ইসলামী শিক্ষা

নসিহাত বা সদপদেশ বা কল্যাণকামনা

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

বিসয়ঃ নসিহাত বা সদপদেশ বা কল্যাণকামনা

শাইখ আলি বিন আব্দুর রাহমান আল হুযাইফি

তারিখঃ ২২-৭-১৪২৪ হিজরি

সমস্ত প্রশংসা মহিয়ান সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা, অতিব সূক্ষ্মপ্রজ্ঞাধিকারি, ও সর্ব বিষয়ের তত্ত্বজ্ঞ আল্লাহ তা’আলার জন্য। আমি আমার রব এর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি, আমি তার কাছী তওবা করছি ও ক্ষমা কামনা করছি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন প্রকৃত মা’বুদ নেই,তিনি একক ও তার কোন শরীক নেই ।আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি, আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তা’আলার বান্দা ও রাসুল, তিনি সুসংবাদদাতা, সতর্ককারি ও আলোকোজ্জ্বল আলোকবর্তিটা।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! আল্লাহকে ভয় কর ও তার শাস্তি হতে আশংকা কর, কেননা যারা আল্লাহকে ভয় করে তারাই প্রকৃত সফলকাম।

হে মুসলমানগণ! সব চেয়ে উত্তম যে কথা বলার মাধ্যমে অন্তরাত্মাকে উপদেশ দেয়া যায় এবং পরিমার্জিত করা যায় যা হচ্ছে আল্লাহর কিতাবের আয়াতসমুহ ও রাসুল সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিস। আল্লাহ তা’আলা বলেন,”তিনি সেই সত্তা যিনি উম্মিদের মাঝে তাদের থেকে রাসুল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের কাছে তার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করেন, তাদের পবিত্র করেন, এবং শিক্ষা দেন তাদেরকে কিতাব ও হিকমত।ইতিপূর্বে তারা তো সুস্পষ্ট বিভ্রান্তিতে ছিল।(সুরা আল-জুম’আহ-২)

সুতরাং মন খুলে নিজেদের চিন্তা-চেতনা ও বিবেক লাগিয়ে ও কান দিয়ে মানবতার মহান নেতা নবী মুহাম্মাদ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কিছু কথা শুন ও লক্ষ্য কর যেটা তিনি গোটা ইসলামি জীবন বাবস্থা ও দুনিয়া ও আখিরাতের সকল কল্যাণ সন্নিবেশিত করেছেন। যাতে সকল প্রকার কল্যাণ বর্ণনা করা হয়েছে।সকল অনিষ্ট ও ক্ষতি থেকে সতর্ক করা হয়েছে। কেননা আমাদের নবী সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে ব্যাপক অর্থবোধক বাক যোগ্যতা দেয়া হয়েছে। যাতে সংক্ষেপে তিনি অনেক ও ব্যাপক অর্থবোধক দিক নির্দেশনা দিতে পারেন। কখনো কখনো এককথায় ইসলামের সকল শিক্ষা তুলে ধরেছেন যেমন তার বানী-“ইনসান হচ্ছে এভাবে আল্লাহর ইবাদত করা যেন তুমি তাকে দেখছ”-মুসলিম, উমার রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত। অনুরূপভাবে তার বানী, “পুণ্য হচ্ছে যাতে আত্মা ও অন্তর প্রশান্তি লাভ করে আর পাপ হচ্ছে যা অন্তর আত্মায় খটকা ও সংশয় সৃষ্টি করে, আর মানুষ তা জানতে তুমি অপছন্দ কর যদিও মানুষদের কেউ বৈধতার ফতোয়া দিয়ে থাকে”-আহমাদ, মুসলিম এর কিছু অংশ।

রাসুল সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ব্যাপক অর্থবোধক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বানী হচ্ছে, -“দ্বীন হচ্ছে নসিহত। আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রাসুল, নসিহত কার জন্য? তিনি বললেন,আল্লাহ, তাঁর কিতাব, তাঁর রাসুল , মুসলিম শাসক এবং মুসলিম সর্বসাধারণের জন্য।–তামিম দারি থেকে ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

