তাবলীগ

দা`ঈর মধ্যে যা থাকা প্রয়োজন

আলহামদুলিল্লাহ অসসলাতু অসসালামু আলা রসূলিল্লাহ।

দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া প্রতিটা মুসলিম এর জন্য অতি আবশ্যকীয় পালনীয় কর্তব্য। কিন্তু সেই দাওয়াত যিনি দিবেন অর্থাৎ দা`ঈকে অর্জন করতে হবে কিছু বিষয়; যা তার মধ্যে থাকা একান্ত প্রয়োজন।

শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়া(রহঃ) বলেছেন: “দাওয়াত বা সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করার পূর্বে চাই ইলম বা জ্ঞান। তার সঙ্গে চাই ভদ্রতা ও নম্রতা; পরে চাই অসীম ধৈর্য্য।

ক্ষতিগ্রস্তদের হতে বাঁচার যে গুণাবলীর ব্যাপারে সূরা আসরে আল্লাহ সুবহানাহু তা`য়ালা ইঙ্গিত করেছেন তার মধ্যেও একটি বিষয় হচ্ছে ধৈর্য্য। আর দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া যেহেতু নাবী ও রসূলদের দায়িত্ব ছিল তাই  বিষয়ে আমাদেরকে তাদের অনুসরণ অবশ্যই করতে হবে। আর তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ নাবী ও রসূল হলেন মুহাম্মাদ স্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া’সাল্লাম। তাই আমাদের মুহাম্মাদ স্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া’সাল্লাম। এর দাওয়াতের পদ্ধতির অবশ্যই অনুসরণ করে চলার চেষ্টা করতে হবে। আর তার সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু তা`য়ালা পবিত্র ক্বুর’আনে বলেন:

“وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٍ (হে মুহাম্মাদ!) তুমি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী”[21]

তাই একজন দা`ঈর মধ্যে উত্তম চরিত্র থাকা আবশ্যকীয়। আর দাওয়াত কেবল অমুসলিমদেরই দিতে হবে তা নয়। বরং বর্তমান যুগের দ্বীন এর প্রকৃত জ্ঞান ক্বুর’আন ও সুন্নাহ হতে যারা বঞ্চিত হয়ে আছেন; তাদের মধ্যেও দাওয়াতী টিম তৈরি করে তাদেরকে ক্বুর’আন ও সুন্নাহর পথে আহবান করতে হবে।

আর এক্ষেত্রে আল্লাহর পথের দা`ঈ বা মুবাল্লিগের দায়িত্ব এতটুকু যে; তিনি তার শ্রোতাদের জন্য প্রিয়-বস্তু নির্ধারণ করে দিবেন। তাগূতের আনুগত্য থেকে ফিরে এসে এক আল্লাহকেই তাদের একমাত্র অভিভাবক ও অলী হিসাবে গ্রহণ করার আহবান জানাবেন। যে কাজ করলে আল্লাহ খুশি হবেন; সেই সমস্ত কাজের দিকনির্দেশ তাদের সম্মুখে বয়ান করতে হবে এবং যে সমস্ত কাজ করলে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবেন সেই সমস্ত মন্দ কাজগুলো তাদেরকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর মত দেখিয়ে দতে হবে।

দাওয়াতের ক্ষেত্রে একজন দা’ঈর আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল “হিকমাত”। অর্থাৎ দা`ঈকে হিকমাতের সাথে মানুষদেরকে আহবান করতে হবে। হিকমাত কি বা হিকমাত দ্বারা কি বুঝানো উদ্দেশ্য। এ বিষয়ে মোটামুটি বিস্তারিত আলোচনা করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করছি। কারণ এ হিকমাত শব্দটা আল্লাহ সুবহানাহু তা`য়ালা খুবই গুরুত্ব-সহকারে দাওতী কাজের শর্ত হিসাবে তুলে ধরেছেন। আল্লাহ সুবহানাহু তা’য়ালা  বলেন:

ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ ۖ وَجَادِلْهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ  “তুমি আহবান কর (মানুষদেরকে) তোমার প্রতিপালকের পথের দিকে “হিকমাত” ও উত্তম উপদেশ দ্বারা”।

[22]

“হিকমাত” আরবী শব্দ। এর অর্থ গভীর জ্ঞান; দীপ্ত বুদ্ধি। বাংলা একাডেমী কর্তৃক প্রকাশিত আরবী বাংলা অভিধানে “হিকমাত” এর অর্থ করা হয়েছে তত্ত্বজ্ঞান; বিজ্ঞতা;পরিণাম দর্শিতা; বিচক্ষণতা। এছাড়া বিভিন্ন গ্রন্থে হিকমাতের নিম্ন বর্ণিত অর্থ করা হয়েছে।

