ইসলামিক গল্প

আমার মাসুদ ভাইয়া, সিরিজ ১

বিষয়: আমাদের বাড়িতে

এখন খুব ভোর ৷ আকাশ এখনো পুরোপুরি সাদা হয়নি ৷ সবসময়ের মতই একটু ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব বইছে ৷

শহরের অনেকে এই সময়ে কর্মক্ষেত্রের উদ্দেশ্য রওয়ানা দিয়ে থাকেন ৷ কেউ কেউ যান ৮ টা বা ৯ টার দিকে ৷ তবে গ্রামে বসবাসের অভিজ্ঞতা আমার নেই ৷ এক লোকের কাছে শুনেছিলাম গ্রামের লোকগুলো নাকি খুব তাড়াতাড়ি ঘুমতে যায় এবং খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠে ৷ শুধু তাই নয়, তারা সকালে ফজর নামাজ পরে নাস্তা করে কাজে বেরিয়ে পরে ৷

এছাড়াও উপভোগ করার মত রয়েছে পাখির কিচির-মিচির গান ৷ ঝিরঝিরে বাতাস ৷ সবুজ গাছ-পালা, ছোট ছেলেদের নদীতে ঝাপ দেওয়া, সাঁতার কাঁটা আরও কতকি ৷ আমি শুনছিলাম আর মনে হচ্ছিল, আহ ! যদি একটু দেখতে পেতাম ৷

আজ শুক্রবার, ছুটির দিন ৷ আমার বড় ভাই মাসুদ আজ বাড়িতে থাকবেন ৷ সপ্তাহের এই দিনটিতে তিনি আমাদের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করে থাকেন৷

আমার বাবা, মা ,আমি ও অামার ছোট দুই ভাই ফারুক ও ওমর সবাই আজ ফজর নামাজ পরে মাসুদ ভাইয়ার সাথে কথোপকথনের জন্য জেগে আছি ৷ এমনি সময় আসলেন মাসুদ ভাইয়া ৷ ঘরে প্রবেশ করা মাত্রই সালাম দিলেন ও সবার সাথে কুশল বিনিময় করলেন ৷

এবার শুরু হলো আলোচনা ৷ আলোচনা চলছিল রাসূলুল্লাহ (صلي الله عليه) এর জীবনী নিয়ে ৷

এক পর্যায়ে ভাইয়া বললেন: মক্কার মুশরিকরা জেনে শুনে রাসূলুল্লাহ (صلي الله عليه وسلم ) এর বিরোধিতা করেছিল যদিও তারা আল্লাহকে বিশ্বাস করত ৷

— কি বলছিস তুই এসব ৷ ,মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন ৷

—হ্যাঁ মা ঠিক বলছি ৷ পবিত্র কোরআন নিজে এর সাক্ষ্য বহন করছে ৷ আল্লাহ তাআলা বলেন,

ولئن سألتهم من خلق السموت والارض وسخر الشمس والقمر ليقولن الله، فاني يؤفكون ٥

“আর যদি তাদেরকে জিজ্ঞেস কর আসমান ও যমীন কে সৃষ্টি করেছেন তবে তারা অবশ্যই বলবে আল্লাহ ৷ তবে তোমরা কোথায় ফিরে যাচ্ছ ? ” (১)

ولئن سالتهم من خلقهم ليقولن الله، فاني يؤفكون ٥

“আর যদি তাদেরকে জিজ্ঞেস কর, তাদেরকে কে সৃষ্টি করেছে তাহলে অবশ্যই বলবে আল্লাহ ৷ তবে তোমরা কোথায় ফিরে যাচ্ছ ? “(২)

ولئن سالتهم من خلق السموت والارض ليقولن خلقهن العزيز العليم ٥

“আর যদি তাদের জিজ্ঞেস কর কে আসমান ও যমীন কে সৃষ্টি করেছেন তবে তারা অবশ্যই বলবে , এগুলো তিনিই সৃষ্টি করেছেন যিনি মহা পরাক্রমশালী ও মহাজ্ঞানী ৷”(৩)