রাসুল সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই কথার মধ্যে সংক্ষিপ্ততা রয়েছে। এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে গোটা ইসলামি জীবন ব্যাবস্থা মাঝে সীমাবদ্ধ ও আরষ্ঠ। সুতরাং, যে বেক্তি নসিহাতের গুণে গুণান্বিত হল সে তার গোটা দ্বীন সংরক্ষন করতে সক্ষম হল। পক্ষান্তরে যে নসিহাত থেকে বঞ্চিত হল সে যতটুকু নসিহাত থেকে বঞ্চিত হল সে ততটুকু দ্বীন থেকে বঞ্চিত হল।

নসিহাতের ব্যাখ্যা হচ্ছে নসিহাতকারি যার জন্য নসিহাত তার প্রতি সত্যিকার ভালোবাসা ও আন্তরিকতা নিয়ে তার সকল অধিকার ও হক আদায় করে, চাই তা কথা, কাজ এবং অন্তরের সংকল্পের মাধ্যমেই হক না কেন । আসমাঈ বলেন, নাসেহ বা নসিহাতকারি হচ্ছে সে বস্তুর মত যা সম্পূর্ণ খেয়ানত ও প্রতারনামুক্ত।আর প্রত্যেক ভেজাল ও ত্রুটিমুক্ত বস্তুই মূলত আরবি ভাষায় নিরঙ্কুশ বা খাঁটি বস্তু হিসেবে বিবেচিত এসব খাঁটি বস্তুর ক্ষেত্রে আরবরা নসিহাত শব্দ ব্যবহার করে থাকে।

খাত্তাবি বলেন,”নসিহাত শব্দটির মূল ধাতু হচ্ছে নির্ভেজাল বা খাঁটি হউয়া , ত্রুতিমুক্ত হউয়া। এ কারণে নসিহাত শব্দ ব্যবহার করে বলা হয়ে থাকে মোম থেকে মধু উৎসারিত করা হয়েছে।“

নসিহাত হচ্ছে নবী, রাসুল ও সৎকর্মশীল মুমিনদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।আল্লাহ তা’আলা নুহ আলাইহি সালাতুস সালাম সম্পর্কে বলেন, আমি আমার প্রতিপালকের রিসালাত তোমাদের নিকট পৌঁছে দিচ্ছি, তোমাদের জন্য কল্যাণ কামনা করছি আর আল্লাহর পক্ষ থেকে আমি তা জানি যা তোমারা জানো না।( সুরা আরা’ফ-৬২)

আল্লাহ তা’আলা হুদ আলাইহি সালাতুস সাল্লামের ভাষায় এভাবে বলেন,”আমি আমার প্রতিপালকের রিসালাত তোমাদের নিকট পৌঁছে দিচ্ছি, আর আমি তোমাদের জন্য এক বিশ্বস্ত কল্যাণকামী।“(সুরা আরাফ-৬৮)।

সালেহ (আঃ) এর ভাষায় এভাবে বলেন,”নিশ্চয়ই আমি আমার প্রতিপালকের রিসালাত তোমাদের নিকট পৌঁছে দিয়েছি এবং তোমাদের জন্য কল্যাণ কামনা করছি কিন্তু তোমারা কল্যাণকামীদের ভালবাসনা।(সুরা আ’রাফ-৭৯)। শোয়াইব (আঃ) এর ভাষায় বলেন,”হে আমার সম্প্রদায় আমি তোমাদের নিকট আমাদের প্রতিপালকের রিসালাত পৌঁছে দিয়েছি এবং তোমাদের জন্য কল্যাণ কামনা করছি সুতরাং কিভাবে আমি কাফের সম্প্রদায়ের জন্য আফসোস করতে পারি। (সুরা আ’রাফ-৯৩)

জারির ইবনে আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন , আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট বাইআত করেছি সালাত প্রতিষ্ঠা, যাকাত আদায় ও প্রত্যেক মুসলিমের জন্য নসিহাত বা কল্যাণকামিতার উপর।“ (বুখারি, মুসলিম)

আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,”একজন মুসলিম অপর মুসলিমের উপর ৬টি হক বা অধিকার রয়েছে। যখন দেখা হয় তাকে সালাম দাও, যখন তাকে দাওয়াত দেয়া হয় তখন তাতে উপস্থিত হউ, যখন তোমার থেকে সদপদেশ কামনা করে তাকে তার জন্য কল্যাণ কামনা কর, যখন হাঁচি দেয় তখন আলহামদুলিল্লাহ বলে তার জবাব দাও, যখন অসুস্থ হয় তখন তাকে দেখতে যাও আর যখন মারা যায় তখন তার জানাযায় উপস্থিত হউ।“(মুসলিম এর বর্ণনা থেকে)।

জুবাই ইবনে মুতইম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,”তিনটি বৈশিষ্ট্য এমন মুমিন ব্যাক্তির অন্তরে যার জন্য কোন বিদ্বেষ থাকে না-আল্লাহের উদ্দেশে আমলকে খালেস বা নিরঙ্কুশভাবে আদায় করা, শাসকদের সদপদেশ দেয়া এবং মুসলমানদের জামাতের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে থাকা।“(আহমাদ, ইবনে হিব্বান)।এই হাদিসের অর্থ হচ্ছে এ তিনটি বৈশিষ্ট্য মুমিনের অন্তরকে খেয়ানত শঠতা, ধোঁকা ও নিকৃষ্ট কর্ম থেকে মুমিনের অন্তরকে পবিত্র, পরিমার্জিত ও সংশোধিত করে।

এ কারণেই মুসলিম উম্মাহের সৎকর্মশীল লোকেরা সবাই এ নসিহাত বা কল্যাণকামিতার বৈশিষ্ট্যতে গুণান্বিত।

আবু বকর আল আল মুযানি (রঃ) বলেন, “আবু বকর রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু আল্লাহের রাসুল সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবীদের মাঝে বেশি নামায ও রোযার মাধ্যমে মর্যাদা লাভ করেননি বরং তিনি সবার উপরে সম্মান লাভ করেছেন একটি বস্তুর মাধ্যমে যা তার অন্তরে ছিল। তিনি বলেন তার অন্তরে যা ছিল তা হচ্ছে মহিয়ান আল্লাহর জন্য অগাধ ভালোবাসা এবং তার সৃষ্টির জন্য কল্যাণকামিতা।“

ফুদাইল ইবনে ইয়াদ (রঃ) বলেন, ”আমাদের মাঝে যারা আছে তারা যে মর্যাদা লাভ করেছে অতিরিক্ত নামায ও রোযার মাধ্যমে তা লাভ করেনি বরং তারা আমাদের মাঝে এ মর্যাদা লাভ করেছে আত্মার উদারতা, অন্তরের পরিচ্ছন্নতা এবং মুসলিম উম্মাহের কল্যাণকামিতার মাধ্যমে।“

ইবনে মুবারক কে জিজ্ঞাসা করা হল, কোন কাজ আপনাদের নিকট সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন, তিনি বললেন, ”আল্লাহর উদ্দেশে কল্যাণ কামনা করা।“ মুআম্মার (রঃ) বলেন,” বলা হয়ে থাকে যে ব্যাক্তি তোমরা ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে সে তোমার জন্য সবচেয়ে বেশি কল্যাণকামী।“ সালাফে সালেহিনদের জৈনক ব্যক্তি বলেন,” যে ব্যক্তি তার অপর ভাইকে তার মাঝে এবং নিজের মাঝে উপদেশ দিল সে তার জন্য কল্যাণ কামনা করল পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি মানুষের সামনে তাকে উপদেশ দিল সে মূলত তাকে অপমানিত করল।“

