ইসলামিক গল্প তাওহীদ

আমার মাসুদ ভাইয়া, সিরিজ ২

বিষয়: চায়ের কাপে ঝড় !

আজ শনিবার কর্মস্হলে যাওয়ার দিন ৷ শহরে চার দেয়ালের জীবনযাত্রা আর গাড়ীঘোড়ার প্যাপো শব্দ সহ নানা রকম সমস্যায় জর্জরিত এই ঢাকা ৷ সকাল ৬-৮টায় কর্মব্যাস্ত মানুষ় নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে রওয়ান দেয় ৷ যাত্রাবাড়ী লেগুনা স্ট্যান্ডগুলোতে এই সময় যাত্রীদের উপচে পড়া চাপ লক্ষ্য করা যায় ৷ ‘এই পোস্তগোলা, শ্যামপুর, ঢাকামেছ ! ‘ লেগুনাগুলো এভাবে ডাকাডাকি করতে থাকে ৷ কেউ আবার এই সময়ে স্কুলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয় ৷

কারও কারও পিতা-মাতা সন্তাদের স্কুলে দিয়ে আসেন ৷ আর যারা একটু দেরিতে অফিসে যান তাদের কেউ কেউ চায়ের দোকানে ভির জমায় ৷ আমার মাসুদ ভাইয়াও তাদেরই একজন ৷ এই সপ্তাহে ভাইয়ার ডিউটি ২ টা থেকে ৷ তাই তিনিও আজ সকাল সকাল চায়ের দোকানে চলে গেছেন ৷ সময় তখন সকাল ৮টা ৷

তিনি সবসময় আসাদ মিয়ার দোকান থেকে চা খেয়ে থাকেন ৷ আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া আসাদ মিয়ার দোকান খানিকটা বড় তাই সেখানে ১০ জনের মত লোক অনায়াসে বসে চা খেতে পারে ৷ আবার কেউ কেউ চা এখান থেকে কিনে নিয়ে যায় ৷ আমাদের যৌথ পরিবারের সদস্যদের বেশিরভাগই চা বানিয়ে খেতে চান না ৷ তাই তারাও এখান থেকে চা কিনে খেয়ে থাকেন

যাইহোক, ঘটনায় ফিরে যাওয়া যাক ৷

ভাইয়া চায়ের দোকানে গিয়ে দেখলেন সেখানে করিম শেখ বসে আছেন ৷ ভাইয়া দোকানে ঢুকতেই করিম শেখ বলল, আস্সালামু আলাইকুম মাসুদ সাহেব, কি খবর !

মাসুদ ভাইয়া বললেন, আলহামদুলিল্লাহ ! আমি ভাল আছি ৷ আপনি ! —আলহামদুলিল্লাহ ! আমি ভাল আছি ৷

—বাড়ির সবাই কেমন আছে?

—আলহামদুলিল্লাহ ! তারাও ভাল আছে !

এভাবে কথপোকথন চলাকালে মাসুদ ভাইয়া দাড়ানো অবস্হাতেই ভাইয়া আসাদ মিয়াকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ভাই ! দু কাপ চা দিন ৷ —হ ! ভাই ! দিতাছি ! বসেন ! দুইজন কাষ্টমার দাড়াইয়া আছে হেগো একটু দিয়া নিই ৷

—আচ্ছা ! ঠিকাছে !

ভাইয়া চায়ের অর্ডার দিয়ে বসে পড়লেন ৷ আসাদ মিয়াও চা বানানোর প্রস্তুতি নিলেন ৷

করিম ভাইয়ের পাশে বসে মাসুদ ভাইয়া জিজ্ঞেস করলেন

—করিম ভাই, আপনার যে ছেলেটি গত মাসে বড় ধরনের রোগে আক্রান্ত হয়েছিল সে এখন কেমন আছে ?

—আলহামদুলিল্লাহ ! ভাই ! আল্লাহ ভাল রাখছে !

