নারী পরিবার ও দাম্পত্য

ভাঙা সংসার বাড়ছে

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম ইরশাদ করেন-

«بُعِثْتُ لأُتَمِّمَ مَكَارِمَ الأَخْلاقِ»

‘আমি উত্তম চরিত্র শিক্ষা দেয়ার জন্য (শিক্ষক হিসেবে) প্রেরিত হয়েছি।’ [বাইহাকী : ২০৭৮২; শারহুস সুন্নাহ : ৩৬২২]

আলোচ্য হাদীসে একজন শিক্ষকের কাজ ও আদর্শ কী তা উল্লেখ করা হয়েছে। মানবজাতিকে আদর্শ, নীতি-নৈতিকতা আর উত্তম চরিত্র শিক্ষা দেয়াই একজন শিক্ষকের প্রধান দায়িত্ব এবং এতেই রয়েছে গৌরবময় কীর্তি। একারণে শিক্ষকতার পেশাকে পৃথিবীর সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ পেশা বলে মনে করা হয়।

কিন্তু শিক্ষার সঙ্গে যদি আসমানী ইলমের যোগসূত্র স্থাপিত না হয় এবং নৈতিকতার মতো মহৎ গুণ দ্বারা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সমৃদ্ধ না হন, তাহলে কামনার লেলিহান শিখা সেই গৌরবময় পেশাকে কী পরিমাণ কলঙ্কিত করতে পারে, তার বহু খারাপ দৃষ্টান্ত রচিত হয়েছে অতীতে এবং বর্তমানেও। এধরনের একটি প্রমাণ নিন :

চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিনোদপুর কলেজের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক আব্দুল লতিফ। এতদিন রসায়ন বিজ্ঞানের পণ্ডিতব্যক্তি জেনেই মানুষ তাকে সশ্রদ্ধ সালাম জানিয়ে তার সামনে নিজেদেরকে কাচুমাচু করে উপস্থাপন করেছে। জ্ঞানসাগর ব্যক্তিটিকে তারা মাথার তাজ বানিয়ে রেখেছে। কিন্তু মানুষকে আর কতদিন অন্ধকারে রাখা যায়!  হয়ত শিক্ষক আবদুল লতিফ চাইলেন তার আসল চেহারাটা উন্মোচন করতে। চাইলেন তিনি যে শুধু রসায়নেই পণ্ডিত তাই নয়, তার পাণ্ডিত্যের ক্ষেত্র অনেক বেশি বিস্তৃত- একথার প্রমাণ দিতে। ‘শিক্ষক’কে বিশ্বাস করে অভিভাবকরা তার হাতে যে আমানত তুলে দিয়েছিলেন, সেই আমানতের সঙ্গে খেয়ানত করে, নারীসম্ভ্রমকে ভূলুণ্ঠিত করে নিজ ছাত্রীর সঙ্গে অন্যায়কর্মে লিপ্ত হয়ে সেটির হাইলাইটস প্রচার করলেন তিনি কামুকবিশ্বের সামনে। নীতি, নৈতিকতা, জ্ঞান, চরিত্র আর আদর্শ প্রচারের বদলায় প্রচার করলেন লাম্পট্য আর ইজ্জত হননের ঘৃণিত দৃশ্য!

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী ঘোনাটোলা গ্রাম। নির্জনতা আর প্রাকৃতিক পরিবেশের এক নয়নাভিরাম দৃশ্য গ্রামটিকে দিয়েছে কাব্যময় সৌন্দর্য। আল্লাহপ্রদত্ত এই প্রকৃতির কোলকে আশ্রয় বানিয়ে কলেজ শিক্ষক আব্দুল লতিফ গড়ে তুলেছেন নয়নজুড়ানো বিল্ডিং বাড়ি। বাড়ির ছাদে স্থাপন করেছেন অত্যাধুনিক ক্যামেরা, টেকনোলজি। যুক্ত করেছেন দু’টি ডিশ অ্যান্টিনা।

