আক্বীদা ভ্রান্ত মতবাদ

শিয়া -ইসনা আশারিয়া সম্প্রদায়ঃ পরিচিতি ও আকীদা

শিয়া-ইসনা আশারিয়া সম্প্রদায়ঃ পরিচিতি ও আকীদা

(বারো ইমামে বিশ্বাসী শিয়া সম্প্রদায়)

মূলঃ ধর্ম, মতবাদ ও সমকালীন ফিরকা সংক্রান্ত সহজ বিশ্বকোষ (আরবী) গ্রন্থ থেকে

অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত করণঃ আব্দুর রাকীব মাদানী

সম্পাদনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল

শিয়া- ইসনা আশারিয়া সম্প্রদায়ের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি:

বারো ইমামে বিশ্বাসী ইমামী শিয়া সম্প্রদায় এমন এক ফিরকার নাম যারা মনে করে যে, নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পর খেলাফতের উত্তরাধিকার হিসাবে আবু বাকর, উমর ও উসমান (রাযিঃ) এর থেকে আলী (রাযিঃ) বেশী হকদার।

শিয়া কারা? এই প্রশ্নের  উত্তরে তাদের শাইখ মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ বিন নুমান আল্ মুফীদ বলেনঃ যারা নিজেদেরকে আমীরুল মুমেনীন আলী (আঃ) এর অনুসারী বলে দাবী করেন। তারা মনে করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ইন্তিকাল পরবর্তী প্রথম খলীফা হলেন, আলী (আঃ)। এরা আলী এর পূর্বের খলীফাদেরকে  অস্বীকার করেন আর পরোক্ষভাবে তারা নিজেদেরকে আলী (আঃ) এর অনুসারী মনে করেন। [ইসনা আশারিয়া শিয়াদের আকীদা, আব্দুর রাহমান বিন সাআদ শাসারী, পৃঃ ২৬]

এই শিয়াদেরকে ইমামী শিয়া বলা হয়, কারণ তারা ইমামতকে (নেতৃত্বকে) দ্বীনের মৌলিক বিষয় মনে করে। আর তাদেরকে ইসনা আশারী বলা হয়, কারণ তারা বারোজন ইমামকে বিশ্বাস করে, যাদের সর্বশেষ ইমাম সামুররা নামক স্থানের সুড়ঙ্গে (সিরদাবে) অবস্থান করছে। আহলুস সুন্নাহর বিপরীতে শিয়া বলতে এই মতবাদে বিশ্বাসীদেরকেই বুঝায়। বর্তমানে তারা মুসলিম বিশ্বে প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে নিজস্ব মতবাদ প্রচারে সচেষ্ট।

তাঁদের ইমামগণ ও উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ববর্গঃ

যে বারোজন ব্যক্তিত্বকে শিয়া সম্প্রদায় ইমাম হিসাবে মনে করে তাদের ধারা পরম্পরা নিম্নরূপঃ