তাহলে এ আয়াতগুলোতে আমরা দেখছি তারা আল্লাহকে কেবল সৃষ্টিকর্তা হিসেবেই নয় বরং মহান পরিচালনাকারী, মহা পরাক্রমশালী ও মহাজ্ঞানী হিসেবেও বিশ্বাস করত ৷ এবার আমরা আরেকটি আয়াত লক্ষ্য করলে বুঝব যে তারা আল্লাহকে রিযিকদাতা হিসেবেও বিশ্বাস করত ৷

ولئن سالتهم من نزل من السماء ماء فاحي به الارض من بعد موتها ليقولن الله، قل الحمد لله، بل اكثرهم لا يعقلون ٥

“আর যদি তাদেররকে জিজ্ঞাস কর কে আসমান থেকে পানি বর্ষণ করেন, অতঃপর তদ্বারা মৃত জমীনকে সজীব করে তোলেন, তবে তারা অবশ্যই বলবে আল্লাহ ৷ বল, সকল প্রশংসা কেবল আল্লাহর ৷ কিন্তু অধিকাংশ মানুষই তা বোঝেনা ৷”(৪)

—তাহলে কি আমরা এতদিন ভূল জেনে আসলাম ? আব্বু জিজ্ঞেস করল

— হ্যা বাবা ! সত্যিই তাই ! আমরা এতদিন ভূলটাই জেনে এসেছি ৷ কারণ প্রচলিত কথা বিশ্বাস করলে কোরআনের আয়াত মিথ্যা হয়ে যায় ৷ (نعوذ بالله)

—তাহলে হয়তো তারা রাসূল (صلي الله عليه وسلم) কে বিশ্বাসযোগ্য মনে করত না ? ,আমি জিজ্ঞেস করলাম ৷

—না এমনটি হওয়ারও কোন সম্ভাবনা নেই ৷ কারণ রাসূলুল্লাহ (صلي الله عليه وسلم) সাফা পর্বতের উপরে উঠে তাদেরকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যেখানে ইসলামের বড় শত্রু আবু লাহাবও ছিলো ৷ তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন,

ارايتم ان اخبرتكم ان خيلا تخرج من سفح هذا الجبل اكنتم مصدقي قالو ما جربنا عليك كذبا ٥

“আমি যদি তোমাদেরকে বলি এই পর্বতের পিছনে একদল অশ্বারোহী বাহিণী তোমাদের উপর আক্রমণ পরিচালনা করার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে তবে কি তোমরা আমার কথায় আমার কথায় বিশ্বাস করবে ? তখন তারা সকলেই বলল, আপনাকে আমরা কখনও মিথ্যা বলতে দেখিনি ৷”(৫)

এছাড়া অন্য বর্ণনায় আরও আছে, نعم অর্থাৎ “আমরা অবশ্যই বিশ্বাস করব ৷”(৬)

এছাড়াও আবু সুফিয়ান (رضي الله عنه) ও রাজা হিরাক্লিয়াসের কথোপকথনের ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে ৷ আবু সুফিয়ান (رضي الله عنه) ইসলামের বড় শত্রুদের মধ্যে একজন ৷

হিরাক্লিয়াস ও তাঁর মধ্যে কথপোকথনের এক পর্যায়ে হিরাক্লিয়াস করলেন

فهل كنتم تتهمونه بالكذب ان يقول ما قال

“তাঁর দাবীর পূর্বে তোমরা কি কখনও তাকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করেছো ৷

তখন তিনি বললেন لا অর্থাৎ না ৷”(৭)

এই প্রশ্নত্তোর পর্ব বর্ণনা করার আগে তিনি বলেন

فوالله لو لا الحباء من ان يأثروا علي كذبا لكذبت عنه

“আল্লাহর শপথ ! যদি আমার এ লজ্জা না থাকত যে আমার সাথীরা আমাকে মিথ্যাবাদী বলবে তবে আমি অবশ্যই তাঁর (রাসূলুল্লাহ صلي الله عليه وسلم) এর ব্যাপারে মিথ্যা বলতাম ৷”(৭)

