাদের আঁতুড়ঘর”

বিশ্ববিদ্যালয়ের সবথেকে বিস্ময়কয় জায়গা হলো হলগুলো। যেখানে অধিকাংশ ছাত্র মানবেতর জীবন যাপন করে, আর কিছু ছাত্র রাজার হালে থাকে। কিছু কিছু হলের দিকে তাকালে আপনার কান্না চলে আসবে। ছাদ থেকে চুইয়ে পানি পড়া, দেয়ালের প্লাস্টার উঠে যাওয়া, একই কক্ষে গাদাগাদি করে দশজন পর্যন্ত বসবাস করা ইত্যাদি সেখানকার নিত্যনৈমিক ব্যাপার। আবার ছারপোকা ও টয়লেট সমস্যা তো আছেই। আবার কিছু কিছু হলে একেবারে রাজকীয় ভাব। টাইলস, মোজাইক, লিফট ইত্যাদির কোন কমতি নেই। ভালো হলে বরাদ্দ পাওয়ার পরও হলে থাকার সুযোগ হয় নি আমার।

তাই হল লাইফ কেমন – আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। শুনেছি হলে নাকি অল্প কিছুতেই মারামারি লেগে যায়। ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া চলে। কেন লেগে যায়, তা আমরা সবাই জানি। আমি সে কারণগুলো ব্যাখ্যা করতে চাচ্ছি না। অবশ্যি তার দরকারও নেই। কেননা আমাদের গল্পের সাথে তা সম্পর্কযুক্ত নয়।

কোন এক মারামারির বিচারে আমি আর ফারিস কবি নজরুল হলে বসা। রুম নাম্বার ২০২। সব মিলিয়ে রুমে আমরা পাঁচজন। আমি, ফারিস, নাসির, মিসবাহ, অপু। আলোচনা অনেক আগেই শুরু হয়েছে। তবে মূল আলোচনায় যেতে একটু বিলম্ব হচ্ছে। শাহেদ ভাই এলেই মূল পর্ব শুরু হবে। একটা জিনিস একটু ক্লিয়ার করলে ভালো হবে। মারামারি কী নিয়ে হয়েছিলো – সে বিষয়টা। গতকাল হলে অপু আর নাসিরের মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে হাতাহাতি। কালকের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা নিয়েই আজ আলোচনা।

হাতাহাতি কেন হয়েছিলো; সে কারণটা অবশ্যই জানা দরকার। কেননা তা গল্পের সাথে সম্পর্কযুক্ত। কাল নাসির আর অপুর মধ্যে আলোচনা হচ্ছিলো, ডারউইনিজম নিয়ে। এক পর্যায়ে নাসির বলে উঠলো, ‘যত বড় বড় সন্ত্রাসবাদ এই পৃথিবীতে ঘটেছে; তাঁর মূলে রয়েছে ডারউইনিজম।’

এইতো অপু ক্ষেপে গেলো! এরপর দু’জনের মধ্যে কথাকাটাকাটি। পরে হাতাহাতি। অপু অতিকায় দেহ বিশিষ্ট্য প্রাণি। বদ মেজাজিও বটে। অল্পতেই রেগে যায়। রাগ উঠে গেলে আর রক্ষে নেই। থাকেও এক বদমেজাজি লোকের সাথে। দিন দিন ওর মেজাজ আরো চড়া হয়ে যাচ্ছে। নাসির হ্যাংলা পাতলা গড়নের। চুপচাপ স্বভাবের লোক। নিয়মিত সালাত আদায় করে। দাড়ি রেখেছে মাসখানিক হলো।

ওদের বিবাদ মিমাংসা করতেই আমরা জমায়েত হয়েছি। নাসিরের পক্ষে আমি আর ফারিস। আর অপুর পক্ষে মিসবাহ আর শাহেদ ভাই। যার জন্যে আমরা অপেক্ষা করছি, মানে শাহেদ ভাই; তিনি এলেন আধঘণ্টা পর। তিনি আসার পর নতুন করে আলোচনা শুরু হলো। আমরা যারা এখানে আছি, তাঁরা সবাই বিষয়টা আগে থেকেই অবগত। শাহেদ ভাইকেও আগেই জানানো হয়েছে। তাই কী হয়েছিলো সে বিষয়ে নতুন করে আলোচনার দরকার নেই। সরাসরি মূল পর্বে যাওয়াই ভালো। শাহেদ ভাই বললেন, ‘অপু আর নাসির! তোদের কারো কিছু বলার আছে?’

দুজনেই চুপ থাকলো। কিছু বললো না। এরপর শাহেদ ভাই বললেন, ‘যা হয়েছে, আমরা ভুলে যাবো। বন্ধু বন্ধুর মধ্যে এমন হয়েই থাকে। তবে নাসিরের ক্ষমা চাইতে হবে।’

শাহেদ ভাইয়ের কথা শুনে আশ্চর্য হওয়া ছাড়া কোন উপায় নেই! যে ছেলেটা মিছেমিছি নাসিরকে আঘাত করলো, তাঁকে কিছু করতে হবে না; উল্টো নাসিরকে ক্ষমা চাইতে হবে। এ কেমন বিচার! তাই ফারিস বলে উঠলো, ‘ভাই নাসিরের ক্ষমা চাইতে হবে; বিষয়টা বুঝলাম না!’