  • ১-আলী বিন আবী ত্বালিব (রাযিয়াল্লাহু আনহু)। তারা তাঁকে ‘মুরতজা’ উপাধি দিয়ে থাকে। তিনি খুলাফায়ে রাশেদীনের একজন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জামাতা। তাঁকে খারেজী আব্দুর রাহমান বিন মুলজিম কুফার মসজিদে ১৭ই রামাযান ৪০ হিজরীতে হত্যা করে।
  • ২-হাসান বিন আলী (রাযিঃ)। তাঁকে তারা ‘মুজতাবা’ উপাধি দিয়ে থাকে। (৩-৫০ হিঃ)
  • ৩-হুসাইন বিন আলী (রাযিঃ)। তাঁকে তারা ‘শাহীদ’ উপাধি দিয়ে থাকে। (৪-৪১ হিঃ)
  • ৪-আলী যায়নুল আবেদীন বিন হুসাঈন। তাঁকে তারা ‘সাজ্জাদ’ উপাধি দিয়ে থাকে। (৩৮-৯৫ হিঃ)
  • ৫-মুহাম্মদ আল বাকির বিন আলী যায়নুদ্দীন। তাঁকে তারা ‘বাকির’ উপাধি দিয়ে থাকে। (৫৭-১১৪হিঃ)
  • ৬-জা’ফার সাদিক বিন মুহাম্মদ আল বাকির। তাঁকে তারা ‘সাদিক’ উপাধি দিয়ে থাকে (৮৩-১৪৮ হিঃ)
  • ৭-মূসা আল কাযিম বিন জা’ফার। তাঁকে তারা ‘কাযিম’ উপাধি দিয়ে থাকে। (১২৮-১৮৩ হিঃ)
  • ৮-আলী আর রেযা বিন মূসা কাযিম। তাঁকে তারা ‘রিযা’ উপাধি দিয়ে থেকে। (১৪৮-২০৩ হিঃ)
  • ৯-মুহাম্মদ আল জাউয়াদ বিন আলী। তাঁকে তারা ‘ত্বাক্বী’ উপাধি দিয়ে থাকে। (১৯৫-২২০ হিঃ)
  • ১০- আলী আল হাদী বিন মুহাম্মদ আল জাউয়াদ। তাঁকে তারা ‘নক্বী’ উপাধি দিয়ে থাকে। (২১২-২৫৪ হিঃ)
  • ১১-আল হাসান আল আসকারী বিন আলী। তাঁকে তারা ‘যাকী’ উপাধি দিয়ে থাকে। (২৩২-২৬০ হিঃ)
  • ১২- মুহাম্মদ আল মাহদী বিন হাসান আল আসকারী। তাঁকে আল হুজ্জাতুল কায়িম আল মুনতাজার [প্রতিক্ষিত প্রতিষ্ঠিত প্রমাণ] উপাধি দিয়ে থাকে। (২৫৬ হিঃ )

তারা বিশ্বাস করে যে, তাদের দ্বাদশ ইমাম ইমাম সামুররায় তার পিতার বাসার সুড়ঙ্গে (সিরদাবে) প্রবেশ করেছে অতঃপর আর ফিরেন নি। আত্মগোপন করার সময় তার বয়স কত ছিল? এ নিয়ে তারা মতভেদ করেছে। কেউ কেউ বলেন, সেই সময় তার বয়স ছিল চার বছর, আর কেউ বলেন আট বছর। তবে বেশীরভাগ গবেষক বিষয়টিকে একটি ভ্রান্ত ধারণা মনে করে এবং এটি শিয়াদের কল্পিত ঘটনা হিসাবে আখ্যা দেয়।

তাদের অন্যান্য প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্বগণঃ

  • ১-তাদের ঐতিহাসিক প্রসিদ্ধ ব্যক্তিবর্গের অন্যতম হল আব্দুল্লাহ বিন সাবা।

যদিও শিয়াদের অনেকে এটা স্বীকার করে না কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই ব্যক্তি ইয়েমেনের একজন ইহুদী ছিল। সে বাহ্যিকভাবে ইসলাম প্রকাশ করার পর ইহুদী চিন্তা ধারা শিয়ামতবাদে অনুপ্রবেশ ঘটায়। উদাহরণ স্বরূপ সে, শিয়াদের মধ্যে ‘রাজআত’ এর বিশ্বাস আমদানি করে। (রাজআত অর্থ ফিরে আসা। তারা বিশ্বাস করে কেয়ামতের পূর্বে বারোতম ইমাম এবং কিছু মৃত ব্যক্তি পুনরায় তাদের পূর্বের আকারে পৃথিবীতে ফিরে আসবে এবং যারা শিয়াদের উপর অথ্যাচার করেছে তাদের বদলা নিবে)। সেই আমদানিকৃত বিশ্বাসগুলোর একটি হল, আলী (রাঃ) এর মৃত্যু বরণ না করার আক্বীদা। তাদের বিশ্বাস, তিনি সমগ্র জমিনের মালিক, এমন ক্ষমতার মালিক যার সমতুল্য ক্ষমতা সৃষ্টির আর অন্য কারও নেই এবং এমন জ্ঞানের অধিকারী যা অন্য কারো কাছে নেই। ইহুদী আকীদা থেকে আমদানিকৃত শিয়াদের আরেকটি আক্বীদা হল, ‘বাদা’ বিশ্বাস। (বাদা-ইয়াবদু অর্থ: প্রকাশ পাওয়া। তারা বিশ্বাস করে এমন কিছু বিয়ষ রয়েছে যা আল্লাহ তাআলা তা প্রকাশ পাওয়ার পূর্বে জানতেন না –নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক-)।

