পর্যালোচনা

সুখী হওয়ার চমৎকার ৬ টি উপায়

কিভাবে সুখী হবো? – একটি বহুল প্রচলিত জিজ্ঞাসা।

সুখঃ

কখনও ভেবে দেখেছেন এটা আসলে কী? এটা কি একটি আবেগ, মেজাজের একটি ধরন, মনের ক্ষণকালীন অবস্থা; নাকি জীবনের একটি ধারা? আমরা কীসে সুখী হই? এই দুনিয়াতে কি আসলেই সুখ বলে কিছু আছে? পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এই সুখ বা আনন্দের উল্লেখ বেশ কয়েক জায়গায় করেছেন।

যেমন, আল্লাহ বলেনঃ সে দিন জান্নাতীরা আনন্দে মশগুল হয়ে থাকবে। [সূরাহ ইয়া সীন (৩৬) :৫৫]

তাদের প্রতিপালক তাদেরকে যা দেবেন, তারা তা সানন্দে উপভোগ করবে এবং তিনি তাদেরকে রক্ষা করবেন জাহান্নামের শাস্তি হতে। [সূরাহ আত-তূর (৫২):১৮]

আল্লাহ যখন পরম সুখ ও আনন্দের কথা উল্লেখ করেন, তখন তিনি পরকালের সুখের কথা বলেন। তাহলে, এই পার্থিব জীবনের কি সুখের কিছু নেই? বেশ কিছু সহীহ হাদীস, সুন্নাহ, এবং কুরআনের আয়াতেও আমরা এই জীবনের সুখের কথা খুঁজে পাই – যা থেকে অনেক কিছু শিক্ষণীয়ও আছে।

সুখী হতে আমাদের কী কী প্রয়োজন?

মানব সৃষ্টির শুরু থেকেই এই ভাবনা মানুষের মনকে আলোড়িত করেছে। অগণিত দার্শনিক, মনোবিজ্ঞানী, শিল্পী, কবি, গীতিকার এই প্রশ্নের জবাব খুঁজে ফিরেছেন এবং ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁদের মধ্য থেকে একজনও আজ পর্যন্ত কোনো পরিপূর্ণ সুখের সংজ্ঞা দিতে পারেননি। একটি বহুল পরিচিত মডেল হলো Maslow’s need hierarchy বা চাহিদাভিত্তিক শ্রেণীবিভাগ। এটা মূলত দাবী করে যে, আমাদের চাহিদাগুলো হলো :

১. শরীরবৃত্তিয় চাহিদা (ঘুম, খাবার, বায়ু, পানি ইত্যাদি)

২. নিরাপত্তা (আশ্রয়, আর্থিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা ইত্যাদি)

৩. ভালোবাসা (সমাজ, পরিবার ইত্যাদি)

৪. সম্মান

৫. আত্মমর্যাদাবোধ

৬. আত্মিক উৎকর্ষ (ধর্ম)

যুক্তিসঙ্গতই মনে হচ্ছে, তাই না? Maslow দাবী করেন যে, প্রাথমিক পর্যায়ের চাহিদাগুলো ক্রমান্বয়ে সবগুলো পূরণ হলে তবেই সবশেষ পর্যায়ের আত্মিক সুখ বা তৃপ্তি লাভ করা সম্ভব হবে। আমরাও কি তা-ই বিশ্বাস করি? এর উত্তর আমরা পবিত্র কুরআনে পেতে পারি।

ইবরাহীম (‘আলাইহিসসালাম) তাঁর স্ত্রী হাজেরা (‘আলাইহাসসালাম) এবং পুত্র ইসমাঈল (‘আলাইহিসসালাম)-কে নির্জন মরু প্রান্তরে একাকী রেখে আসার ঘটনাটি আল্লাহ্‌ তা’আলা আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন। এই স্থানেই পরবর্তী কালে কাবাঘর নির্মাণ করা হয়। ইবরাহীম (‘আলাইহিসসালাম) যখন স্ত্রী-পুত্রকে সেখানে রেখে চলে আসছিলেন, ইবরাহীম (‘আলাইহিসসালাম) একটি অসাধারণ দু’আ করেন,

হে আমাদের প্রতিপালক! আমি আমার সন্তানদের একাংশকে শস্যক্ষেতহীন উপত্যকায় তোমার সম্মানিত ঘরের নিকট পুনর্বাসিত করলাম। হে আমার প্রতিপালক! তারা যাতে সালাত কায়িম করে। কাজেই তুমি মানুষের অন্তরকে তাদের প্রতি অনুরাগী করে দাও আর ফল-ফলাদি দিয়ে তাদের জীবিকার ব্যবস্থা কর যাতে তারা শুকরিয়া আদায় করে। [সূরাহ ইবরাহীম (১৪):৩৭]