শাহেদ ভাই সে নাস্তিক টাইপের লোক, তা আমাদের অজানা নয়। তাই তিনি আরেক নাস্তিকের পক্ষ নেবেন এটাই স্বাভাবিক। তবে নাস্তিকরা ববারর দাবি করে থাকে, তাঁরা নাকি আস্তিকদের থেকে অধিক সৎ! কিন্তু শাহেদ ভাই কিংবা অপুকে সততা অবলম্বন করতে খুব কমই দেখেছি। আজও তাঁর ব্যতিক্রম হবে কেন?

ফারিসের প্রশ্নের জবাবে শাহেদ ভাই বললেন, ‘না বুঝার কী আছে? নাসির মিথ্যা বলে অপুকে রাগিয়েছে। অপু তাঁর প্রতিবাদ করেছে। নাসির যদি ওই কথা না বলতো, তাহলে কি অপু ওর ওপর হাত উঠাতো? তাই দোষটা নাসিরের উপরেই বর্তায়।’

বাহ! কী সুন্দর ফয়সালা। শুনেই তো আমার জ্বালা করছিলো! নাসির যদি মিথ্যে কিছু বলতো, তাহলে শাহেদ ভাইয়ের কথা মেনে নেয়া যেতো। কিন্তু সত্য বললে কারো যদি গায়ে লাগে – এর জন্যে কি সত্যবাদীকে ক্ষমা চাইতে হবে? কী আশ্চর্য!

ফারিস বললো, ‘ভাই! আমার একটা প্রস্তাব আছে।’

– ‘কী?’

– ‘যদি নাসির নাসিরের বক্তব্য মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তবে নাসির ক্ষমা চাইবে। আর যদি নাসিসের কথা সত্য বলে প্রমাণিত হয়, তবে অপু ক্ষমা চাইবে।’

ফারিসের কথা শুনে শাহেদ ভাই অবজ্ঞাসুরে বললেন, ‘তাই নাকি! তো হয়ে যাক প্রমাণ! কী বলিস তোরা?’

অপু আর নাসির মাথা নেড়ে সায় দিলো। ওরা হয়তো ধরেই নিয়েছে – অপুর জয় হবে। নাসির পরাজিত হবে। এরপর নাসির ক্ষমা চাইবে। আর ফারিস মাথা নিচ করে বেড়িয়ে যাবে। ওরা জানেও না, সত্য কতটা শক্তিশালী হয়। আর যারা সত্যের পক্ষে লড়াই করে তারা কতটা আত্মবিশ্বাসী হয়।

ফারিস বললো, ‘ডারউইন এর মতবাদের অন্যতম একটি স্লোগান ছিলো “জীবের অস্তিত্বের জন্য বেঁচে থাকার সংগ্রাম।” এ সংগ্রামে “শক্তিশালী বিজয়ী হবে এবং দুর্বল পরাজিত হবে” – এটিকে প্রাকৃতিক বিষয় হিসেবে দাড় করানোর চেষ্টা করা হয়। “প্রকৃতিতে অস্তিত্বের সংগ্রাম” ডারউইনিজমের এক অন্যতম দিক। এর ফলে শক্তিশালীদের মনে দুর্বলদের বিনাশ করার এক মানসিকতার উদ্ভব ঘটে। যার ফলে বিশ্বে শুরু হয় দুর্বলের প্রতি সবলের অত্যাচার। কেননা বেঁচে থাকার সংগ্রামে তার-ই বিশ্বে টিকে থাকার অধিকার রয়েছে – যে অপরের তুলনায় অধিক শক্তিশালী।’

পাশ থেকে অপু বলে উঠলো, ‘তোর কথাগুলো ডারউইনের কোন বক্তব্য থেকে নেয়া?’

ফারিস বললো, ‘তুই তো নিশ্চয় ডারউইনের The Origin of Species বইটা পড়েছিস?’

কিছু কিছু ক্ষেত্র এমন আছে, যেখানে মানুষ মিথ্যে বলে তাঁর ব্যক্তিত্ব রক্ষা করতে চায়। অপুও এমন একটি পর্যায়ে আছে। মিথ্যে না বলে তাঁর উপায় নেই। তাই সে হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লো। অবশ্যি অপু যে বইটা পড়ে নি তা আমি নিশ্চিত। এর আগেও তাঁর সাথে বইটা নিয়ে কথা হয়েছিলো। কিন্তু বইটা সম্পর্কে সে তেমন কিছুই বলতে পারে নি।

ফারিস বললো, ‘The Origin of Species-বইটার একটি বক্তব্য এমন – “The Origin of Species by means of Natural Selection or the Preservation of Favoured Race in the Struggle for Life” অর্থাৎ প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্যে প্রজাতি সমূহের উৎপত্তি অথবা জীবন সংগ্রামে আনুকূল্য প্রাপ্ত প্রজাতি সমূহের সংরক্ষণ।’

শাহেদ ভাই বললেন, ‘এখানে সমস্যা তো কোথাও দেখছি না?’