আব্দুল্লাহ বিন সাবা ইহুদী থাকা অবস্থায় বলতঃ ইউশা বিন নূন হল নবী মূসা (আঃ) এর অসিয়তকৃত প্রতিনিধি। অতঃপর ইসলাম প্রকাশের পর বলেছিলঃ আলী (রাযিঃ) হচ্ছে নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর অসিয়তকৃত প্রতিনিধি। সে মদীনা, মিসর, কূফা বসরা ইত্যাদি স্থান ভ্রমণ করে এবং আলী (রাযিঃ) কে বলে, “তুমি তুমি”। অর্থাৎ তুমি আল্লাহ। এ কারণে আলী (রাযিঃ) তাকে হত্যা করার ইচ্ছা করেছিলেন কিন্তু আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রাযিঃ) তাকে হত্যা না করার পরামর্শ দিলে তিনি তাকে মাদাইন এলাকায় বিতাড়িত করে দেন।

  • ২-মানসূর আহমাদ বিন আবী ত্বালিব আত্ ত্বাবরুসী মৃতঃ ৫৮৮ হিঃ। কিতাবুল ইহতিজাজ এর লেখক, যা ১৩০২ হিজরীতে ইরানে ছাপা হয়।
  • ৩-কুলাইনী। কিতাবুল কাফী এর লেখক যা ইরানে ১২৭৮ হিজরীতে প্রকাশিত। এই গ্রন্থটির মর্যাদা তাদের নিকট তেমনই যেমন আহলুস সুন্নার নিকট বুখারীর মর্যাদা। তাদের মতে সেই গ্রন্থে ১৬১৯৯ টি হাদীস রয়েছে।
  • ৪-আলহাজ্জ মির্যা হুসাইন বিন মুহাম্মদ আন্ নূরী আত্ ত্বাবরূসী মৃতঃ ১৩২০ হিঃ। ইরাকের নজফে সমাধিত। তিনি (ফাসলুল খিত্বাব ফী ইসবাতি তাহরীফি কিতাবি রাব্বিল আরবাব) এর লেখক। তিনি মনে করেন, বর্তমান কুরআনে কিছু কম-বেশী করা হয়েছে। তন্মধ্যে সূরাতুল ইনশিরাহ এ একটি আয়াতের ঘাটতি রয়েছে, তা হলঃ “ওয়া জাআলনা আলিয়্যান স্বাহরাক” অর্থাৎ “এবং আমি আলীকে করেছি তোমার জামাতা।” গ্রন্থটি ইরানে ১২৮৯ হিজরিতে প্রকাশিত হয়েছে।
  • ৫-আয়াতুল্লাহ আল্ মামক্বানী, তিনি “তানক্বীহুল মাক্বাল ফী আহওয়ালির রিজাল” গ্রন্থের লেখক। তাদের নিকট তিনি রিজাল শাস্ত্রের ইমাম হিসাবে স্বীকৃত। এই গ্রন্থেই সাহাবী আবু বাকর ও উমার (রাযিঃ) কে ‘জিব্ত’ ও ‘ত্বাগুত’ বা শয়তান ও যাদুকর  বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। দেখুনو ১ম খণ্ড পৃঃ ২০৭। গ্রন্থটি ১৩৫২ হিজরীতে নাজাফে প্রকাশিত।
  • ৬-আবু জা’ফর আত্ তূসী লেখকঃ তাহযীবুল আহকাম।
  • ৭- মুল্লা মুহসিন আলকাশী লেখকঃ কিতাবুল ওয়াফী।
  • ৮-মুহাম্মদ বাকির মাজলেসী নামে প্রসিদ্ধ লেখকঃ বিহারুল আনওয়ার।
  • ৯-আয়াতুল্লাহ আল্ খুমায়নী। আধুনিক যুগের শিয়া নেতা, যিনি আধুনিক ইরান বিপ্লবের নায়ক এবং বর্তমান ইরান ইসলামী গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর প্রসিদ্ধ দুটি বইয়ের নাম হল, কাশফুল্ আসরার এবং আল্ হুকুমাহ আল্ ইসলামিয়াহ। তিনি শিয়া মতবাদে সর্বপ্রথম (বেলায়াতুল্ ফক্বীহ) অর্থাৎ ইমামুল হুজ্জার অনুপস্থিতিতে ফকীহ ব্যক্তির ইমামত তথা নেতৃত্বের পক্ষে মত ব্যক্ত করেন।