বাইরের নির্জনতার সুযোগে আব্দুল লতিফ ভেতরের পরিবেশটাকে করে রেখেছিলেন পশুত্বের কোলাহলে মুখরিত। কিন্তু এ সম্পর্কে মানুষ ছিল সম্পূর্ণ অন্ধকারে। তিনি অতি অল্প সময়ে গড়ে তোলেন পাপের নেটওয়ার্ক। এই নেটওয়ার্ক উলঙ্গপনার, পশুত্বের, নির্জলজ্জতার সর্বোপরি মানুষের সম্ভ্রমের সঙ্গে গাদ্দারী ও প্রতারণা করার নেটওয়ার্ক।

কয়েক বছরের ব্যবধানে আবদুল লতিফ স্থানীয় কয়েকজন লোককে ব্যবহার করে অন্তত ২টি পর্নো সিডি তৈরি করেন। পর্নো ছবিগুলো তৈরি করতে তিনি ব্যবহার করেন একেবারেই ঘনিষ্ঠ ও কাছের নারীদেরকে। কৌশলে যেসব সরল নারীকে ঘটনার শিকারে পরিণত করেছেন, তারা হয়ত ঘটনার সময় শুধু ইজ্জত বিকাচ্ছেন ভেবে কিছুটা স্বস্তিতে থেকেছেন। কিন্তু অলক্ষ্যে যে ইজ্জতহননের বিজ্ঞাপনও প্রচার হচ্ছে, সে ব্যাপারে কি তাদের ধারণা হয়েছিল কখনও?

আব্দুল লতিফ এ ক্ষেত্রে একটা পশুর মধ্যে যে নৈতিকতাবোধ আছে, তাও ছাড়িয়ে যান। পশু-পাঠার সম্ভ্রমবোধটুকুও মনে হয় তার মধ্যে কাজ করে নি। তা না হলে তিনি আপনজনকে ব্যবহার করে কি করে সেই সিডি বাজারজাত করতে পারেন!

যে কোনও নারীরই ইজ্জত লুণ্ঠন করা মারাত্মক অপরাধ। অবস্থার তারতম্যে অপরাধের ভয়াবহতার পরিমাণ বেড়ে যায়। একারণে প্রতিবেশি নারীর ইজ্জতহানীকে এ সম্পর্কিত সবচেয়ে ভয়ানক অপরাধ সাব্যস্ত করা হয়েছে। হাদীসে ইরশাদ হয়েছে-

سُئِلَ – رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَيُّ الذَّنْبِ عِنْدَ اللَّهِ أَكْبَرُ، قَالَ: «أَنْ تَجْعَلَ لِلَّهِ نِدًّا وَهُوَ خَلَقَكَ» قُلْتُ: ثُمَّ أَيٌّ؟ قَالَ: «ثُمَّ أَنْ تَقْتُلَ وَلَدَكَ خَشْيَةَ أَنْ يَطْعَمَ مَعَكَ» قُلْتُ: ثُمَّ أَيٌّ؟ قَالَ: «أَنْ تُزَانِيَ بِحَلِيلَةِ جَارِكَ»

‘রাসূলুল্লাহ আলাইহিস সালামকে জিজ্ঞেস করা হলো, কোন গুনাহ সবচেয়ে বড়? তিনি উত্তরে বললেন, আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক করা। প্রশ্ন করা হলো; তারপর কোন গুনাহ? তিনি জবাবে বললেন, নিজ সন্তানকে এই ভয়ে হত্যা করা যে, সে তোমার জীবিকায় ভাগ বসাবে। এরপর কোন গুনাহ? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, প্রতিবেশি নারীর সম্ভ্রম নষ্ট করা। [বুখারী : ৪৪৭৭;  মুসলিম : ৮৬]

একজন প্রতিবেশী নারী আমানত। তাকে বিপদে সহায়তা করা এবং তার সম্ভ্রমের নিশ্চয়তা রক্ষা করা একজন প্রতিবেশীর প্রধান ফরয দায়িত্ব। কিন্তু যাদের মধ্যে একটা জন্তুর সম্ভ্রমটুকুও কাজ করে না, সেই আবদুল লতিফদের কাছে হাদীসের বাণী পৌঁছলে তো! তাই তিনি অশ্লীল ভিডিও তৈরি করার কাজে অবলীলায় ব্যবহার করেছেন প্রতিবেশি ও ঘনিষ্ঠ নারীদেরকে। ধিক্ এই নোংরা মানসিকতার প্রতি। অভিশাপ সকল নারীর পক্ষ থেকে।