ফারিস বললো, ‘এখানেই তো বিরাট সমস্যা ভাই! ডারউইন বুঝাতে চেয়েছেন প্রকৃতিতে তাঁরাই টিকে থাকবে যারা অধিক শক্তিশালী। আর অপেক্ষাকৃত দুর্বলরা নিঃশেষ হয়ে যাবে। ডারউইন এটাকে প্রকৃতির সাধারণ নিয়ম হিশেবে গণ্য করতেন। এই আত্মঘাতী মতবাদ সাম্রাজ্যবাদী, পুঁজিবাদী ও অন্যান্য বস্তুবাদী সমাজে দ্রুততর ভাবে গৃহীত হয়। যে সমাজগুলো নীতিহীন এক শোষনমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছিলো। এই রাজনৈতিক ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করতে বৈজ্ঞানিক যুক্তিরও দরকার ছিলো। ডারউইনের এই বক্তব্যের মধ্যেই তাঁরা তথাকথিত বৈজ্ঞানিক যৌক্তকতা খুঁজে পেয়েছিলো। আর এ মতবাদকেই সবল মানুষগুলো দুর্বলদের উপর অত্যাচার চালানোর প্রাকৃতিক কারণ হিশেবে চালিয়ে দিতো।’

– ‘এটা কেবল তোর দাবি। এ দাবির যৌক্তিক কোন ভিত্তি নেই।’

শাহেদ ভাইয়ের প্রশ্ন শুনে ফারিস মুচকি হেসে বললো, ‘না ভাই! এটা আমার নিছক দাবি নয়। অনেক বিজ্ঞানীর বক্তব্য ঘেঁটেই আমি একথা বলছি।’

পাশ থেকে মিসবাহ ফারিসকে লক্ষ্য করে বলে উঠলো, ‘তোর কথার প্রমাণ চাই। প্রমাণ ছাড়া আমরা কোন কথাই বিশ্বাস করবো না।’

শাহেদ ভাইয়ের পক্ষের লোকজন সবাই মিসবাহ-এর সাথে একাত্মতা পোষণ করলো। ফারিস বললো, ‘ঠিক আছে, আমি প্রমাণ দিচ্ছি। আমেরিকার প্রখ্যাত বিবর্তনবাদী ও জীবাশ্মবিজ্ঞানী Stephen Jay Gould এই ব্যাপারে বলেছেন –“এর ফলে (ডারউইনের বিবর্তনবাদ) দাস প্রথা, সাম্রাজ্যবাদ, বর্ণবাদ, শ্রেণী সংগ্রাম, লিঙ্গ বৈষম্য প্রভৃতি সামাজিক ও রাজনৈতিক অনাচার বিজ্ঞানের নামে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।”

ইতিহাসের অধ্যাপক Jacques Barzun তার লিখা Darwin, Marx, Wagner-বইতে বর্তমান বিশ্বের নৈতিকতার অধঃপতনের কারণ পর্যালোচনা করেছেন। তিনি রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ডারউইনিজমের প্রভাব বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন –“১৮৭০ সাল থেকে ১৯১৪ সালের মধ্যে ইউরোপের প্রত্যেকটি দেশের যুদ্ধবাজ রাজনীতিবিদরা চাচ্ছিলো অস্ত্র। ব্যক্তি স্বাতন্ত্রবাদী দল চাচ্ছিলো নিষ্ঠুর প্রতিযোগীতা। রাজতন্ত্রবাদীদের দাবি ছিল অনগ্রসর জাতিগোষ্ঠীর উপর প্রাধান্য বিস্তার। সমাজতন্ত্রীদের দাবি ছিলো ক্ষমতা দখল করা। বর্ণবাদীদের দাবি ছিলো বিরোধীদের অভ্যন্তরীণ বহিষ্কার। এ সকল মতাদর্শই কোন না কোন ভাবে তাদের চিন্তাধারার স্বপক্ষে ডারউইনবাদকে ব্যবহার করে। ডারউইন ও স্পেনসার বিষয়টি পূর্বেই উপস্থাপন করেছিলেন। এতে বলা হয়েছে যেহেতু কোন বর্ণের শ্রেষ্ঠত্ব একটি জীবিজ্ঞানের বিষয়, সেহেতু তা মানব সমাজ সম্পর্কিত। তাই এটা বিজ্ঞানের বিষয়বস্তু, এটাই ডারউইনবাদ”।’

শাহেদ ভাই বললেন, ‘দু একজন বিচ্ছিন্ন লোকের বক্তব্যের দ্বারা তোর কথা সত্য বলে প্রামণিত হয় না। ডারিউনিজম একটা বৈজ্ঞানিক মতবাদ। এ মতবাদ গ্রহণ করলেই সে সন্ত্রাসবাদের সাথে জড়িয়ে পড়বে – আমার কাছে কখনোই এমনটা মনে হয় না। বিজ্ঞানের তো আরও অনেক মতবাদ আছে, কিন্তু সেগুলোর কোনটাই মানুষকে সন্ত্রাসবাদের দিকে উদ্বুদ্ধ করলো না, কেবল ডারইনিজম করলো? কথাটা কেমন একপেশে হয়ে গেলো না? আমার মনে হয় কী ফারিস, তোরা ডারইনিজমের বিরোধিতা করিস অন্য কারণে। এই মতবাদ গ্রহণ করলে যে, ধর্ম নামক শেকলটা আর মানুষের পায়ে লাগাতে পারবি না। তাই এই মতবাদের বিরোধিতা করিস!’

