তাবলীগ

নও মুসলিম আবদুল করীম

মূল : মুহাম্মদ হানিফ শহিদ

অনুবাদ: ইকবাল কবীর মোহন

নও মুসলিম আবদুল করীম ফিলিপাইনের অধিবাসী। তার পূর্ব নাম গ্যারী এহার্ড। ক্যাথলিক খৃষ্টান পরিবারে তার জন্ম৷ খৃষ্টান পরিবেশে বড় হলেও সেই সমাজের প্রতি তার কোন আকর্ষণ ছিল না। তার মধ্যে ধর্ম সম্পর্কে ছিল নানা রকম ভ্রান্ত ধারণা। স্কুলে পড়ার সময় তাঁর এক মুসলিম বন্ধু গ্যারীকে “Islam the Religion of All Prophets” নামক বইটি পড়তে দেয়। গ্যারী বইটি ভালভাবে পড়ে নেন। এতে তার অনেক ভুল ধারণা দূরীভূত হয়। অবশেষে তিনি ইসলামকে মেনে নেন এবং তা কবুল করেন। সেটা ১৯৮৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারী।

গ্যারীর বয়স তখন মাত্র ২৭ বছর। তার নতুন নাম হয় আবদুল করীম। বিস্ময়ের ব্যাপার যে, গ্যার ইসলাম কবুল করেই ক্ষান্ত হননি। তার অক্লান্ত প্রচেষ্টায় মাত্র তিন বছরের মধ্যে গ্যারীর গোটা পরিবার ইসলামে দীক্ষিত হয়। তিনি কর্ম জীবনের কারণে সৌদী আরবের জিদায় আসেন ১৯৯৫ সালের ১৪ আগস্ট । তিনি সেখানেই কর্মরত। সৌদী গেজেট পত্রিকায় তার একটি সাক্ষাতকার প্রকাশিত হয়। নীচে সেটি তুলে ধরা হলো।

প্রশ্ন : আপনি ইসলাম গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিলেন কেন?

উত্তর : প্রথমত ইসলামী শিক্ষা খুবই স্বচ্ছ এবং সাধারণের বোধগম্য। এটি হৃদয়ের গভীরে সহজেই প্রোথিত হয়। পবিত্র কুরআন এমন একটি ঐশী গ্রন্থ যা সামান্যতম পরিবর্তন, পরিবর্ধন ছাড়াই ১৪০০ বছর অবিকল বর্তমান। প্রথম অধ্যায় থেকে ১১৪ তম অধ্যায়ের কোথাও কোন বিভ্রান্তি নেই, নেই কোন সংশয়। প্রতিটি জিনিসই হচ্ছে যুক্তিযুক্ত এবং প্রাসঙ্গিক। অধিকন্তু একেশ্বরবাদে বিশ্বাসও খুবই যুক্তিযুক্ত। আল্লাহ একমাত্র বিধাতা। তার কেন স্ত্রী বা পুত্রের প্রয়োজন হবে? মানুষের জন্য স্ত্রীলোকের প্রয়োজন রয়েছে কেননা সে যখন পরিশ্রান্ত হয় অথবা তার অবসরের প্রয়োজন হয় তখন স্ত্রী তাকে সাহায্য করে। মানুষ বৃদ্ধ হয়, সে দুর্বল হয়। কিন্তু আল্লাহ কখনই পরিশ্রান্ত হন না। তার জন্য বিশ্রাম যেমন প্রয়োজন নেই তেমনি প্রয়োজন নেই নিদ্রারও। তাই তার কেন স্ত্রী বা ছেলেমেয়ের প্রয়োজন হবে?