হাদিসে বর্ণিত আল্লাহর জন্য নসিহাতের অর্থ হচ্ছে, আল্লাহর জন্য পরিপূর্ণ ভালোবাসা ও বিনয়াবনতির মাধ্যমে রাসুল সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রদর্শিত হেদায়েতের অনুসরণে একনিষ্ঠতার সাথে লা শরীক আল্লাহ তা’আলার এককভাবে ইবাদত পালন করা, আল্লাহর সাথে দু’আ, জবেহ, মান্নত, সাহায্যকামনা, আশ্রয়কামনা, মুক্তি কামনা, ভরসা অর্থাৎ সকল প্রকার ইবাদতের ক্ষেত্রে কোন কিছুকে শরীক বা অংশীদার সাব্যস্ত না করা। আল্লাহ তা’আলা বলেন,” আল্লাহর ইবাদত কর ও তার সাথে কিছু শরীর সাব্যস্ত কর না।(সুরা নিসা-৩৬)। তিনি আরও বলেন,” নিশ্চয়ই মসজিদসমূহ আল্লাহর জন্য, আল্লাহর সাথে কাউকে আহ্বান কর না।।(সুরা আল জিন-১৮)।

আল্লাহর জন্য নসিহাতের মধ্যে রয়েছে আল্লাহর সকল প্রকার সিফাত বা গুণাবলি যা তিনি নিজের জন্য সাব্যস্ত করেছেন এবং তার রাসুল সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা বর্ণনা করেছেন তার প্রতি ঈমান আনা এবং তা কোন প্রকার উদাহরণ ও উপমা ছাড়াই সাব্যস্ত করা আর মহিয়ান আল্লাহকে যা তার সত্তার সাথে উপযুক্ত নয় এমন সব গুণাবলি থেকে পবিত্র ঘোষণা করা তবে তার প্রকৃত গুণাবলিকে বাতিল বা পণ্ড করা ব্যতিরেকে। আর এ বিশ্বাস করা যে, দুনিয়া ও আখিরাতের সকল কিছু সৃষ্টি, পরিচালনা, নিয়ন্ত্রন ও পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তিনি একক ও অদ্বিতীয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “জেনে রাখো সৃষ্টি এবং বিধান তাঁর।“ (সুরা আ’রাফ-৫৪)।

সকল প্রকার ফরয ও নফল ইবাদতের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য লাভ করার চেষ্টা, তাঁর পক্ষ হতে নিষিদ্ধ ও হারাম সকল কাজ হতে বিরত থাকা। হাসান বাসরি (রঃ) এক মুরসাল বর্ণনায় রাসুল সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বলেন,” তোমরা কি মনে কর যদি তোমাদের কার দু’জন গোলাম থাকে, একজন তার নির্দেশের আনুগত্য করে , তার কছে আমানত রাখলে তা আদায় করে দেয়, এবং মুনিবের অনুপস্থিতিতে তার জন্য ধোঁকা ও প্রতারণা করে, তারা দু’জন কি সমান হতে পারে? তারা বললেন, না হতে পারে না। এভাবেও তোমরা আল্লাহর কাছে। ইবনে আবিদ দুনইয়া বর্ণনা করেছেন।

আবু উমামাহ বাহেলি (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,” আল্লাহ তা’আলা বলেন, আমার বান্দাহ যা কিছুর মাধ্যমে আমার গোলামী করে তার মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় কাজ হচ্ছে আমার জন্য নসিহাত বা কল্যাণ কামনা করা। (মুসনাদে আহমাদ)

আল্লাহর জন্য নসিহাতের মধ্যে রয়েছে যে সব কথা কাজ আল্লাহ ভালোবাসেন তা ভালোবাসা ও যা ঘৃণা করেন তা ঘৃণা করা। জৈনক আলেম বলেন,” নসিহাতের মদ্দা কথা হচ্ছে যার জন্য নসিহাত করা হয় সে যে কেউ হোকনা কেন তার জন্য অন্তরের টান ও অনুরাগ প্রকাশ করা। আর এটা দু ধরনের , একটি হচ্ছে ফরয ও অপরটি নফল বা অতিরিক্ত। আল্লাহর জন্য ফরয নসিহাত হচ্ছে ফরয আদায় করা এবং হারাম পরিহারের ক্ষেত্রে আল্লাহর ভালবাসার প্রতি কঠোর অনুরাগ আর এ ব্যাপারে নফল নসিহাত হচ্ছে আল্লাহর ভালবাসাকে স্বীয় আত্মার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া।