গেল মাসে পোলাডা যখন অসুস্হ হইল তখন তারে নিয়া বিভিন্ন জায়গায় গেলাম চিকিৎসা করাইবার লইগ্গা ৷ কিন্তু কোন লাভ হইল না ৷ পরে একজন কইল শাহজালাল বাবার দরবারে মানত করতে ৷ আমরাও সেই মত করলাম ৷ পরে শাহজালাল বাবার ওসীলায় আল্লাহ ওরে কিছুদিনের মধ্যে ভাল কইরা দিল ৷ মাইনসে ঠিকি কয় ওলীরা যেমন দুনিয়াতে মইরা গিয়াও আল্লাহর থাইক্কা ক্ষমতা লাভ করতে পারে ঠিক আখিরাতেও মাইনসের মুক্তির লইগ্গা সুপারিশ করব !

করিম শেখ এই পর্যন্ত বলে শেষ করল ৷

মাসুদ ভাইয়া যেন তাঁর কথা শুনে একটু বিব্রত বোধ করলেন ৷ পরক্ষণেই বললেন,

—ভাই ! আপনার ধারণা সঠিক নয় ৷ বরং আল্লাহ নির্ধারিত তাক্বদীরের কারণেই আপনার ছেলে সুস্হ হয়েছে ৷ কোন পীর বা ওলী জীবিত বা মৃত কোন অবস্হাতেই কারও কল্যান বা অকল্যান করতে পারেন না ৷

—” কি কইলেন আপনি এডি? আপনি কি উনাদের ব্যাপারে জানেন? উনাদের লগে আপনার তুলনা? আপনি মুসলিম হইয়া কেমনে এডি কন ?” উত্তেজিত হয়ে দাড়িয়ে গেলেন করিম শেখ

— মাসুদ ভাই হাসিমুখে তাঁর কাঁধে হাত রেখে বললেন, উত্তেজিত হবেন না ভাই ! আগে শান্ত হয়ে বসুন ! চা টা খেয়ে নিন তারপর কথা বলছি

করিম শেখ একটু শান্ত হয়ে গেল ! এবং মাসুদ ভাইয়া চায়ের কথা বলতে বলতে আসাদ মিয়া চা-ও উপস্থিত করে ফেললেন !

দুজনই গরম চায়ে চুমুক দেওয়া শুরু করল ৷ একটু করে ফুঁক দিচ্ছে আর চায়ে চুমুক দিচ্ছে ৷ এভাবে একটু একটু করে পুরো চা শেষ হয়ে গেল ৷

চা শেষ করে দুজনের বিল পরিশোধ করে মাসুদ ভাইয়া এবার প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা ! ২০০৪ সালের ১২ জানুয়ারি শাহজালাল (رحيمه الله) মাজারে বোমা হামলার ঘটনা নিশ্চয়ই জানেন ! “(Sylhettoday24.com)

—হ! জানি ? তো?

—কখন ? কি অবস্হায় এই বোমা হামলা হয়?

—রাইত সাঁড়ে আটটায় ওরসের সময় —বিগত ১৩ বছরে কি দোষীদের ব্যাপারে কোন ক্লু পাওয়া গেছে

—না ! তবে পুলিশ কয় অনুসণ্ধান চলতাছে ৷ —আচ্ছা ! বাগদাদ আক্রমণের ঘটনাও নিশ্চয়ই মনে আছে !

—হ !

—যদি তাঁরা অর্থাৎ শাহজালাল বা আব্দুর কাদের জিলানী (رحيمه الله) কবরে শুয়েও কল্যান বা অকল্যান করতে পারতেন তবে নিশ্চয়ই তাদের প্রতিহতও করতে পারতেন ৷

—আরে ভাই ! আপনি উনাদের কেরামতি বোঝেন নাই !

—আচ্ছা ঠিকাছে তর্কের খাতিরে মানছি যে তারা কল্যান বা অকল্যান করতে পারেন ৷ তাহলে নিশ্চয়ই আমাদের নবীর এমনটি করা আরও বেশী সম্ভব !

—হুম! কিন্তু পবিত্র কোরআন রাসূল (صلي الله عليه وسلم) এর ব্যাপারে কি বলছে জানেন?

— কি বলতাছে?