১: পরিস্থিতি অনুপাতে কথা বলা হিকমাতের অন্তর্ভুক্ত।

২: হিকমাত হল জ্ঞান ও বুদ্ধির সাহায্যে প্রকৃত সত্য লাভ; সত্য লাভের যোগ্যতা ও প্রতিভা।

৩: সর্বোত্তম জিনিষসমূহ সম্পর্কে সুক্ষ গভীর জ্ঞান লাভ করাই হিকমাত।

পবিত্র ক্বুর’আনে দৃষ্টিপাত করলে তাতে হিকমাত শব্দের ব্যাপক ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। আল্লাহ সুবহানাহু তা’য়ালা ক্বুর’আনুল করীমে নিজেকে বহুবার হিকমাতের গুণে বিশেষিত করেছেন।কখনো বলেছেন

“আ`লিমুল হাকিম”(সূরাহ আনফাল ৭১; তাওবা ১৫;২৮;৩০;৯৭);

“আল-হাকীমুল খাবীর”(সূরাহ আন`আম ১৮;৭৩);

“আযীযুল হাকীম”(সূরাহ বাক্বারাহ ১২৯;২০৯; ২২০; ইমরান ৬;১৮);

“হাকীমুল হামীদ”(সূরাহ ফুসসিলাত ৪২);

“হাকীমুল আলীম”(সূরাহ আন`আম ৮৩;১২৮;১৩৯)।

একইভাবে ক্বুর’আনকেও হিকমাত বলে অভিহিত করা হয়েছে:

“অল ক্বুর’আনিল হাকীম”(ইয়াসীন ২); “আল-কিতাবিল হাকীম”(লুকমান ২; ইউনুস ১); অপরদিকে রসূলগণকে আল্লাহ

সুবহানাহু তা’য়ালা বিশেষ যে দু’টি বস্তু দান করেছেন সে সম্পর্কে বলা হয়েছে:

وَإِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ النَّبِيِّينَ لَمَا آتَيْتُكُم مِّن كِتَابٍ وَحِكْمَةٍ “আর (স্মরণ কর) আল্লাহ যখন নাবীগণের কাছ থেকে অঙ্গিকার গ্রহণ করলেন যে; আমি যা কিছু তোমাদেরকে দান করেছি (তা হল) কিতাব ও হিকমাত”। [23]

আয়াতে উল্লেখিত আল-কিতাবসহ ক্বুর’আনে যত স্থানে কিতাবের সঙ্গে হিকমাতের উল্লেখ হয়েছে সেসব স্থানেই কিতাব অর্থ আল্লাহর নিজস্ব কালাম আসমানী গ্রন্থ; যা রসূলদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে এবং যাতে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ ও উপদেশ বর্ণিত হয়েছে তা বুঝান হয়েছে। আর “আল-হিকমাত” অর্থ সেসবের নিগুঢ় তত্ত্ব সম্পর্কে বিশুদ্ধ ও সঠিক জ্ঞান এবং সে জ্ঞান অনুযায়ী সঠিক কাজ। বস্তুত এই নির্ভুল জ্ঞান ও তদানুযায়ী সঠিক আমল করার বুদ্ধি প্রত্যেক রসূলকেই দেয়া হয়েছে। নাবী রসূলদেগণের ক্ষেত্রে এটা আল্লাহর স্থায়ী ও নির্বিশেষ নিয়ম।

ইবরাহীম ও ইসমাঈল (আলাহিসাল্লাম) পবিত্র কাবা ঘর নির্মাণের পর দুয়া করেছিলেন: رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ “হে আমার প্রতিপালক!  তাদের বংশের মধ্য থেকেই একজন রসূল প্রেরণ করুন; যিনি তাদের কাছে আপনার আয়াতসমূহ

পাঠ করবেন; তাদেরকে কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দিবেন এবং তাদেরকে পবিত্র করবেন”।

[24]আল্লাহ সুবহানাহু তা’ইয়োলো তাদের দুআ কবুল করেছিলেন; তাদের বংশে সাইয়্যেদুল মুরসালীন মুহাম্মাদ স্বল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়া’সাল্লামকে প্রেরণ করে বলেছিলেন: هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ “তিনিই উম্মী  দের মধ্যে তাদের একজনকে পাঠিয়েছেন রসূলরূপে। সে তাদের নিকট পাঠ করে আল্লাহর আয়াত; তাদেরকে পবিত্র ও সংস্কৃত করেন এবং শিক্ষা দেন কিতাব ও হিকমাত”।[25].