ফারিস অত্যন্ত মনযোগ সহকারে শাহেদ ভাইয়ের কথা শুনলো। এরপর বললো, ‘ভাই! অন্য এমন কোন বৈজ্ঞানিক মতামত নেই, যেখানে বলা আছে যে – প্রকৃতিতে কেবল তাঁরাই টিকে থাকবে, যারা অধিকতর শক্তিধর। তবুও আপনি যেহেতু আরও প্রামাণ চাচ্ছেন, ঠিক আছে। আমি প্রমাণ দিচ্ছি। কলম্বাস তাঁর আমেরিকা যাত্রার সময় দাবি করেন যে – “কোন কোন জনগোষ্ঠী অর্ধ পশুর চারিত্রিক বিশিষ্ট সম্পন্ন।”

তাঁর কাছে আমেরিকার অধিবাসীগণ মানুষ ছিলো না। বরং তারা ছিলো এক ধরণের উন্নত প্রজাতির পশু। এ ধারণা থেকেই তিনি যে সমস্ত দেশগুলি আবিষ্কার করেছিলেন, সেগুলি উপনিবেশে পরিণত করেন। নেটিভ আমেরিকানদের কৃতদাস হিশেবে ব্যবহার করেন। দাস ব্যবসা শুরুর কৃতিত্ব সম্পূর্ণটাই তার প্রাপ্য। কোন দ্বীপে যখন কলম্বাস প্রথম আগমন করেন তখন এর জনসংখ্যা ছিলো ২০০০০০। ২০ বছর পর এ সংখ্যা দাড়ায় ৫০,০০০। ১৫৪০ সালে এ সংখ্যা দাড়ায় মাত্র ১০০০। ঐতিহাসিকগণের হিসাব অনুযায়ী কলম্বাস এই মহাদেশে পদার্পণ করার সময় থেকে ১০০ বছরের কম সময়ের মধ্যে ৯৫ মিলিয়ন লোককে হত্যা করে উপনিবেশবাদীরা। কলম্বাস যখন আমেরিকা আবিষ্কার করেন তখন নেটিভরা ছিলো ৩০ মিলিয়ন। কিন্তু গণহত্যার কারণে তা ২ মিলিয়নে নেমে যায়। এই ব্যাপক ও নিষ্ঠুর গণহত্যার কারণ হচ্ছে, নেটিভ আমেরিকনাদের তারা মানুষ হিসেবে নয় বরং পশু হিসেবে বিবেচনা করতেন।’

– ‘তুই তো উপনিবেশবাদীদের চ্যাপ্টারে চলে গেলি। আমরা তো কথা বলছি ডারউইনিজম নিয়ে, উপনিবেশবাদ নিয়ে নয়।’

– ‘ভাই! আমি নতুন চ্যাপ্টার খুলি নি। সাম্রাজ্যবাদীদের নির্যাতনের সাথে ডারউইনিজম-এর সম্পর্ক আছে। তাই আমি কথাগুলো বলেছি।’

– ‘কীভাবে?’

– ‘উপনিবেশবাদ থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে গ্রেট-বৃটেন। বৃটেন তাঁর নিজ স্বার্থে শোষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্থানীয় অধিবাসীদের বিপর্যয়, দুঃখ-কস্ট, সৃষ্টি করে। বৃটেনের এই নিপীড়নমূলক কার্যকলাপের যৌক্তিক ভিত্তি এবং তাদের নীতি সঠিক প্রমাণ কারার দায়িত্ব বৃটিশ সমাজবিজ্ঞানী ও বৈজ্ঞানিকদের উপর বর্তায়। তাঁদের পক্ষে সর্বপ্রথম এই বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দাঁড় করান ডারউইন। কারন ডারউইন দাবি করেন যে, বিবর্তনবাদের বিভিন্ন স্তরে একটি শ্রেষ্ঠ মানবজাতির অস্তিত্ব বজায় আছে। আর এ সকল উন্নত প্রাণী হল শ্বেতাঙ্গ প্রজাতি। তিনি এও যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, অন্যান্য মনুষ্য প্রজাতির উপর শ্বেতাঙ্গদের এই অত্যাচার, অবিচার ও নিষ্ঠুর আচরণ হলো একটি প্রাকৃতিক আইন। ভিক্টোরিয়া যুগের গ্রেটব্রিটেন ডারউইনিজমকে তাদের অত্যাচারের তথাকথিত বৈজ্ঞানিক যুক্তি হিশেবে ব্যবহার করে।’

– ‘দেখ ফারিস! এগুলো হলো তোর যুক্তি। যেটার কোনটাই তেমন শক্তিশালী নয়। কারণ ভিক্টরিয়া যুগের বৃটেন ডারউনিজমকে নয় বরং তাঁদের সামরিক শক্তিকে ব্যবহার করে নিপীড়নমূলক কার্যকলাপ পরিচালনা করেছে।’

– ‘আমি যদি আমার দাবির পক্ষে ঐতিহাসিকদের মতামত দেখাতে পারি, তাহলে কী মেনে নেবেন?’