আকীদা ও চিন্তাধারা

১-ইমামাহ বা নেতৃত্বঃ তাদের মতে নেতৃত্ব দলীল দ্বারা সাব্যস্ত হতে হবে। অর্থাৎ পূর্বের নেতা পরের নেতাকে নির্দিষ্টরূপে নির্ধারণ করবেন; তার গুণাগুণ বর্ণনার মাধ্যমে নয়। নেতৃত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতকে নেতৃত্বহীন অবস্থায় ছেড়ে মারা যাবেন তা হয় না; বরং তাঁর জন্য কোনো এক ব্যক্তিকে নির্ধারণ করা জরুরি ছিল, যাঁর দিকে পরবর্তী লোকেরা প্রত্যাবর্তন করবে এবং তাঁর প্রতি ভরসা করবে।

তারা এই বিষয়ে বলে থাকে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ‘গদীরে খাম’ দিবসে স্পষ্টই আলীর ইমামত নির্দিষ্ট করে দিয়ে ঘোষণা করেন যে, সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পরে ইমাম বা খলীফা হবেন। অবশ্য গদীরে খাম নামক ঘটনায় এমন নির্ধারণের বিষয়টি আহলে সুন্নাতের মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিকদের নিকট অস্বীকৃত ও অসাব্যস্ত।

তারা মনে করে, আলী তাঁর দুই পুত্র হাসান ও হুসাইনের নেতৃত নির্ধারণ করেছিলেন। এভাবে অন্য ইমামরাও। তাই প্রত্যেক ইমাম তার পরের ইমামকে নির্ধারণ করবে আর এটা হবে তার অসীয়ত স্বরূপ। তারা তাদের ‘আউস্বিয়া’ (অসিয়তকৃত ব্যক্তিবর্গ) নামে আখ্যায়িত করে থাকে।

২-ইসমত বা ইমামদের নিষ্পাপতায় বিশ্বাস:

তাদের বিশ্বাস যে, তাদের সকল ইমাম ছোট-বড় সকল প্রকার পাপ থেকে পবিত্র এবং নিস্পাপ।

৩-ইলমে লাদুন্নীর আক্বীদাঃ (আধ্যাতিক জ্ঞান)

তাদের প্রত্যেক ইমামকে ইলমে লাদুন্নী তথা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট থেকে আধ্যাতিক জ্ঞান দেওয়া হয়েছে যা দ্বারা তারা শরীয়ত পরিপূর্ণ করে থাকে। তারা ইলমে লাদুন্নীর অধিকারী, তাদের ও নবীদের মধ্যে এছাড়া কোনো পার্থক্য নেই যে, নবীদের কাছে অহী আসে আর তাদের কাছে অহী হয় না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের শরীয়তের গোপন ভেদ দিয়ে গেছেন, যেন তারা সময়ের দাবী অনুযায়ী সাধারণ লোকদের বর্ণনা দেয়।