—পবিত্র কোরআন বলছে

قل اني لا املك لكم ضرا ولا رشذا ٥

“বল (হে নবী ! ) আমি তোমাদের ক্ষতি বা উপকার করার ক্ষমতা রাখি না ৷”(সূরা জ্বীন ৭২:২১)

আরও বলছে,

قل اني لن يجيرني من الله احد، ولن اجد من دونه ملتحدا ٥

“বল, আল্লাহর কবল থেকে কেউ আমাকে রক্ষা করতে পারবে না এবং তিনি ছাড়া আমি কোন আশ্রয়স্হল পাব না ৷”(সূরা জ্বীন ৭২:২২)

আরও বলছে,

قل لا اقول لكم عندي خزائن الله ولا اعلم الغيب ولا اقول لكم اني ملك –

“বল, আমি বলি না যে, আমার কাছে আল্লাহর ভান্ডার রয়েছে আর আমি অদৃশ্য বিষয় অবগতও নই আর আমি বলি না যে আমি একজন ফেরেশতা ৷”(সূরা আনয়াম ৬:৫০)

—বলেন কি আপনি ?

—হ্যাঁ ! শুধু তাই নয় !

আবু হুরায়রাহ (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (صلي الله عليه وسلم) বলেছেন,

لا ينجي احدا منكم عمله قالوا ولا انت يا رسول الله قال ولا انا الا ان يتغمدني الله برحمة سددو وقاربوا واغدوا وروحوا وشيء من الدلجة والقصد القصد تبلغوا—

“তোমাদের কাউকেই তার আমল কখনই জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিতে পারে না ৷ তাঁরা (সাহাবীগণ) বলেলন, ‘হে আল্লাহর রাসূল ! আপনাকেও না !’ তিনি বললেন: ‘না ! আমাকেও না ! তবে আল্লাহ আমাকে তাঁর রহমত দ্বারা আবৃত রেখেছেন ৷ তোমরা যথারীতি আমল করে নৈকট্য অর্জন কর ৷ তোমরা সকালে, বিকালে ও রাতের শেষভাগে আল্লাহর ইবাদত কর ৷ মধ্যপন্থা অবলম্বন কর ৷ মধ্যপন্থা তোমাদেরকে লক্ষ্যে পৌছাবে ৷”(সহীহ বুখারী, অধ্যায় ৮১: সদয় হওয়া পর্ব, অনুচ্ছেদ ১৮, হাদীস ৬৪৬৩, হাদীস ও পর্বসূচীর নম্বর বিন্যাস: মুহাম্মদ বিন হাজ্জাজ)

রাসূল (صلي الله عليه وسلم) তাঁর মেয়ে ফাতেমা (رضي الله عنه) কে বলেছিলেন,

ويا فاطمة بنت محمد سليني ما شئت من مالي لا اغني عنك من الله شيئا

“আর মুহাম্মদের কন্যা ফাতেমা ৷ আমার ধনসম্পদ থেকে যা ইচ্ছা চেয়ে নাও ৷ আল্লাহর আযাব থেকে আমি তোমাকে রক্ষা করতে পারব না ৷”(১)

এভাবে বেশ কিছুক্ষণ ভাইয়া তাঁকে বোঝাতে লাগলেন ৷ ফলে এক পর্যায়ে সে রেগে গিয়ে বলল

—আরে রাখেন আপনার কথা ! আপনি খালি একলা জানেন নাকি ৷ আর যারা এত বছর যাবত পড়াশুনা করছে ওরা বুঝি কিছুই জানে না অ্যা ! বাব দাদা চৌদ্দ গুষ্টি গেল, হেরা কেউই বুঝল না ! খালি আপনি বুঝছেন !

এভাবে বলতে বলতেই করিম শেখ প্রস্হান করল ৷ আর মাসুদ ভাইয়া তাঁর প্রস্হানের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ কি যেন ভাবলেন এবং বড় নিশ্বাস ফেলে বললেন

سبحانه وتعلي عما يشركون ٥

“তারা যাকে শরীক করে তা থেকে তিনি মহাপবীত্র এবং বহু উর্ধ্বে ৷” (সূরা যুমার ৩৯:৬৭)

টীকাঃ

১৷ সহীহ বুখারী, অধ্যায় ৫৫: অসীওত পর্ব, অনুচ্ছেদ ১১, হাদীস ২৭৫৩

চায়ের কাপে ঝড় /মেরাজুল ইসলাম প্রিয়

মতামত দিন

Solve : *
24 × 12 =