এই প্রজ্ঞাময় দু’আ থেকে আমরা বুঝতে পারি, মানুষের আসল চাহিদা গুলো কী কী,

১. সালাত/ঈমান

২. সমাজ/পরিবার

৩. খাদ্য

Maslow এর চাহিদাভিত্তিক শ্রেণীবিন্যাসের সাথে তুলনা করলে দেখা যায় আসলে তা ঠিক উল্টো।সুন্নাহতেও আমরা একই ধরনের উদাহরণ খুঁজে পাই।

আবু মুহাম্মাদ ফাদ্বালা ইবনে উবাইদ আনসারী (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) কর্তৃক বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছেন,

“তার জন্য শুভ সংবাদ, যাকে ইসলামের পথ দেখানো হয়েছে, পরিমিত জীবিকা দেওয়া হয়েছে এবং সে (যা পেয়েছে তাতে) পরিতুষ্ট আছে।”

আল-মিকদাম ইবনুল আসওয়াদ (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর কসম! আমি নিশ্চয়ই রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি,

“যে ব্যক্তি ফিতনা থেকে দূরে থাকবে, সে-ই সুখী; যে লোক ফিতনা থেকে দূরে থাকবে, সে-ই সুখী; যে ফিতনা থেকে দূরে থাকবে, সে-ই সুখী। আর যে ব্যক্তি ফিতনায় পড়ে ধৈর্য ধারণ করবে, তার জন্য কতই না মঙ্গল!”

নাফে ইবনুল হারিস (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) থেকে বর্ণিত নবী ﷺ বলেন,

“একজন মুসলিমের জন্য প্রশস্ত বাসভবন, সৎ প্রতিবেশী ও আরামদায়ক বাহন সুখের নিদর্শন। (আবু দাউদ, হাকিম)”

কাজেই আমাদের ঈমান ও আমলের অবস্থার উপর আমাদের সুখ বাড়ে বা কমে। ধার্মিক ব্যক্তিরা কি আসলেই বেশি সুখী?

বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, গড়পড়তায় ধার্মিক মানুষেরা ধর্মকর্মহীন মানুষদের চেয়ে বেশি সুখী। আবার ধার্মিক নন, এমন মানুষদের সুখ সাময়িক বা অল্পস্থায়ী, সেই তুলনায় ধার্মিক লোকেদের সুখবোধ গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী। অদ্ভুত না!

আমার ধারণা, ধার্মিক মানুষেরা বিশ্বাস করে যে, আমাদের জীবনে ঘটে যাওয়া প্রতিটি বিষয়ের পিছনেই কোনো অন্তর্নিহিত অর্থ ও উদ্দেশ্য আছে। আর ইসলামের চেয়ে বেশি আর কোন ধর্ম জীবন, দুঃখ, ও কষ্টের ব্যপারে অর্থবহ সংজ্ঞা দেয়?

জীবনের পরীক্ষার সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য হলো আমাদের আল্লাহর নিকটবর্তী করা। কাজেই আপনি যখন কষ্টের সময় অতিবাহিত করছেন, আপনি আল্লাহর আরও নিকটবর্তী হচ্ছেন। আর যখন কষ্ট শেষে স্বস্তি আসে, তখন আরো বেশি আল্লাহর নৈকট্য অনুভব করবেন।

আপনার আশেপাশেই ঠিক এই ব্যাপারটা দেখতে পাবেন। কিছু কিছু ভাই-বোনকে কল্পনাতীত কষ্ট ভোগ করতে দেখা যায়, কেউ কেউ অসহনীয় যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যান। তাঁদের কেউ কেউ এমন দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী ধৈর্যধারণ করেন যে, আল্লাহ তা’আলা তাঁদের সবরের পুরষ্কারস্বরূপ তাঁদের অন্তরে শান্তি ঢেলে দেন।

তাহলে আমরা কী করতে পারি?