৪-ইমামের অলৌকিক শক্তির প্রতি বিশ্বাসঃ

ইমামের হাতে অলৌকিক কিছু প্রকাশ পাওয়া সম্ভব। এসব কে তারা মুজিযা বলে থাকে। যদি কোনো ক্ষেত্রে পূর্বের ইমাম পরের ইমামকে নির্ধারণ না করে থাকে তাহলে এমতাবস্থায় পরের ইমাম অলৌকিকতার মাধ্যমে নির্ধারণ হবে।

৫-গায়েব বা অনুপস্থিতির আকীদা:

তারা বিশ্বাস করে যে, কোনো যুগ হুজ্জাতুল্লাহ থেকে শূন্য হতে পারে না। ‌এই বিশ্বাসের ফলস্বরূপ তারা বিশ্বাস করে যে, তাদের বারোতম ইমাম তাঁর সুড়ঙ্গে গায়েব হয়ে গেছে বা আত্মগোপন করেছে। তারা আবার এই বিষয়টিকে ছোট আত্মগোপন ও বড় আত্মগোপনে বিভিক্ত করে থাকে, যা মূলত: তাদের কল্প-কাহিনীর অন্তর্ভুক্ত।

৬-রাজআত বা প্রত্যাবর্তনে বিশ্বাসঃ

তারা বিশ্বাস করে যে, তাদের দ্বাদশ ইমাম হাসান আসকারী শেষ যামানায় পূণরায় ফিরে আসবেন যখন আল্লাহ তাকে পাতাল কুঠরি থেকে বের হওয়ার আদেশ দিবেন। তিনি এসে জুলুম ও অত্যাচারে পরিপূর্ণ পৃথিবীকে ন্যায় ও সুবিচারে ভরে দিবেন এবং শিয়া বিরোধীদের বদলা নিবেন।

৭  ‘তাকিয়া’ (গোপনীয়তা) নীতি অবলম্বন:

তাকিয়া মনে গোপনীয়তা। তারা সওয়াবের কাজ মনে অন্তরের মূল বিশ্বাসকে গোপন করে শিয়া ছাড়া অন্যদের সামনে ভিন্ন মত প্রকাশ করে। এটাই তাকিয়া নীতি। তারা এমন করাকে দ্বীনের মৌলিক বিধান মনে করে এবং তাকিয়া পরিত্যাগ করাকে নামায পরিত্যাগ করার মত পাপ মনে করে। তাদের শেষ ইমাম পৃথিবীতে পুণরায় আগমনের পূর্বে এই বিধান পালন করা ওয়াজিব। যে তার পূর্বে তা পরিত্যাগ করবে সে দ্বীন থেকে এবং ইমামিয়া মতবাদ থেকে বের হয়ে যাবে। তাদের পঞ্চম ইমাম আবু জাফর এর বরাতে তারা উল্লেখ করেছে, “আকিয়া আমার দ্বীন এবং আমার পূর্ববর্তীদের দ্বীন, যার তাকিয়া নেই তার ঈমান নেই”।

৮-মুত্ আহ করা (নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কন্ট্রাক্ট বিবাহ করা):

তারা মহিলার সাথে মুতআহ সম্পর্ক করাকে উত্তম স্বভাব এবং অতিউত্তম নৈকট্যের কাজ মনে করে এবং এর স্বপক্ষে কুরআনের এই দলীল উপস্থাপন করে। “অতঃপর তাদের মধ্যে যাদের তোমরা সম্ভোগ করেছ, তাদেরকে তাদের ধার্যকৃত মহর প্রদান কর।” [নিসা/২৪]

এই প্রকার বিবাহকে ইসলাম হারাম করেছে, যা একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কিছু বিনিময়ে করা হয়। অধিকাংশ আহলুস্ সুন্নাহ বিবাহে শর্তারোপ করেছে যে, তা যেন অনির্দিষ্টকালের নিয়তে হয়। তাছাড়া মুতআহ বিবাহের রয়েছে কিছু সামাজিক কুপ্রভাব, যা তা নিষিদ্ধতার মতকে দৃঢ়তা প্রদান করে।