তাছাড়া ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। এটি জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আমাদেরকে দিক নির্দেশনা দান করে। আমরা কিভাবে আমাদের পিতা-মাতা, ভাই-বোন, শিক্ষক, বন্ধুবান্ধব এবং প্রতিবেশীর সাথে আচরণ করব তা শিক্ষা দেয় ইসলাম। ইসলাম আমাদের অধিকার বুঝিয়ে দেয় এবং আমাদের দায়িত্ব কর্তব্য সচেতন করে তোলে। ইসলাম জন্ম ও মৃত্যু, বিবাহ বা অন্য কোন উৎসব পালনের কিছু নিয়মনীতি পালনের নাম নয় বরং এটা আমাদের গোটা জীবনের পথ নির্দেশ । এটি শুধু মসজিদেই সীমাবদ্ধ নয়। ইসলামের নিজস্ব অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক বিধান রয়েছে। এটি আমাদের বলে দেয় আমরা কি খাব, পান করব ও পরিধান করব আর কি কি করব না।

বাইবেলে আমরা অনেক স্ববিরোধী কথাবার্তা পাই। যীশু বলেছেন, আমি কখনো আমার থেকে কিছু বলিনা, আমি বলি তারই কথা যিনি আমার প্রভু এবং তোমাদেরও প্রভু। তারপরও খৃষ্টানরা কিভাবে যীশুর আরাধনা করে? বাইবেলের ৬০০ ভলিউমে (প্রটেস্টটেন্ট ভার্সন) অথবা ৭৩ ভলিউমের (রোমান ক্যাথলিক ভার্সন) কোথাও যীশু নিজে প্রভু বা তার প্রার্থনা করতে হবে এমন একটি কথাও বলেননি। বাইবেলের শিক্ষা অনুযায়ী যীশু তার পূর্ববতী নবীদের নিয়মনীতি ধ্বংস করতে আসেননি তিনি বরং তার পূর্ববতীদের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্যই এসেছেন। সংক্ষেপে বলা যায়, নবীর বার্তার মূল লক্ষ্য ছিল মানুষ এবং সৃষ্টির মধ্যে এবং মানুষে মানুষে প্রকৃত সম্পর্ক গড়ে তোলা।

তাছাড়া খৃষ্টান ধর্মে মানুষ এবং বিধাতার মধ্যে মধ্যস্থতার বিধান রয়েছে যা ইসলামে নেই। কাউকে অনুশোচনা বা অনুতাপের জন্য ধর্মযাজকের সরণাপন্ন হবার প্রয়োজন নেই। ইসলামের প্রতিটি মানুষের সাথে সম্পর্ক আল্লাহর। ইসলামের প্রতিটি জিনিসই খুব সহজ ও যুক্তিযুক্ত। ইসলামের মতে দুনিয়ার জীবন পরবর্তী জীবনের জন্য পরীক্ষার সময়।

প্রশ্ন : ইসলাম কবুল করার পর এখন আপনার কেমন লাগছে?

উত্তর : অবশ্যই সুখের । কারণ আগের গুনাহের কোন ধারণা এখানে নেই। আমাদের পিতা-মাতা আদম এবং হাওয়া একটা ভুল করেছিলেন এবং তার জন্য তারাই দায়ী। আর আল্লাহ তাদের ক্ষমাও করেছেন। আমরা সেই ভুলের জন্য উত্তরাধিকারী নই এবং তাদের ভুলের জন্য আমরা কোনভাবেই দায়ীও নই। ভালকে গ্রহণ এবং মন্দকে পরিত্যাগ আমাদের ব্যক্তিগত এবং সামষ্টিক দায়িত্ব। আমাদেরকে এ কাজ করতে হবে নতুবা আমরা আখিরাতে এর জন্য দায়িত্ব এড়াতে পারব না।

প্রশ্ন : ইসলামে আগমনের যাত্রা আপনার কখন থেকে শুরু?