আল্লাহর কিতাবের জন্য নসিহাত এ কথার অর্থ হচ্ছে, আল্লাহর কিতাবকে অত্যন্ত ভালোবাসা, মর্যাদা দেয়া, তা বুঝা ও উপলদ্ধি করার প্রতি গুরুত্ব প্রদান, যথা সম্ভব তা হেফয করার জন্য অবিরত প্রয়াস, নিয়মিত তা তিলাওয়াত করা, তার আদব ও চরিত্র গ্রহণ করা, তা অনুযায়ী বিচার ফয়সালা করা ও এ কিতাব শিক্ষা করা, শিক্ষাদানের জন্য আহ্বান করা এবং প্রচেষ্টা চালান।

আল্লাহর রাসুল সাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জন্য নসিহাতের অর্থ হচ্ছে, তা নির্দেশের আনুগত্য করা, তার নিষেদ থেকে বিরত থাকা, তিনি যা সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন তা মেনে নেয়া ও বিশ্বাস করা, তার শারিয়াত অনুযায়ী ইবাদত পালন করা, তা সুন্নাতের সাহায্য করা, তার হেদায়েত শিক্ষা করা ও শিক্ষাদানের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালান। যে তা সুন্নাতকে অপছন্দ করে তাকে ঘৃণা করা। প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে তার অনুসরন করা, নিজের জীবন, পরিবার পরিজন, সন্তানসন্ততি, পিতামাতা ও সম্পদের চেয়ে তাকে অধিক ভালোবাসা এবং তার সুন্নাতের পক্ষ হতে প্রতিরোধ ও প্রতিউত্তর দেয়া।

মুসলিম শাসকদের জন্য নসিহাত বা কল্যাণকামিতার অর্থ হচ্ছে, তাদের জন্য সংশোধন ও পরিশুদ্ধির দু’আ করা, তাদের ইনসাফ ও হেদায়েত লাভের আন্তরিক কামনা, তাদের জন্য মুসলিম উম্মাহের দাবি ও ঘোষণার সম্মিলন কামনা, তাদের সৎকর্ম প্রসারে খুশি হউয়া, তাদের অপকর্ম ও নিন্দা করাকে ঘৃণা করা, আল্লাহর আনুগত্যের ক্ষেত্রে তাদের আনুগত্য করা, কথায় ও কাজে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করা, তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করাকে বৈধ মনে করে যারা তাদেরকে ঘৃণা করা, মুসলিম উম্মাহের দ্বীন ও দুনিয়ার সকল ক্ষেত্রে যা তাদের জন্য কল্যাণকর সেসব ক্ষেত্রে তাদেরকে সুন্দর ভাষায়, কোমলতার সাথে, বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে শুধুমাত্র আল্লাহর উদ্দেশে সুপরামর্শ দেয়া, তাদের জন্য বদ দু’আ না করা, এবং তারা যা করার দায়িত্ব দেয় তা পালন করার চেষ্টা করা।

সর্বসাধারণ মুসলমানদের জন্য নসিহাত এর অর্থ হচ্ছে, যে কেউ নিজের জন্য যা পছন্দ করে তা পছন্দ করা, নিজের জন্য যা অপছন্দ করে তা অপছন্দ করা, তাদের ছোটদের ভালোবাসা আর বড়দের সম্মান করা, হকে বা সত্য এর ব্যাপারে তাদের সহযোগিতা করা, তাদেরকে সৎ কাজের আদেশ দেয়া ও অসৎ কাজ হতে নিষেদ প্রদান করা, তাদের থেকে দুঃখ, কষ্ট ও সকল প্রকার আশংকা দূর করার চেষ্টা করা, আর মুসলিম উম্মাহর জন্য সবচেয়ে মারাত্মক ও ভয়াবহ যে আশংকা বর্তমানে দেখা দিয়েছে তা হচ্ছে সন্ত্রাসী তৎপরতা ও ধ্বংসযজ্ঞ কর্মকাণ্ড যাতে জীবন ও সম্পদ এমনকি সবকিছুকে হালাল করে দিচ্ছে, নিরপরাধ ও নিরাপদ লোকদেরকে সন্ত্রস্থ করে তুলছে, সমাজের নিরাপত্তা ও স্থিতি হচ্ছে এ টার্গেট, এটা মূলত শাসকদের কাফের মনে করা এবং তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করাকে বৈধ করনের সুত্র ও চিন্তা চেতনা হতে নির্গত যা আল্লাহর রাসুল সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কঠোরভাবে তিরস্কার করেছেন।