১. সালাত

সুখের একটি প্রধান উপকরণ হলো সালাত। ইবরাহীম (‘আলাইহিসসালাম) এর দু’আতে আমরা এ কথার প্রমাণ পেয়েছিলাম। কুরআনে আরও বলা আছে –

যারা বিশ্বাস করেছে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের হৃদয় প্রশান্ত হয়। জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই হৃদয় প্রশান্ত হয়। [সূরাহ আর-রা’দ (১৩): ২৮]

২. গুনাহের কাজ থেকে দূরে থাকা

তোমাদের উপর যে বিপদই উপনীত হয় তা তোমাদের হাতের উপার্জনের কারণেই, তিনি অনেক অপরাধই ক্ষমা করে দেন। [সূরাহ আশ-শূরা (৪২):৩০]

এই আয়াতে আমাদেরই করা খারাপ কাজের কারণে খারাপ ফলাফল এবং শাস্তির ব্যপারে সতর্ক করা হয়েছে।

৩. কঠিনতম পরিস্থিতিতেও আশাবাদী থাকা

এ বিষয়ক অনেক হাদীস এবং কুরআনের আয়াত হয়তো আপনারা জানেন, যেখানে বলা আছে –

নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে রয়েছে স্বস্তি। নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে রয়েছে স্বস্তি। [সূরাহ আশ-শারহ (৯৪): ৫-৬]

অবশ্যই পরবর্তী সময় পূর্ববর্তী সময়ের চেয়ে তোমার জন্য হবে অধিক উৎকৃষ্ট। শীঘ্রই তোমার প্রতিপালক তোমাকে (এত নি‘মাত) দিবেন, যার ফলে তুমি সন্তুষ্ট হয়ে যাবে। [সূরাহ আদ দুহা (৯৩): ৪-৫]

কিন্তু এই কথাগুলো শুধু ‘জানা’ আর মনের গভীর থেকে ‘বিশ্বাস’ এক কথা নয়। এই কথাগুলোকে আত্মস্থ করে নিন। প্রয়োজনে কথাগুলোকে কোনো কাগজে লিখে নিন, যা সারাক্ষণ কাছে রাখতে পারবেন এবং যখন তখন পড়তে পারবেন। প্রতিদিন একটা সময় নির্দিষ্ট করে নিতে পারেন, যখন আপনি এই কথাগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করতে পারেন – যেটাই হোক। মোট কথা, এই প্রতিশ্রুতিগুলোকে অন্তরে গেঁথে নিন!

৪. ছোটখাটো জিনিসের ব্যপারেও কৃতজ্ঞ হওয়া

নিজ চোখে প্রজাপতিটিকে দেখতে পারা, ভোরের সূর্য ওঠার ঠিক পূর্ব মুহূর্তের স্নিগ্ধ বাতাস অনুভব করা, সালাতে দাঁড়াতে পারা আর মাথাটিকে সরাসরি মাটিতে ছোঁয়াতে পারা … এ সবকিছুই আমাদের রবের পক্ষ থেকে অনেক বিশাল নিয়ামাত। কাজেই কোন কোন নিয়ামাতের জন্য আমরা আসলেই কৃতজ্ঞ না হয়ে থাকতে পারি, তা ভেবে দেখা উচিত।

৫. অন্যদের সাহায্য করা

অতএব তুমি পিতৃহীনের প্রতি কঠোর হয়ো না। এবং ভিক্ষুককে ধমক দিও না। [সূরাহ আদ-দুহা (৯৩):৯-১০]

আল্লাহ আমাদেরকে আদেশ করেন অন্যদের সাহায্য করার, বিশেষ করে যখন আমরা নিজেরাই তেমন ভালো নেই। এতে আমরা এমন মানুষজনকে পাবো, যারা আমাদের চেয়েও কাতর অবস্থায় আছে। আর এরা তারাই, যাদের সাথে এই দুনিয়ায় আমরা নিজেদের অবস্থার তুলনা করা উচিত।

আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

“(দুনিয়ার ধন-দৌলত ইত্যাদির দিক দিয়ে) তোমাদের মধ্যে যে নিচে, তোমরা তার দিকে তাকাও এবং যে তোমাদের উপরে, তার দিকে তাকিয়ো না। যেহেতু সেটাই হবে উৎকৃষ্ট পন্থা যে, তোমাদের প্রতি যে আল্লাহর নিয়ামাত রয়েছে, তা তুচ্ছ মনে করবে না।” (বুখারী ও মুসলিম)

৬. সিজদা

আপনি যখন ভালো অবস্থায় থাকেন, সিজদা দিয়ে আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে কখনো কার্পণ্য করবেন না। কারণ সিজদাতেই আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী হওয়া যায়। আমাদের রাসূল ﷺ যখনই কোনো খুশির খবর শুনতেন, সাথে সাথে তিনি কৃতজ্ঞতায় সিজদাতে লুটিয়ে পড়তেন।

 

উৎস: Islamic Online University Blog

অনুবাদক: আম্মাতে রাব্বানী, মুসলিম মিডিয়া প্রতিনিধি

অনুবাদ কপিরাইট © মুসলিম মিডিয়া

মতামত দিন

Solve : *
22 ⁄ 2 =