উত্তর : আমি তখন লুপেনে ‘স্কুল অব ফিসারিজের’ ছাত্র। তখন আমার একজন মুসলিম বন্ধু ছিল। সে আমাকে Islam the Religion of All Prophets বইট পড়তে দেয়। সেখানে আমি পড়ে জানতে পারি যে যীশুখৃষ্ট ইসলামের একজন বার্তা বাহক ছিলেন। কিন্তু আমি আমার পূর্বের ধর্ম থেকে জেনেছিলাম যীশুও একজন প্রভু। বইটিতে বলা হয়, একজন মুসলমানও অমুসলিম হয়ে যাবে যদি না সে যীশুখৃষ্টকে একজন গোলাম এবং আল্লাহর প্রেরিত বাহক মনে করেন। এ বিষয়টি জানার জন্য আমার ঔৎসুক্য বেড়ে গেল। তাই কালবিলম্ব না করে আমি আমার একজন প্রতিবেশির নিকট গেলাম যিনি ইসলাম কবুল করেছেন। আমি তার ইসলামের দিকে আগমনের কারণ জিজ্ঞেস করলাম। তিনি আমাকে জানালেন ইসলাম হচ্ছে আল্লাহর মর্জির নিকট পুরোপুরি আত্মসমর্পণ এবং এটি জীবনের চলার পথ। তাছাড়া তিনি বললেন, ঈসা (আ) এর মা ভারজিন মেরী কুরআনের দ্বারা প্রশংসিত এবং তিনি পড়লেন,

 وَإِذْ قَالَتِ الْمَلَائِكَةُ يَا مَرْيَمُ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَاكِ وَطَهَّرَكِ وَاصْطَفَاكِ عَلَىٰ نِسَاءِ الْعَالَمِينَ

يَا مَرْيَمُ اقْنُتِي لِرَبِّكِ وَاسْجُدِي وَارْكَعِي مَعَ الرَّاكِعِينَ

“হে মরিয়ম, আল্লাহ তোমাকে বেছে নিয়েছেন, পবিত্র করেছেন এবং তোমাকে বিশ্বনারী সমাজের উর্ধ্বে মনোনীত করেছেন। হে মরিয়ম! তুমি আনুগত্য কর তোমার পালনকর্তার এবং সিজদা কর আর রুকুকারীদের সাথে রুকু কর।’ (আলে ইমরান ৪২ ও ৪৩)

মেরীকে কুরআনে যতটা সম্মানিত করা হয়েছে বাইবেলেও তা করা হয়নি। তিনি আমার নিকট জানতে চাইলেন, ঈসা (আ) কি একবারও নিজেকে খোদা দাবী করেছেন অথবা তিনি আমাদের খোদা বলে জানিয়েছেন এবং তিনি কি তার প্রার্থনা করার কথা বলেছেন? আমি বললাম না তিনি তা বলেননি।

অবশেষে আমি সব বুঝতে পারলাম এবং একেশ্বরবাদে বিশ্বাস স্থাপন করলাম। আমার এ ধারণা হলো যে ঈসা (আ) একজন গোলামের চেয়ে কম বা বেশি নন এবং তিনি আল্লাহর একজন নবী মাত্র। আমি তারপর ১৯৮৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারী ইসলাম গ্রহণ করলাম । তখন আমি আমার প্রদেশ ডেভিও ওরিয়েন্টালে থাকি।

প্রশ্ন : আপনার পরিবারের লোকেরাও কি ইসলাম গ্রহণ করেছিল?

উত্তর : হ্যা, তারাও ইসলাম গ্রহণ করেছিল। আমি ইসলামী বিশ্বাসের কথা প্রকাশ করায় তারাও বুঝতে পারে এবং ইসলামের ছায়াতলে এসে সমবেত হয়। আমি তাদের সব ভ্রান্তি দূর করতে সক্ষম হই এবং খৃষ্টানরা যে সংশয় সৃষ্টি করে চলছে তা তাদের বুঝাতে পারি। ফলে আমার ইসলাম কবুল করার তিন বছর পর আমার পরিবারের সদস্যরাও ইসলাম গ্রহণ করে নেয়।

প্রশ্ন : মুসলমান হিসেবে আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি?

উত্তর : নবী করীম (সা) বলেছেন, আমার পক্ষ হতে একটি বাক্য হলেও তা প্রচার কর। এটাই আমার জীবনের পরিকল্পনা। আমি আমার ব্যবহার এবং মুখের ভাষা দিয়ে ইসলাম প্রচার করতে চাই। এ জন্য আমার এলাকায় একটি ছোট্ট ইসলামী প্রচার কেন্দ্র আমি প্রতিষ্ঠা করতে চাই ৷

সূত্র: পুরনো মাসিক পৃথিবী

মতামত দিন