– ‘আগে শুনিই না, কোন ঐতিহাসিক তোর পক্ষে কথা বলেছেন?’

– ‘বিখ্যাত ঐতিহাসিক James Joll তার লিখা Europe Since নামক পুস্তিকায় বিবর্তনবাদ, বর্ণবাদ, সাম্রাজ্যবাদের পারস্পরিক সম্পর্ক বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন –“সাম্রাজ্যবাদীদের প্রধান উৎসাহব্যাঞ্জক মতবাদ হলো সাধারনভাবে যাকে সামাজিক ডারউইনবাদ হিসেবে শ্রেণিবিন্যাস করা যায়। এ মতাবাদে রাষ্ট্র সমূহ অস্তিত্বের জন্য এক চিরস্থায়ী সংগ্রামে লিপ্ত কোন মনুষ্য প্রজাতিকে অন্যদের চেয়ে বিবর্তনবাদী প্রক্রিয়ায় শ্রেষ্ঠ হিসেবে বিবেচিত। এবং এ সংগ্রামে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রজাতি বল প্রয়োগের মাধ্যমে সবসময় তাদের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখে।”

শাহেদ ভাই যখন ফারিসের বক্তব্যের বিরুদ্ধে কিছু বলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন; তখন ফারিস জানালো যে – James Joll দীর্ঘদিন যাবত অক্সফোর্ড, স্ট্যানফোর্ড ও হ্যাভার্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। একথা শুনার পর শাহেদ ভাই বলার মত কিছু পেলেন না। ফারিস আরও বললো, ‘প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের বিরুদ্ধে বৃটেনের হত্যাযজ্ঞের পেছনেও ডারউইনিজম দায়ী।’

শাহেদ ভাই বললেন, ‘জোড়াতালি দিয়ে কিছু প্রমাণ করার চেষ্টা করিস না ফারিস। ১ম বিশ্বযুদ্ধ কেন হয়েছিলো তা তুইও জানিস। ডারউনিজমের সাথে সে যুদ্ধের মধ্যে বিন্দুপরিমান সম্পর্ক নেই।’

– ‘আমি যদি প্রমাণ দেখাতে পারি?’

– ‘দেখা তোর প্রমাণ!’

– ‘উনবিংশ শতাব্দীতে ডারউইনবাদ সাম্রাজ্যবাদীদের বৈজ্ঞানিক হাতিয়ারে পরিণত হয়। তাঁরা তুর্কিদের অনুন্নত জাতি হিসেবে বিবেচনা করতে থাকে। বৃটিশ প্রাধানন্ত্রী William Ewart Gladstone প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন, “তুর্কি জনগোষ্ঠী মনুষ্য প্রজাতির সদস্যই নয় বা মনুষ্য পদবাচ্য নয়। এবং মানব সভ্যতার স্বার্থে তাদেরকে এশিয়ার Steppes অঞ্চলে বিতাড়িত এবং Anatolia থেকে বিতাড়িত করা উচিৎ।”’

– ‘William Gladstone-এর বক্তব্যের সাথে ডারউইনিজমের কী সম্পর্ক? নাকি তুই বলতে চাচ্ছিস, ডারউনের কোন বক্তব্য থেকে তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছেন?’

– ‘হ্যা ভাই! আপনি ঠিকই ধরেছেন। ডারউইন-এর বক্তব্যে অনুপ্রাণিত হয়েই William Gladstone তুর্কিদের ক্ষেত্রে এরূপ মন্তব্য করেছেন।’

– ‘হোয়াট? ডারউইন-এর এমন কোন বক্তব্য আমি পাই নি, যা দিয়ে তোর দাবি-কে সত্য বলে প্রমাণ করা যায়।’

– শাহেদ ভাইয়ের ভাবখানা দেখে মনে হচ্ছে তিনি ডারউইন-এর সব বক্তব্য মুখস্ত করে ফেলেছেন। ডারউইন-এর লিখা সব বই পড়ে শেষ করেছেন। কোনকিছু বাদ রাখেন নি। তবে বেশি ভাব নেয়া মাঝে মাঝে বিপদের কারণ হতে পারে। শাহেদ ভাইয়ের ক্ষেত্রেও এমন হয় কি না – দেখার বিষয়!

ফারিস বললো, ‘তুর্কিদের সম্পর্কে ডারউইন-এর মনোভাব প্রকাশিত হয় ১৮৮৮ সালে। তাঁর লিখা The Life and Letterts oc Charles darwin পুস্তকটির মাধ্যমে। তিনি তুর্কিদের সম্পর্কে বলেন –“আমি যদি আপনাকে সভ্যতার উন্নয়ন প্রক্রিয়ার প্রাকৃতিক নির্বাচনের সংগ্রাম এবং এর ধারাবাহিক ভূমিকা উল্লেখ করি তা বিশ্বাস করাই আপনার জন্য কঠিন হবে। স্মরণ করুন, কয়েক শতক পূর্বে তুর্কীদের দ্বারা বিপর্যস্ত হওয়ার আতংকের ঝুকির মধ্যে ইউরোপ সময় কাটিয়েছে। আর বর্তমানে যা একটি হাস্যস্পদ ব্যাপার। এ অস্তিত্বের সংগ্রামে অধিকতর সুসভ্য ককেশীয় (ইউরোপীয়) প্রজাতি যে উন্নত ও সুসভ্য প্রাজাতির দ্বারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে তার ইয়াত্তা নেই।”