৯-বর্তমান কুরআন ছাড়াও ফাতেমী মুসহাফ বা ফাতেমী কুরআন থাকার দাবী:

তারা মনে করে, তাদের নিকট বর্তমান কুরআন ছাড়াও ফাতেমী মুসহাফ নামে অন্য একটি কুরআন রয়েছে। এ কথাটি কুলায়নী তার আল কাফী গ্রন্থের ৫৭ নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, জাফর সাদেক থেকে বর্ণিত “আমাদের নিকট রয়েছে ফাতেমী মুসহাফ। বর্ণনাকারী বলেনঃ আমি বললামঃ ফাতেমার মুসহাফ কি? তিনি বললেনঃ তা এমন মুসহাফ (কুরআন) যা তোমাদের এই কুরআনের তিনগুণ। আল্লাহর কসম তাতে তোমাদের কুরআনের একটি অক্ষরও নেই”।

১০-বারাআত বা সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা করাঃ

তারা তিন খলীফা আবু বাকর, উমার এবং উসমান (রাযিঃ) হতে সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা দেয় এবং তাদের জঘন্য বিশেষণে আখ্যায়িত করে। তারা মনে করে, উক্ত তিন ব্যক্তি আলী (রাযিঃ) এর খেলাফত অবৈধ পন্থায় জবরদখলকারী! এই কারণে তারা গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুরু করার সময় বিসমিল্লাহ না বলে আবু বকর ও উমর রা. এর প্রতি লানত (অভিশাপ) দেওয়ার মাধ্যমে শুরু করে। এছাড়াও তারা বহু সাহাবী এমনকি উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রাযিঃ) কে জঘন্য ভাষায় অভিশাপ দেয় এবং তাদের মান-সম্মানে আঘাত করে।

১১-আলী রা. এর ব্যাপারে বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ঘনঃ

তাদের অনেকে আলী (রাযিঃ) সম্পর্কে বাড়াবাড়ি করে থাকে। অনেকে তাকে মাবুদের স্তরেও পৌঁছিয়েছে যেমন সাবাঈ শিয়ারা। তাদের অনেকে বলেছে যে, জিবরীল ফেরেশতা ভুল করে আলী রা. এর পরিবর্তে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লম এর নিকট রেসালাত নিয়ে অবতরণ করে; কারণ আলী দেখতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লম এর মত ছিল যেমন কাক কাকের মত হয় এই জন্য তাকে তারা গুরাবিয়্যাহ (কাক সদৃশ্য ) নামকরণ করে।

১২-গদীরে খাম ঈদ-উৎসব পালনঃ

তারা প্রতিবছর ১৮ই যুলহজ্জ তারিখে এই ঈদ-উৎসব পালন করে এবং তারা এই ঈদকে ইদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা থেকে প্রাধান্য দেয় এবং ঈদুল আকবার (সবচেয়ে বড় ঈদ) আখ্যা দেয়। এই দিনে রোযা রাখা তাদের নিকট সুন্নাতে মুআক্কাদাহ। তারা বিশ্বাস করে যে, এই দিনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লম আলী (রাযিঃ) কে তার পরবর্তী খলীফা হিসেবে অসিয়ত করেছিলেন।

এছাড়া তাদের আরও একটি ঈদ রয়েছে যা তারা রবিউল আউয়াল মাসের নবম তারিখে উদযাপন করে। সেটা তাদের বাবা শুজাউদ্দীনের ঈদ। এটা প্রকৃতপক্ষে অগ্নীপূজক আবু লুলু এর কবর। এই অগ্নীপূজক ছিল উমর বিন খাত্তাব (রাযিঃ) এর হত্যাকারী।

