নারী

নিলার অহংকার, পর্ব ১

বিষয়: আমার হিজাব আমার অহংকার

মেঘের কোলে রোঁদ হেসেছে

বাঁদল গেছে টুটি !

শহুরে চার দেয়ালের মাঝে এখনও ভেসে ওঠে সেই স্মৃতি বিজড়িত গ্রাম ৷ চারদিকে কি সবুজের সমারোহ, সারি সারি গাঁছপালা ৷ বাঁচ্চা ছেলেদের পুকুরে লাফ দিয়ে সাঁতার কাঁটা, রাখালের গরু চরানোর দৃশ্য ৷ গ্রামের বাজার ও মুদির দোকানগুলো বেশ দূরে দূরে ! এমনকি কখনও কখনও মাইলকে মাইল হাঁটতে হয় ৷ কোথাও চলে গেছে আঁকাবাঁকা পথ ৷ কোথাও রয়েছে ছোট নদী ৷ কোথাও বা একাধিক নদীর মিলনে সৃষ্ট হওয়া নদীর অববাহিকা ৷ মন যেন বার বার সেই গ্রামেই ফিরে যেতে চায় ৷

এদেরই একজন হলো নিলা ৷ ঢাবির ইংরেজী ডিপার্টমেন্টের ১ম বর্ষের ছাত্রী ৷ এর আগে সে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক উভয় পরীক্ষায় GPA-5 পেয়েছে ৷ বান্ধবীদের কাছে সে খুবই বিখ্যাত ৷ কিন্তু তুলির দৃষ্টিতে তাঁর একটিই সমস্যা ৷ কেন যে সে এত পড়াশুনা করেও নিজেকে প্যাকেট করে রাখে ৷ কোথায় তাঁর মধ্যে ফ্যাঁশনের একটি বিরাট আদর্শ বিরাজ করবে আর সেখানে কিনা সে নাক মুখ ঢেকে একেবারে ভূত সেঁজে আছে ৷

আর এভাবে নাঁক মুখ ঢেঁকে রাখলে কি হয় ৷ আজ নারীরা নিজেদের অধিকারের ব্যাপারে আন্দোলোনে ঝাঁপিয়ে পড়ছে, স্বাবলম্বী হতে শিখছে, বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করছে, এমনকি দেশও চালাচ্ছে ৷ আর পড়াশুনায় এত ভাল হয়ে, এতকিছু জেনে সে নিজেকে কিনা ! ৷়় !

নাঁ ! এ কিছুতেই সহ্য করা যায় না !

ক্যাম্পাস থেকে বের হওয়ার সময় হঠাৎ নিলার পিছু নিল তুলি ৷

— এই নিলা দাঁড়া !

পিছনে মোর ঘুরালো নিলা

—কিরে তুলি ! হঠাৎ কি মনে করে !

—তোর সাথে কিছু কথা ছিল ! সময় আছে কি !

— হ্যাঁ ! আছে ! বল কি বলবি !

—চল ! আগে ঐ গাছটির নিচে গিয়ে বসি !

—চল !

এভাবে নিলা ও তুলি দুজনে মিলে ক্যাম্পাসের সবুজ ঘাস বিছানো মাঠের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল এক গাছের নিচে গিয়ে বসল ৷ এরপর তুলি বলা শুরু করল

—আচ্ছা নিলা ! তুই তো পড়াশুনায় খুবই ভাল ! ক্লাসের টপ লেভেলের ছাত্রী তুই ! কিন্তু এত পড়াশুনা করেও, এত জেনেও তুই কেন নিজেকে এভাবে প্যাকেট করে রাখিস বলত ! অথচ নারীরা আজ কত উন্নত ! এমনকি তাঁরা আজ দেশও চালাচ্ছে ! আর তুই কিনা এখনও গ্রামেই পরে আছিস !

— হা হা হা ! খুব হাসালি !

— এখানে হাসির কি আছে !