ডারউইনের এই অসঙ্গতিপূর্ণ কথাবার্তা ঐ সময়ে ওসমানী খিলাফতের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদীদের দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়। আপনি যদি ডারউইনের কথাটির দিকে একটু গভীর দৃষ্টি দেন তাহলে দেখবেন, তিনি তুর্কীদের নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়াকে একটি সহজাত বিষয় বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, বিবর্তনবাদের ফলেই এমনটি ঘটবে। এর মাধ্যমে তিনি তুর্কিদের নির্মূল করার একটি ভুয়া বৈজ্ঞানিক মতবাদ দাড় করাতে চেষ্টা করেন। বৃটেন তুর্কীদের বিরুদ্ধে ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড এর অধিবাসীদের ব্যবহার করে। তাদের বুঝানো হয়েছিল বৃটেন এর বিপক্ষ অবলম্বন করা তাদের জন্য সম্মানজনক নয়। কারণ তুর্কিরা হলো অনুন্নত জাতি। আর বৃটেন উন্নত। ফলে এ যুদ্ধে তুর্কী সেনাবাহিনীর ২৫০,০০০ সেনা নিহত হয়।’

– ‘দেখ ফারিস! এসব বিচ্ছিন্ন দু একটা মন্তব্যকে তুই ডারউনিজমের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারিস না। সাম্রাজ্যবাদীরা কখনোই এ কথা বলে নি যে, তাঁদের রাষ্ট্র ডারউনিজমের ওপর প্রতিষ্টিত। বরং তাঁদের সন্ত্রাসবাদের কারণ পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ। এখানে ডারউনিজম কোনভাবেই দায়ী নয়।’

– ‘আপনার কথার সাথে আমি একটু দ্বিমত পোষণ করছি।’

– ‘কেন?’

.

– ‘কারণ বিশ্বের সবথেকে বড় বড় খুনিরা রাষ্ট্রীয়ভাবে ডারউইনিজমকে ব্যবহার করেছে তাঁদের স্বপক্ষের বৈজ্ঞানিক যুক্তি হিশেবে।’

ফারিসের কথা শুনে অপু বলে উঠলো, ‘তোর কথার প্রমাণ কী?’

ফারিস বললো, ‘প্রমাণ হচ্ছে গণচীন।’

অপু বললো, ‘গণচীনে তো সমাজন্ত্র ছিলো। ডারউইনিজমকে টানছিস কেনো?’

– ‘ডারইউনিজমকে টানছি এই জন্য যে, গণচীন ডারউইনিজমের উপর প্রতিষ্টিত ছিলো।’

– ‘এটা হাস্যকর দাবি।’

– ‘এটা বাস্তব দাবি। হাস্যকর হতে যাবে কেনো? মাও সেতুং নিজ মুখে স্বীকার করেন যে গণচীন ডারউইনিজমের উপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি বলেন –“চীনা সমাজতন্ত্র ডারউইন ও তার বিবর্তনবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত”।’

সত্যকে জানার পরও কিছু মানুষ তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ তাঁরা সত্যকে ভয় পায়। অপু তাদেরই একজন। নয়তো ফারিস ওকে যতই বুঝাতে চাচ্ছে, ও বারবার পেঁচিয়ে যাচ্ছে। ফারিস ওকে যতই বুঝাচ্ছে গণচীন ডারউইনিজমকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বৈজ্ঞানিক যুক্তি হিশেবে ব্যবহার করেছে; ও ততই পেঁচিয়ে যাচ্ছে। তাই ফারিস বললো, ‘আচ্ছা তুই এবার থাম! আমি তোঁকে আরও একটি উদাহরণ দিচ্ছি। তাঁর আগে আমাকে বল, তুই স্ট্যালিনকে চিনিস কি না?’

– ‘এটা কোন প্রশ্ন হলো? তাঁকে কে না চেনে? সবাই চেনে। আমি চিনবো না!’

– ‘স্ট্যালিনের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাবাদের উদাহরণ আমি এখানে দিতে চাচ্ছি না। কেবল এতটুকুই বলবো, স্ট্যালিনের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাবাদের পেছনেও এই ডারউইনিজম দায়ী।’

– ‘কীভাবে?’

– কারণ স্ট্যালিন রাষ্ট্রীয়ভাবে ডারউইনিজমকে তাঁর হাতিয়ার হিশেবে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি বলেছেন –“জৈব পদার্থের মধ্যে দ্বান্দিক বস্তুবাদের আবিষ্কার হচ্ছে ডারউইনবাদের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজয়”।’

– ‘স্ট্যালিনের এই বক্তব্য থেকে কি তোর দাবি সত্য বলে প্রমাণ হয়?’

– ‘আগে তো আমাকে শেষ করতে দে!’