আব্দুল লতিফ এখানেই থেমে থাকার পাত্র নন। ঘনিষ্ঠদের ব্যবহার করার পর তার নজর পড়ে বিনোদপুরের এক সুন্দরী ছাত্রীর ওপর। শিক্ষকতার মহান পেশার মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত করে, ভুলিয়ে-ভালিয়ে এই ছাত্রীকে ব্যবহার করে তিনি আরও কিছু ভিডিও তৈরি করেন। আব্দুল লতিফের কাছে সম্ভ্রমহারা রিক্তপাত্র ওই ছাত্রীর বিয়ে হয়ে গেলে নতুন শিকারের পিছু ধাওয়া করেন তিনি। কামনার বারুদে আরও আগুন চাই তার। এই বারুদও হাতের নাগালে পেতে সময় লাগল না তার। ওই ছাত্রীর পর ছোবল দেন তিনি আরেক তরুণীর ওপর। এই ছোবলের বিষ শঙ্খচূড়া সাপের চেয়েও বেশি বিষাক্ত।

এই তরুণীকে ব্যবহার করে রিক্তপাত্র বানিয়ে ছেড়ে দেন আব্দুল লতিফ। এবারের নজর কলেজেরই আরেক ছাত্রীর ওপর। সম্ভ্রমহারা ওই ছাত্রী জানান, রসায়নে ভালো ফলাফল পাওয়ার আশায় আব্দুল লতিফের বাড়িতে গিয়ে প্রাইভেট পড়তেন তিনি। শিক্ষককে বিশ্বাস করতেন তিনি পুরো মাত্রায়। একজন শিক্ষককে বিশ্বাস করাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই বিশ্বাসকে ভুল প্রমাণিত করলেন তিনি। বিশ্বাসের মর্যাদাকে করলেন ভূলুণ্ঠিত। কামনার উত্তাল জোয়ারে ভেসে গেছে তার সকল মূল্যবোধ। তাই সব সময় অনৈতিক প্রস্তাব দিতেন তিনি ওই ছাত্রীকে।

ওই ছাত্রী আরেকজনকে সঙ্গে নিয়ে প্রাইভেট পড়তেন আব্দুল লতিফের কাছে। একদিন তার সঙ্গী ছাত্রীটি পড়তে না আসায় সুযোগের একশ ভাগ সদ্ব্যবহার করেন আব্দুল লতিফ।

ঘটনাটি ২০০৭ ইং সালের ২২ই মার্চের। ওই দিন সকাল আটটার সময় প্রাইভেট পড়তে গিয়ে জীবনের সবচে’ মূল্যবান সম্পদটুকু হারিয়ে আসেন ওই ছাত্রী। পানি পান করতে চাইলে আব্দুল লতিফ ঘুমের ঔষধ মেশানো পানি দেন তাকে। ওই পানি পান করে তিনি জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েন। সেই সুযোগে আব্দুল লতিফ জেগে ওঠেন আপন পাশবিক সত্তায়। মৃতপ্রায় অচেতন ছাত্রীকে বিবস্ত্র করে তার সম্ভ্রমহানি করেন আব্দুল লতিফ। শুধু তাই নয়, অত্যাধুনিক ডিজিটাল ক্যামেরার সাহায্যে সেই ঘৃণ্য চিত্র রেকর্ড করে রাখেন তিনি।

জ্ঞান ফেরার পর ওই ছাত্রী নিজের দেহে আবিষ্কার করেন বন্যজন্তুর দাঁতালো কামড়। সম্ভ্রমহারা দেহটা তার একটা খোসামাত্র। তিনি ভয়ার্তকণ্ঠে চিৎকার দিতে চান। কিন্তু পাকা খেলোয়াড় আব্দুল লতিফ তাকে বুঝিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। আব্দুল লতিফ ওই ছাত্রীর ভিডিও ক্লিপ (একটা ৩৪ মিনিটের, অন্যগুলো ৯ থেকে ৪ মিনিটের মধ্যে) ইন্টারনেট ও মোবাইল সার্ভিসিংয়ের দোকানসহ সিডি দোকানের মাধ্যমে এলাকায় ছড়িয়ে দেন।