— গ্রাম নিয়ে নাঁক সিটাকাচ্ছিস ! অথচ তাঁরা যদি মাঠে কাজ না করত, জমীতে সেঁচ না দিত, গরুর দুধ দোহন না করত তাহলে শহরের মানুষগুলো না খেয়ে মারা যেত ৷ কেউ চাল, ডাল, গম শাক সবজি, ফল ফসল এগুলো চোখেই দেখতো না !

—সে না হয় বুঝলাম ! কিন্তু তাই বলে নিজেকে প্যাকেট করে রাখা !

— দেখ ! তোঁকে বুঝতে হবে কোন কিছুকে মোরক দেয়া হয় তাঁর সংরক্ষণশীলতার জন্য ৷ যেন বাইরের বাতাসের প্রভাবে তা নষ্ট না হয় , বাইরের ধূলাবালি যেন প্রবেশ করতে না পারে এবং পণ্যটি যেন দীর্ঘসময় স্হায়ী হয় ইত্যাদি !

আর এটা খুবই বাস্তব একটি কথা যে সৃষ্টিগতভাবে পুরুষ নারী উভয়ের মাঝেই এক বিশেষ আকর্ষণ বিদ্যমান ৷ আর নারী জাতিকে বিশেষ এক কমনীয়তা দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে যা স্বভাবতই পুরুষকে আকর্ষণ করে ৷ একজন নারীর চাইতে পুরুষই নারীর প্রতি বেশি আকর্ষণ অনুভব করে ৷

এই কমনীয়তা যদি উন্মুক্ত হয়ে যায়, তবে সে হবে সব পুরুষের ভোগ্যপণ্য ৷ কেউ তাকে চিন্তার খোঁড়াক বানিয়ে ভোগ করতে চাইবে, কেউ দেখে ভোগ করতে চাইবে, কেউ চাইবে স্পর্শ করে, কেউ চাইবে তাঁর পণ্যের মডেল বানিয়ে ইনকাম করতে, কেউবা চাইবে অন্য কোনভাবে ৷ অন্যভাবে বললে সে হয়ে যাবে Public Property !

আর তাঁকে public property করতেই যত আন্দোলন, যত আয়োজন আর যত টালবাহানা !

—কিভাবে !

—আচ্ছা ! তুই কি কখনও দেখেছিস নারীবাদীদের একথা বলতে যে,

নারীরা যখন গার্মেন্টসে গালিগালাজ, প্রসবকালীন সময়, বেতন, দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করা ইত্যাদি যাবতীয় বিষয়ে নির্যাতিত হয় তখন তা নিয়ে কথা বলতে !
কখনও কি দেখেছিস জায়গায় জায়গায় যখন পতিতালয় গড়ে তোলে নারীকে অপমান করা হয় তা নিয়ে কথা বলতে !

নারীরা যখন টাকার অভাবে দেহ বিক্রি করে সংসার চালায়, পড়াশুনা করে তাঁদেরকে সহযোগিতা করতে !

যখন তাঁরা সন্তানের দ্বারা নির্যাতিত হয়, বৃদ্ধাশ্রমে পঁচে মরে তাঁদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে !

সামান্য ১০ টাকার পণ্যে যখন নারী দেহকে উন্মুক্ত করা হয় তখন তাঁর প্রতিবাদ করতে !

তাহলে তাঁরা নিজেদেরকে নারীবাদী বলতে কি বোঝায় !

কখনও দেখেছিস সমাজের কুশ্রী, বিধবা ও তালাক্বপ্রাপ্তারা যখন অধিকার বঞ্চিত তখন তাঁদের ব্যাপারে মানুষদের বোঁঝাতে !

তাঁরা কোন নারীকে হিজাব করতে দেখলে ভূত, মোরক করা, অবরোধবাসিনী ,সেঁকেলে বলে গালি দেয় ৷ অথচ এই হিজাব একটি মশারও ক্ষতি করতে পারে না ৷

বরং তা নারীকে নিরাপত্তা দেয়, তাঁকে অন্যের চোখে শ্রদ্ধাশীল করে তোলে !

তাহলে এই নারীবাদিদের উদ্দেশ্য কি !