– ‘আচ্ছা বল।’

– ‘স্ট্যালিন আরও বলেন –“কোন রকম দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছাড়াই আমরা নির্ভুলভাবে ছাত্রদের তিনটি বিষয় শিক্ষা দিতে চাই । তা তা হলো- পৃথিবীর বয়স, ভুতাত্বিক সৃষ্টি তত্ব ও ডারউইন এর শিক্ষা।” তাঁর আরও অনেক বক্তব্য থেকে জানা যায় যে, তিনিও দুর্বলদের প্রতি অত্যাচার করতেন ডারউইন এর বক্তব্যে অনুপ্রাণিত হয়ে। কেননা তিনি বিশ্বাস করতেন, সবলেরা দুর্বলের প্রতি অত্যাচার করবে। আর দুর্বলরা তাঁদেরকে বিলিয়ে দেবে; যা ডারউইনিজমের অন্যতম দাবি। স্ট্যালিন শুধু বড় মাপের একজন হত্যাকারীই ছিলেন না; একজন বড় মাপের নাস্তিকও ছিলেন। তাঁর নাস্তিক হওয়ার পেছনেও ডারউইনিজম দায়ী।’

মিসবাহ এতক্ষণ কোন কথা বলে নি। কেবল হা করে তাকিয়ে ছিলো। কিন্তু ফারিসের বক্তব্য শুনে বলে উঠলো, ‘ডারউইনের বই পড়ে তিনি নাস্তিক হয়েছিলেন – এ কথা আমি মানতে পারছি না ফারিস। আমিও তো ডারউইন-এর বই পড়েছি, কিন্তু নাস্তিক হই নি তো!’

ফারিস বললো, ‘তোর মত আমিও মানতাম না যদি না স্ট্যালিনের ছোটবেলার বন্ধু আমাদেরকে এ তথ্য না দিতো।’

– ‘কোন তথ্য?’

– ‘স্ট্যালিনের বাল্যবন্ধু G Glurdjidze তার লিখিত Landmarks in the Life of Stalin নামক পুস্তিকায় বলেছেন – “শৈশবে তিনি (ষ্ট্যালিন) যখন গির্জার স্কুলে পড়াশুনা করতেন; তিনি তখন বিদ্রূপাত্মক ও বিশ্লেষণধর্মী চিন্তাধারার অধিকারী ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি চার্লস ডারউইনের পুস্তকাদি পড়া শুরু করলেন এবং নাস্তিক হয়ে গেলেন”।’

ফারিসের কথা শেষ না হতেই শাহেদ ভাই কথা কেঁড়ে নিয়ে বললেন, ‘তার মানে তুই আমাদেরকে এটাই বুঝাতে চাচ্ছিস যে – ডারউইনিজম সন্ত্রাসবাদের বৈজ্ঞানিক হাতিয়ার?’

– ‘না ভাই! আমি বুঝাতে চাই নি। আমি প্রমাণ করে দেখিয়েছি।’

অপু খুব অবজ্ঞাসুরে বলে উঠলো, ‘বিশ্বের সবথেকে বড় সন্ত্রাসী ছিলো হিটলার। যার পরোক্ষ কারণে কয়েক কোটি মানুষ নিহত হয়। সে কোত্থেকে প্রেরণা লাভ করেছিলো? ডারউইনিজম যদি সন্ত্রাসীদের বৈজ্ঞানিক হাতিয়ার-ই হয়; তাহলে হিটলারেরও তো এই হাতিয়ার ব্যবহার করা উচিৎ ছিলো। সে কি তা করেছে?’

– ‘অবশ্যই করেছে।’ ফারিসের ঝটপট উত্তর।

শাহেদ ভাই বললো, ‘তুই কি জোড়াতালি দিয়ে কিছু মেলাতে চাচ্ছিস, ফারিস?’

ফারিস বললো, ‘জোড়া তালি দিয়ে মেলাবো কেনো ভাই। যা যৌক্তিকভাবেই মিলে আছে; তা জোড়াতালি দিয়ে মেলানোর কী দরকার?’

– ‘যৌক্তিক ভাবে তুই তোর দাবির সত্যতা দেখাতে পারবি?’

– ‘জ্বী পারবো।’

মিসবাহ বললো, ‘তাহলে আর দেরি কেনো?’

ফারিস এক ফালি হেসে নিয়ে জবাব দিলো, ‘হিটলার জার্মান জাতিকে সবথেকে উঁচু জাতি মনে করতেন। তিনি বলতেন –“নরভিক জার্মান জাতিকে বাদ দিলে বাঁদরের নাচ ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।”

শাহেদ ভাই বললেন, ‘তাঁর এ বক্তব্য কি তোর দাবির স্বপক্ষে দলিল হিশেবে ব্যবহার করা যায়?’

ফারিস বললো, ‘ভাই আমি এখনো শেষ করি নি।’

– ‘ওকে ক্যারি অন।’

– ‘হিটলার আরও বলেন – “একটি উন্নত প্রজাতি অনুন্নত বা নিচ প্রাজতিকে শাসন করবে ……… এটা একটি অধিকার যা আমরা প্রকৃতিতে দেখতে পাই। এবং এটাই একমাত্র বোধগম্য ও যুক্তিসঙ্গত অধিকার যা বৈজ্ঞানিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত।” উন্নত প্রজাতি অনুন্নত প্রজাতিকে শাসন করার অধিকার প্রাকৃতিক ভাবেই লাভ করে – তিনি এ মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। যা তাঁর বক্তব্যের দ্বারাই প্রমাণিত হয়। তিনি এও দাবি করেন, এটা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। আমাদের আর বুঝতে বাকি থাকে না যে, তিনি এ বৈজ্ঞানিক প্রমাণ কার কাছ থেকে ধার করেছিলেন।’

নাসির এতক্ষণ কোন কথা বলে নি, চুপ ছিলো। কিন্তু এবার বলে উঠলো, ‘তাঁর মানে ষাট লাখ ইহুদিকে মারার যৌক্তিকতা তিনি ডারউইনের মতবাদে পেয়েছিলেন?’