একজন কলেজ শিক্ষকের এমন লাম্পট্য দেখে এলাকার মানুষের মধ্যে ছি ছি রব পড়ে যায়। বিক্ষুদ্ধ হয়ে তার বিরুদ্ধে মিছিল করেন তারা। কিন্তু এই মিছিল কি পারবে সম্ভ্রমহারা ওই নারীর সম্ভ্রম ফিরিয়ে দিতে? এসব মিছিলে কোনও কাজ হয় না। হীতে বিপরীত হয়, পাপের গন্ধ আরও বেশি জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

আসলে পাপের উৎস বন্ধ না করে কেবল হইচই করলে সেই পাপের দুর্গন্ধ আরও ব্যাপক হয়। আব্দুল লতিফের ঘটনা এর একটি জ্বলন্ত প্রমাণ। কারণ, এসব মিটিং মিছিলের কারণে ঘটনাটি এলাকার সবার নজরে আসে। যাও কিছুটা গোপনীয় ছিল মিছিলের কারণে তাও ফাঁস হয়ে গেল। ওই ছাত্রীর জীবনের ওপর দিয়ে বয়ে যেতে লাগল ভয়াবহ ঝড়, বিভীষিকাময় দুঃস্বপ্ন। এমন স্বপ্নের তা‘বীর করতে গা শিউরে ওঠে তার। নারীর সবচে’ নিরাপদ ও কাঙ্ক্ষিত আশ্রয়স্থল থেকে তাকে বিতাড়িত করা হলো। স্বামীর বাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়ে প্রথমে তিনি আশ্রয় নেন বাবার বাড়ি। কিন্তু কলঙ্কের দাগ তাকে এখানেও থাকতে দেয় না। তাই বাধ্য হয়ে আশ্রয় নেন এক দূর সম্পর্কীয় আত্মীয়ের বাড়ি। [তথ্যসূত্র : কালের কণ্ঠ, ২৩ অক্টোবর ২০১০ ইং]

এভাবেই পাপের বিষক্রিয়া বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনিসহ আরও অনেক ছাত্রী, নির্যাতিতা, ধর্ষিতা নারী। শিক্ষক আব্দুল লতিফ যাদের জীবন ও শরীর নিয়ে খেলা করেছেন, তাদের প্রকৃত সংখ্যা কত, তা তিনি আর আল্লাহ ভালো জানেন। কারণ, আল্লাহর দৃষ্টিকে ফাঁকি দিয়ে কেউ কোনও পাপ করে পার পেতে পারে না। শিক্ষার কথা বলে এভাবেই চাক থেকে মধু আহরণ করে চলেছেন আবদুল লতিফরা। তাদের হুলে, কামড়ে ভাঙছে অসংখ্য সংসার। রচিত হচেছ কলঙ্কের ইতিহাস। বিঘ্নিত হচ্ছে শান্তি ও নিরাপত্তার পরিবেশ।

কেউ যদি প্রশ্ন করেন যে, কেন হচ্ছে এসব? তাহলে আমি তার এই প্রশ্নকে একটা বিদ্রূপ বলেই ধরে নেব। কেননা, যেখানে অহরহ আল্লাহর বিধানের লংঘন হচ্ছে, বেআব্রুর সকল উপকরণ সস্তাপণ্যে পরিণত হয়েছে, ছাত্রী-শিক্ষকের প্রভেদের দেয়াল উঠে গেছে, স্বয়ং শিক্ষক ছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করছে, ছাত্রীকে ধর্ষণ করছে, তখন সমাজে এ ধরনের হাজারও আবদুল লতিফের জন্ম নেয়া বিস্ময়কর কিছু নয়। এদের এসব ঘটনা ভোরেরবেলার কাকের কর্কশ আওয়াজের মত শোনালেও করার কিছুই নেই। নিয়মিত আপনাকে এসব ঘটনা হজম বা শ্রবণ করে যেতে হবে। তবে যদি আপনি নাফরমানী ও মুক্তবাসের জীবনের ওপর আল্লাহর বিধান ও পর্দার লাগাম পরিয়ে দিতে পারেন, তাহলে এধরনের ঘটনার ধারাবাহিকতা অবশ্যই বন্ধ হবে, ইনশাআল্লাহ।

– আবু বকর সিরাজী

মতামত দিন

Solve : *
7 + 7 =