—তাহলে ভাইয়া তাঁরা রাসূলুল্লাহ (صلي الله عليه وسلم) এর দাওয়াত গ্রহণ করল না কেন যদি তাঁরা আল্লাহকে বিশ্বাসই করে থাকে এবং সেই সাথে রাসূল (صلي الله عليه وسلم ) কে সত্যবাদী বলে বিশ্বাস করে থাকে? আর কেনই বা তাঁদের কাফের মুশরিক বলে আখ্যায়িত করা হলো, আমার এক বছরের ছোট ভাই ফারুক জিজ্ঞেস করল ৷

—কারণ তাদের আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের ক্ষেত্রে এমন কিছুর মিশ্রণ ঘটেছিল যা মোটেও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না ৷ তাদের মাঝে ছিল মূর্তিপূজা, ভাল লোকদের পূজা, ভাগ্য গণনা ,গণক, জ্যোতিষিদের বিশ্বাস, কুসংস্কার, শুভ অশুভ লক্ষণে বিশ্বাস, তাক্বদীরকে কৌশলে অস্বীকার, দ্বীনের ব্যাপারে পূর্বসুরীদের দোহাই দেয়া, সংখ্যাগরিষ্ঠের দোহাই দেয়া, বিদআত, তাদের পন্ডিত ও পাদ্রীদের কথা যাচাই ছাড়াই পীরের মত মানা সহ ইত্যাদি আরও অনেক কিছু ৷ অথচ এই শিরকের কারণে মহান আল্লাহ পূর্বের অধিকাংশ জাতিকে ধ্বংস করেছেন ৷ (৮)

এভাবে কথপোকথন চলছিল হঠাৎ করে কে যেন ভাইকে ফোন করল ৷ কথা বলা শেষ হলে ভাইয়া বলল, মা ! আমাকে অনুমতি দাও ! আমাকে একটু বাইরে যেতে হবে ৷

বাবা বলল, কি বলছিস ! কথাটা শেষ করে যাবি না ৷

—আমি বাইরে যাচ্ছি তবে গতকাল ফিরার পথে দোকান থেকে তোমাদের সবার জন্য বই নিয়ে এসেছি যেখানে তোমরা এই বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পারবে ৷

—কোথায় সেই বই ভাইয়া ? সবচেয়ে কণিষ্ঠ ভাই ওমর জিজ্ঞেস করল

—হ্যাঁ ভাইয়া দিচ্ছি ৷

এরপর তিনি সবার হাতে একটি করে বই তুলে দিয়ে সালাম দিয়ে বেরিয়ে গেলেন ৷

বইটির নাম ছিল “لا اله الا الله এর অর্থ আগে বর্জন পরে গ্রহণ ” লিখেছেন শাইখ আমিনুল ইহসান ৷

তথ্যসূত্র : 

১৷ সূরা আনকাবূত ২৯: ৬১

২৷ সূরা যুখরূফ ৪৩:৮৭

৩৷ সূরা যুখরূফ ৪৩:৯

৪৷ সূরা আনকাবূত ২৯:৬৩

৫৷ সহীহ বুখারী, হাদীস ৪০৭১

৬৷ সহীহ বুখারী, হাদীস ৪০৭২

৭৷ সহীহ বুখারী, হাদীস ৭

৮৷ সূরা রূম ৩০:৪১-৪২, সূরা নূহ, সূরা তওবা ৯:৩৫; আর রাহীকুল মাখতূম, শফীউর রহমান মোবারকপুরী পৃষ্ঠা ৫৫-৬৬; সংক্ষিপ্ত তাফসীর-আবূ বকর যাকারিয়া এর সূরা বাক্বারা ২:২১-২২ নং আয়াতের ব্যাখ্যা দেখুন ৷

আমাদের বাড়িতে /মেরাজুল ইসলাম প্রিয়

মতামত দিন

Solve : *
27 × 4 =