তাঁদের উদ্দেশ্য মূলত তাঁরা চায় নারীকে সমাজের প্রজাপতি বানাতে, নিজ স্বার্থে ব্যাবহার করতে, বিজ্ঞাপনের পণ্য বানাতে, ঘরে ঘরে পতিতালয় গড়ে তুলতে যাতে তাঁদের ভোগবাদী স্বপ্ন বাস্তব রূপ লাভ করে ঠিক যেমনটি দেখা যায় ইউরোপ আমেরিকায় !

আর ইসলাম হলো সেই জীবনব্যবস্হা যা নারীকে সেই চরম অসম্মানের হাঁত থেকে বাঁচাতে চায় ৷ তাঁকে চায় ঘরের রাণী করে রাখতে যার দেখা সবাই পাবে না ৷

তাই পবিত্র কোরআন বলছে,

وقرن في بيوتكن ولا تبرجن تبرج الجهلية الاولي—

“তোমরা (যথাসম্ভব) গৃহাভ্যন্তরে অবস্হান করবে এবং পূর্বের মূর্খতার যুগের নারীদের মত নিজেদের প্রদর্শন করবে না ৷”(সূরা আহযাব ৩৩:৩৩)

তাঁদের দেখা কেবল তাঁরাই পাবে যারা তাঁর স্বামী, পুত্র, সৎ ছেলে, দাদা, নানা, শ্বশুর, ভাতিজা, নারী, ছেলে শিশু ইত্যাদি পুরুষেরা ৷ سبحان الله !

সুতরাং, হিজাব আমার অমর্যাদা নয় বরং আমরা মুসলিমরা গর্বের সাথে বলি, আমার হিজাব আমার অহংকার !

—তাহলে যারা ছোট মেয়েদের ধ্বর্ষণ করে তাঁদের ব্যাপারে কি বলবি !

—আচ্ছা ! অামি যদি বলি শিশু কোন অপরাধ না করেও খুনের শিকার হয় কেন ? কেন তাঁকে ডাঁস্টবীনে ফেলা হয় ৷ কেন এতিম খানায় তাঁর আশ্রয় হয় !

—এটা হয় পাশবিকতা বৃদ্ধির কারণে, কখনও বা হয় কাউকে ঘায়েল করতে

—ঠিক ! শিশু ধ্বর্ষণের মত এই পাশবিকতা ঘটে ঘরে ঘরে অশ্লীলতা, পর্দাহীনতা, স্টার জলসা, জী বাংলা চ্যানেলের মত নোংরা চ্যানেলের ব্যাপক প্রসার, পর্নোগ্রাফির ব্যাপক বিস্তার ইত্যাদি কারণে ৷ কখনও বা অন্যের উপর নিজ ভোগবাদী স্বার্থ উদ্ধার করতে না পেরে !

এতটুকু বলা শেষ হতেই তুলি বলল, নিলা আমার একটু কাজ আছে ! আমার একটু তাঁড়াতাড়ি যেতে হবে ! কিছু মনে করিস না হ্যাঁ !

একথা বলতে বলতে তুলি প্রস্হান করল ৷ আর নিলা কিছুক্ষণ পর এক আবেগমাখা আবেদনময় চাহুনীতে আঁকাশের দিকে তাঁকালো, অতঃপর চোখের পানি ঝঁড়িয়ে তাঁর রবকে ডেঁকে বলল,

ربنا لا تزغ قلوبنا بعد اذ هديتنا وهبلنا من لدنك رحمة- انك انت الوها٥

“হে আমাদের রব ! আমাদেরকে হেদায়াত দেওয়ার পর , আমাদের অন্তরকে সত্যলঙ্ঘনে প্রবৃত্ত করো না ৷ নিশ্চয়ই কেবল তুমিই তো মহানদাতা ! “(সূরা ইমরান ৩:৮)

আমার হিজাব আমার অহংকার/ মেরাজুল ইসলাম প্রিয়

(চলবে)

মতামত দিন

Solve : *
46 ⁄ 23 =