ফারিস বললো, ‘হু। তুই ঠিক ধরেছিস। হিটলার ইহুদিদেরকে খুব নিচু প্রজাতির মানুষ বলে বিবেচনা করতেন। তিনি বলতেন –“ইয়াহুদী জাতি একটি মানবেতর প্রজাতি গোষ্ঠী যা পূর্ব নির্ধারিত জন্মগত অধিকার হিসেবে খারাপ। যেমন নাকি নরভিক জার্মান জাতিকে মহৎ কাজের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। ইতিহাস এমন একটি হাজার বছরের মহান সাম্রাজ্য সৃষ্টি করবে, যার ভিত্তি হবে প্রজাতির মর্যাদা ভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা যা প্রকৃতি কর্তৃক নির্ধারিত।”

হিটলারের ধর্মের প্রতি এই বীতশ্রদ্ধা দেখে Daniel Gasman তার লিখিত “Scientific Origins of Natural Socialism” বইতে লিখেছেন –“হিটলার প্রথাগত ধর্মের বিরুদ্ধে এককভাবে জৈবিক বিবর্তনবাদকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করতেন। তিনি বহুবার খৃষ্টধর্মকে হেয় প্রতিপ্নন করেন এই কারণে যে, ধর্মীয় বিশ্বাস ডারউইনবাদী শিক্ষার পরিপন্থী। হিটলারের কাছে আধুনিক বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির নির্দেশক হলো ডারউইনবাদ।”

আমাদের আলোচনার কিছুটা টান টান উত্তেজনা বিরাজ করছিলো। আমাদের বিপক্ষের লোকজন ফারিসের কাছে একেবারে ধরাশায়ী হয়ে পড়েছিলো। আমি মনে মনে চাচ্ছিলাম আলোচনা আরও কিছুক্ষণ চলুক। শাহেদ ভাই তাঁর ভুল বুঝতে পারুক। কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিত এক ঘটনা আমাদের আলোচনার ব্যাঘাত ঘটালো।

আমরা রুমের ভিতর ছিলাম, তাই সত্যিকার অর্থে কী ঘটেছিলো; তা বলতে পারবো না। কেবল ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার আওয়াজ পাচ্ছিলাম। শাহেদ ভাই দৌড়ে বেড়িয়ে গেলেন। সাথে সাথে অপু আর মিসবাহও দৌড়ালো।

ফারিস সিরিজ – ১৩/ জাকারিয়া মাসুদ।

Original Source

তথ্যসূত্রঃ

1) Francis Darwin, On the Origin of Species, (The Pennsylvania State University press, October 1st, 1859).

2) Stephen Jay Gould, The Mismeasure of Man, (W.W. Norton and Company, New York, 1981).

3) Jacques Barzun, Darwin, Marx, Wagner, (Garden City, N.Y.: Doubleday, 1958, pp.94-95, cited in Henry M. Morris, The Long war Against God, Baker Book House, 1989).

4) Harun Yahya, Darwinism Refuted, ( Goodword Books Pvt. Ltd, Nizamuddin West Market, New Delhi, 1st edition, 2000).

5) Harun Yahya, The Disaster Darwinism Brought Humanity, ( Al-Attique Publishers Inc. Canada, 2001).

6) The Road to India and What Has Been Done for the Sake of Oil: Turkey and Britain.

7) Francis Darwin, The Life and Letters of Charles Darwin, Vol.I, p.285-286, (1888. New York D. Appleton and Company).

8) Kent Hovind,The False Religion of Evolution,

http://www.royalse.com/scroll/evolve/ndxng.html

9) E. Yaroslavsky, Landmarks in the Life of Stalin, Moscow: Foreign Languages Publishing House, 1940, pp. 8.; cited by Paul G. Humber, Stalin’s Brutal Faith, Vital articles on Science/Creation October 1987, Impact No. 172.

10) War Against Religion, http://www.geocities.com/Heartla…/Meadows/1733/book2-ch3.htm .

11) J. Tenenbaum., Race and Reich, (Twayne Pub., New York, 1956).

12) Jerry Bergman, Darwinism and the Nazi Race Holocaust, http://www.trueorigin.org/holocaust.htm.)

13) L.H. Gann, “Adolf Hitler, The Complete Totalitarian”, The Intercollegiate Review, Fall 1985).

14) Henry M. Morris, The Long war Against God, (Baker Book House, 1989).

15) L.H. Gann, “Adolf Hitler, The Complete Totalitarian”, The Intercollegiate Review, Fall 1985.

 

মতামত দিন

Solve : *
11 + 12 =