উপরোক্ত আয়াতসমূহ ছাড়াও সূরাহ নিসার ১১৩ আয়াতেও হিকমাতের কথা উল্লেখ হয়েছে। হিকমাত শব্দের অর্থ অহীয়ে গায়ের মাতলু বা সুন্নাহ। এটি হল অধিকাংশ মুফাসসিরগণের মত।

সূরাহ নাহালের ১২৫ আয়াতে দা`ঈদের যে হিকমাত অবলম্বন করতে বলা হয়েছে তার অর্থ মুফাসসিরগণ কি করেছেন তার কয়েকটি তুলে ধরা হল:

ক) ইমাম ইবনে জারীর এর উক্তি অনুযায়ী “হিকমাত” দ্বারা  কালামুল্লাহ ও হাদীসে রসূল স্বল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়া’সাল্লামকে বুঝান হয়েছে।[26]

খ) সাহাবী ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন: ক্বুর’আন করীমই হল হিকমাত।

গ) আলোচ্য আয়াতে হিকমাত দ্বারা উদ্দেশ্য হল আল-ক্বুর’আন।

তাফসীরে জালালাইন।

ঘ) হিকমাত হল আল্লাহর সেই অহী যা তিনি নাবী স্বল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়া’সাল্লামের প্রতি করেছেন এবং তার সেই কিতাব যা তিনি নাবী স্বল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়া’সাল্লামের উপর অবতীর্ণ করেছেন। [27]

ঙ) হিকমাত হল সে অন্তর্দৃষ্টি যার দ্বারা মানুষ অবস্থার তাকীদ জেনে নিয়ে তদানুযায়ী কথা বলে এবং নম্রতার সময় নম্রতা ও কঠোরতার সময় কঠোরতা অবলম্বন করে। [28]

চ) এমন বিশুদ্ধ বাক্যকে হিকমাত বলা হয়; যা মানুষের মনে আসন করে নেয়। [29]

ছ) বুদ্ধি খাটিয়ে যাকে দাওয়াত দেওয়া হচ্ছে তার মন; মানস; যোগ্যতা ও অবস্থার প্রতি দৃষ্টি রাখা তৎসঙ্গে পরিস্থিতি বুঝে কথা বলা হচ্ছে হিকমাত। [30]

অতএব হিকমাতের আলোচনার প্রেক্ষিতে এটা প্রতীয়মান হয় যে; শারীআতের নিয়ম-পদ্ধতি পরিত্যাগ করে কারো মনগড়া পদ্ধতির অনুসরণ বা ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থপরায়ণতার কারণে; ভয়ে বা গা

বাঁচানোর নীতি অবলম্বনের মানসে সত্য-প্রচারে কুণ্ঠাবোধ বা কৌশল অবলম্বনের ধূয়া তুলে বানাওয়াট কথাবার্তা ও সহীহ তরীকাকে পরিবর্তন করে ফেলা দাওয়াতের ক্ষেত্রে (বিশেষ করে মুসলিমদের মাঝে তাবলীগ করার ব্যাপারে) কোনোক্রমেই হিকমাত বলে গণ্য ও বিবেচিত হতে পারে না। ঐরূপ করার দ্বারা একদিকে দ্বীন ইসলামের আসল-রূপই পরিবর্তন ও বিকৃত হয়ে যায়।যেটা করে থাকে কথিত তাবলীগ জামায়াত এর বিদআত পন্থীরা। তাই এ ব্যাপারে হিকমাতের নামে তাদের বিদআতী ও উদ্ভট মিথ্যা কল্প কাহিনী হতে আমাদের সজাগ দৃষ্টি রাখা একান্তই প্রয়োজন।

পরিশেষে মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি যে; তিনি যেন তার দ্বীনের দাওয়াত লোকেদের মাঝে আমাদেরকে তার ও তার প্রেরিত রসূল ও সাহাবাদের সহীহ নিয়ম অনুযায়ী পৌঁছানোর সুমতি দান করেন এবং আমাদেরকে যেন তার দ্বীনের খিদমতগার দা`ঈ হিসাবে কবুল করেন।

আমীন

তথ্যসূত্র ; 

[21] সূরাহ কালাম; আয়াত ৪

[22] সূরাহ নাহল; আয়াত ১২৫

[23] সূরাহ আল – ইমরান ৮১)

[24] সূরাহ বাক্বারাহ; আয়াত ১২৯

[25] সূরাহ জুমআ; আয়াত ২

[26] তাফসীর ইবনে কাসীর।

[27] তাফসীরে তাবারী।

[28]রুহুল বায়ান।

[29] তাফসীর রুহুল মাআনী।

[30] তাফহীমুল ক্বুরআন।

 

সূত্র : 

মতামত দিন

Solve : *
19 + 4 =