১৩-শোকপালন

তারা শোক পালনের অনুষ্ঠান করে, মৃতকে স্মরণ করে বিলাপ করে কাঁদে, বুক চাপড়ায়, ধারাল অস্ত্র দ্বারা পিঠ আঘাত করে রক্তাক্ত করে। এই প্রকার কাজ তারা মুহররম মাসের প্রথম দশকে সওয়াবের আশায় করে এবং পাপের কাফ্ফারা মনে করে। বর্তমানে যদি কেউ তাদের পবিত্র স্থানাদি (!!) যেমন কারবালা, নাজাফ, কুম ইত্যাদি এলাকা ভ্রমন করে, তাহলে আরও অনেক আশ্চর্য্য জনক কার্যকলাপ দেখতে পারে। [অবশ্য তাদের এসব কার্যক্রম বর্তমানে নেট মারফতও দেখা যায়]

[উপরোক্ত আকীদা পোষণ করার পাশাপাশি তারা বিভিন্ন বড় শির্কে লিপ্ত। যেমন, আল্লাহ ছাড়া সৃষ্টির কাছে দুআ করা, তাদের নিকট আশা-ভরসা করা, তাদের জন্য নযর-মানত করা, সাজদা করা, তাওয়াফ করা প্রভৃতি]

তাদের বর্তমান অবস্থানঃ

বর্তমানে ইসনা আশারিয়া তথা ইমামিয়া শিয়াদের মূল অবস্থান হচ্ছে ইরান। এ দেশই হচ্ছে তাদের কেন্দ্রভূমি। এছাড়াও একটি বড় সংখ্যা রয়েছে ইরাকে এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। ভারতীয় উপমহাদেশ এবং আফ্রীকাতেও তাদের স্বল্প-বিস্তর  উপস্থিতি রয়েছে।

সারাংশ: শিয়া মতবাদের আত্মপ্রকাশ ঘটে এ নিয়ে যে, আবুবকর, উমার ও উসমানের (রাযিঃ) তুলনায় আলী (রাযিঃ) খেলাফতের বেশী হকদার। অতঃপর ক্রমশঃ এই মতবাদ বৃদ্ধি লাভ করে এবং পরবর্তীতে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ও আকীদাগত ফিরকায় পরিণত হয়, যার ঝাণ্ডতলে ইসলাম ও মুসলিম শত্রুরা আশ্রয় নেয়। ইসলামের ইতিহাস গভীর ভাবে অধ্যয়ন করলে জানা যাবে যে, বৃহৎ মুসলিম দেশের বিরূদ্ধে বিদ্রোহ ও বিচ্ছিন্নতার প্রায় সকল আন্দোলনের পিছনে কোনো না কোনোরূপে শিয়াগোষ্ঠির হাত রয়েছে এবং বর্তমানেও তা অব্যাহত রয়েছে। তাদের নিজস্ব চিন্তা-ধারার কারণে শিয়া মতবাদ ইসলাম থেকে সম্পূর্ণ একটি পৃথক ধর্মের রূপ নিয়েছে। এর ফলে ইসলাম শত্রু এবং পাশ্চাত্য সমাজ মুসলিম জাতিকে পারস্পারিক বিভেদ সৃষ্টিকারী দলেদলে বিভক্ত ধর্ম হিসেবে পেশ করার সুযোগ পাচ্ছে এবং খৃষ্ট মতবাদের সাথে তুলনা করছে, যাদের বিভিন্ন দল-উপদলের সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়ে গেছে।


মূলগ্রন্থঃ

الموسوعة الميسرة في الأديان والمذاهب والأحزاب المعاصرة

(ধর্ম, মতবাদ ও সমকালীন ফিরকা সংক্রান্ত সহজ বিশ্বকোষ)

সম্পাদনা: ড. মানি বিন হাম্মাদ আল জুহানী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৫৫-৬০

প্রকাশনায়ঃ দারুন নাদওয়াহ আল আলামিয়্যাহ, রিয়াদ, প্রকাশকালঃ ১৪১৮ হিঃ

অনুবাদঃ আব্দুর রাকীব মাদানী

দাঈ, দাওয়াহ সেন্টার খাফজী সউদী, আরব

সম্পাদনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল

দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ  এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সউদী আরব

মতামত দিন