মুসলিম জনসাধারণের জন্য নসিহাতের মধ্যে আরও রয়েছে, এ ধরণের কাফের মনে করার ধ্যান ধারণাকে মূলোৎপাটিত করে দেয়া, মুসলমানদেরকে এ সব চিন্তা চেতনা হতে সতর্ক করা, এবং যারা এর সাথে লিপ্ত তাদেরকে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে তুলে দেয়া যাতে করে তাদের উপযুক্ত শাস্তি হতে পারে এবং মুসলমানদের জীবন ও সম্পদ তাদের অনিষ্ট হতে রক্ষা লাভ করতে পারে, কোন অবস্থাতেই এদেরকে গোপন করা বা লুকিয়ে রাখা বৈধ নয়। আর মুসলমানদের জন্য কল্যাণকামীতা হচ্ছে তাদের দ্বীন ও দুনিয়ার ক্ষেত্রে সকল ক্ষতি হতে তাদেরকে রক্ষা করা। অথচ খারেজীরা বা বিদ্রোহীরা তাদের দ্বীন ও দুনিয়া সব বিপর্যস্ত করে দেয়। আল্লাহ বলেন, “ হে ঈমানদারগণ !আল্লাহ এবং তার রাসুলের আহ্বানে সাড়া দাও, যখন রাসুল তোমাদেরকে তোমাদের জীবন সঞ্চারক বস্তুর দিকে আহ্বান করে আর জেনে রাখো যে আল্লাহ মানুষ ও তার অন্তরের মধ্যস্থলে অন্তরায় হয়ে থাকে এবং নিশ্চয়ই তাঁর কাছেই তোমাদেরকে সমাবেত করা হবে। (সুরা আল-আলফাল-২৪)

হে মুসলমানগণ! সে দিনকে ভয় কর, যেদিন তোমরা আল্লাহর নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে। এবং প্রত্যেকে তার কৃত কর্মের প্রতিফল লাভ করবে এবং তারা অত্যাচারিত হবে না। মুআয (রাঃ) এর প্রতি রাসুল সাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সে অসিয়াত আঁকড়ে ধর যাতে তিনি বলেছেন, “ যেখানেই থাক না কেন আল্লাহকে ভয় কর, পাপের সাথে সাথে পুণ্য কর, পুণ্য তা মুছে দেবে। মানুষের প্রতি উত্তম চরিত্রের সাথে ব্যবহার কর।“ সকল পুণ্য এর জন্য সওয়াব রয়েছে যেমনিভাবে সকল পাপের জন্য শাস্তি রয়েছে। আর তোমাদের প্রভু তোমাদের আমলসমূহ সংগ্রহ করেছেন যাতে করে তার প্রতিদান দিতে পারেন। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তা’আলা বলেন,” হে আমার বান্দাহ! এ সব কিছু হচ্ছে তোমার আমল যা আমি তোমার জন্যই সংরক্ষণ করেছি অতঃপর তোমাকে তার প্রতিফল দিব। সুতরাং যে ব্যক্তি তার জন্য কল্যাণ লাভ করে সে যেন নিজেকে তিরস্কার করে সকল মানুষই তা আমলনামা লাভ করবে, কেউ গ্রহণ করবে ডান হাতে কেউ গ্রহণ করবে বাম হাতে।“ আল্লাহ তা’আলা বলেন,” প্রত্যেক মানুষের কৃতকর্ম আমি আমি তার গর্দানের সাথে বাধ্যতামূলক করে দিয়েছি এবং কিয়ামতের দিন আমি তার জন্য এমন এক কিতাব বের করবো যা সে উন্মুক্তভাবে পাবে।“ (সুরা আল ইসরা-১৩)

www.alharamainonline.org

মতামত দিন

Solve : *
14 × 25 =