তাওহীদ

তাওহীদ আর-রুবূবীয়াহ

মূলঃ ড. আবু আমীনাহ বিলাল ফিলিপ্স
অনুবাদ ও প্রকাশনায়ঃ কুর’আন বুঝুন

যখন কিছুই ছিলনা সেই অবস্থা থেকে আল্লাহ সবকিছুর অস্তিত্ব তৈরি করেছেন, এই মৌলিক ধারণার ওপর ভিত্তি করে তাওহীদের এই শ্রেনিবিভাগটি গঠন করা হয়েছে। সৃষ্টি থেকে অথবা সৃষ্টি কর্মের দ্বারা আল্লাহ তাঁর নিজের কোন প্রয়োজন মেটানোর কারণ ব্যতিরেকেই সকল কিছুকে প্রতিপালন ও রক্ষণাবেক্ষণ করেন; এবং তাঁর সার্বভৌমত্বের প্রতি কোন ধরণের প্রতিদ্বন্দ্বীতা ছাড়াই তিনি এই মহাবিশ্ব ও এর মধ্যে বিদ্যমান সবকিছুর একমাত্র প্রভু। সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তার এই গুণ একইসাথে বর্ণনা করতে আরবী শব্দ ‘রুবূবীয়াহ’ ব্যবহৃত হয়েছে, যার উৎপত্তি মূল শব্দ ‘রব’ (প্রভু) থেকে। এই শ্রেণিবিভাগ অনুযায়ী, যেহেতু সকল অস্তিত্বের মধ্যে একমাত্র ঈশ্বরই প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী, সুতরাং তিনিই সেই সত্ত্বা যিনি এই মহাবিশ্ব ও এর মধ্যে বিদ্যমান সবকিছুকে তার গতিবিধি ও তার পরিবর্তনের ক্ষমতা প্রদান করেছেন। তাঁর অনুমোদন ছাড়া সমগ্র সৃষ্টিতে কিছুই সংঘটিত হয় না।এই বাস্তবতার স্বীকৃতিস্বরূপ নাবী মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম “লা হাওলা ওয়া লা-ক্বুওয়াতা ইল্লা-বিল্লাহ।” (আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কারও কোন গতিবিধি, শক্তি বা ক্ষমতা নেই।) এই বিষ্ময়সূচক বুলিটি সবসময় আওড়াতেন।

ক্বুর’আনের বহু অনুচ্ছেদেই রুবূবীয়াহ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। যেমন আল্লাহ বলেছেনঃ

اللَّهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ وَكِيلٌ

আল্লাহ সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি সবকিছুর কর্মবিধায়ক। [সূরাহ আয-যুমার, ৩৯:৬২]

مَا أَصَابَ مِن مُّصِيبَةٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ

আল্লাহর নির্দেশ ছাড়া কোন বিপদ আসে না। [সূরাহ আত-তাগাবূন, ৬৪:১১]

নাবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে বলেছেন, “জেনে রাখো, যদি সমগ্র মানবজাতি তোমাকে সাহায্য করার জন্য একত্রে জড়ো হয়, তারা শুধু তোমার জন্য তাই করতে সক্ষম হবে যা আল্লাহ ইতিপূর্বে তোমার জন্য লিখে রেখেছেন। অনুরূপভাবে, যদি সমগ্র মানবজাতি তোমার কোন ক্ষতি করার জন্য জড়ো হয়, তারা শুধু তোমার ক্ষতি করার জন্য ততটুকুই করতে সক্ষম হবে, যা আল্লাহ ইতিপূর্বেই তোমার ক্ষেত্রে ঘটবে বলে লিখে রেখেছেন।”[১]

যার ফলে মানুষ তার দৈনন্দিন জীবনে যা কিছু সৌভাগ্য কিংবা দুর্ভাগ্য হিসেবে গণ্য করে প্রকৃতপক্ষে এগুলো আল্লাহ কর্তৃক পার্থিব জীবনে পরীক্ষা করার জন্য পূর্বনির্ধারিত নিমিত্ত মাত্র। আল্লাহ যেভাবে নির্দিষ্ট করে রেখেছেন, এসকল ঘটনাপ্রবাহ মূলত সেই নির্দিষ্ট ধরনই অনুসরণ করে। আল-ক্বুর’আনে আল্লাহ বলেছেনঃ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ وَأَوْلَادِكُمْ عَدُوًّا لَّكُمْ فَاحْذَرُوهُمْ

হে বিশ্বাসিগণ! নিশ্চয় তোমাদের স্ত্রী ও সন্তানসন্ততিদের মধ্যে কেউ-কেউ তোমাদের শত্রু, সুতরাং তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকো। [সূরাহ আত-তাগাবূন ৬৪:১৪]

অর্থাৎ দুনিয়ার জীবনের অনেক ভাল জিনিষের মধ্যেও আল্লাহর প্রতি একজনের বিশ্বাসের ক্ষেত্রে কঠিন পরীক্ষা রয়েছে। অনুরূপভাবে জীবনের বিভিন্ন ক্রান্তিলগ্ন ও দুঃখ দুর্দশায় একজন মানুষের জন্য কঠোর পরীক্ষা বিদ্যমান। যেমন আল্লাহ বলেছেন,

وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ

আর নিশ্চয়ই আমি তোমাদের ভয়, ক্ষুধা, ধন-সম্পদ, জান-মাল এবং ফলফসলের ক্ষতি দিয়ে পরীক্ষা করব, কিন্তু তুমি তাদের সুখবর দাও, যারা ধৈর্যশীল। [সূরাহ বাক্বারাহ, ২:১৫৫]

কারণ ঘটিত ব্যাপারে [cause & effect relation] এই ক্ষয়ক্ষতির ধরণগুলি মাঝে মাঝে সহজেই বোঝা যায়। তবে অনেক ক্ষেত্রে আপাতদৃষ্টিতে মন্দ কিছু থেকে যখন ভাল কোন ফলাফল আসে, কিংবা ভাল থেকে মন্দ, সেসব ক্ষেত্রে এগুলো সহজে বোধগম্য হয় না। এরূপ আপাত নিয়মবহির্ভূত জিনিসের পেছনে যে বিচক্ষণতা (wisdom) রয়েছে, সেটা মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে তার তাৎক্ষণিক বোধশক্তি (immediate comprehension) দ্বারা উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। এ সম্পর্কে আল্লাহ ক্বুর’আনে বলেছেনঃ

وَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ وَعَسَىٰ أَن تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ

“হতে পারে তোমরা যা পছন্দ কর না, তাই তোমাদের জন্য ভালো, অথবা হতে পারে তোমরা যা পছন্দ কর তাই তোমাদের জন্য মন্দ, [তোমাদের জন্য কী ভাল, কী মন্দ সেটা] আল্লাহ জানেন, তোমরা জান না।” [সূরা বাক্বারাহ ২:২১৫]

মাঝে মধ্যে দেখা যায়, মানুষের জীবনে আপাতদৃষ্টিতে কোন খারাপ ঘটনাই ভালো ফল নিয়ে আসে, অন্যদিকে মানুষ হয়তো কোন কিছু নিজের জন্য ভালো মনে করে, কিন্তু সেটাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং প্রতিদিনকার জীবন চলার পথে মানুষকে যেসকল ঘটনা প্রবাহের সম্মুখীন হতে হয়, সেগুলোর ওপর মানুষের কর্তৃত্ব মূলত তার সামনে উপস্থিত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাছাইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। চূড়ান্ত ফলাফল তার নিজস্ব বাছাইকৃত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে না। অন্য কথায়, “মানুষ চিন্তা করে, আর ঈশ্বর সম্পাদন করেন।” বাহ্যিকভাবে যেটা “সৌভাগ্য” কিংবা “দুর্ভাগ্য” বলে দৃষ্টিগোচর হয়ে তার সবই আল্লাহর তরফ থেকে, এবং তা কোন ক্রমেই কপাল গুণে [lucky charm] কিংবা প্রচলিত বিভিন্ন কুসংস্কার যেমন খরগোশের পা, four-leaf clovers [এক বোঁটায় চার পাতা], Wishbone [দুই জন মানুষ দুই দিক থেকে টেনে এই হাড়টিকে দুই ভাগে ভাগ করে, যার অংশে বড়ো ভাগটি পড়বে তার যে কোন ইচ্ছা পূর্ণ হবে], lucky numbers [ভাগ্যবান সংখ্যাসমূহ], রাশিচক্র, (অথবা আমাদের দেশে প্রচলিত বিভিন্ন কুসংস্কার, অপয়া, অলক্ষী, কোথাও বের হওয়ার আগে বাধা পেলে, অশুভ রঙ, সকালে নির্দিষ্ট কারো মুখ দেখে বের হওয়া) ইত্যাদি, অথবা বিভিন্ন শুভ বা অশুভ ইঙ্গিত যেমন ১৩ শুক্রবার, ভাঙ্গা আয়না, কালো বিড়াল ইত্যাদি এসব কারণে হয় না। বরং তাওহীদের এই শ্রেণি অনুসারে এই ধরণের যাদুমন্ত্র, কুসংস্কার কিংবা শুভ অশুভ ইঙ্গিতে বিশ্বাস করা গুরুতর অপরাধ শির্কের (শরীক করা) পর্যায়ে পড়ে। নাবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর একজন সহচর ‘উক্ববাহ বলেছেন যে, একদা একদল লোক আল্লাহর রসূলের নিকট তাদের আনুগত্যের স্বীকৃতি প্রদান করার জন্য আসলো। তিনি তাদের মধ্যে থেকে নয় জনের শপথ গ্রহণ করলেন, কিন্তু একজনের থেকে নিতে রাজী হলেন না। যখন তারা জিজ্ঞেস করল, তিনি কেন তাদের এই সঙ্গীটির শপথ গ্রহণ করলেন না, তিনি বললেন, “সে একটি মন্ত্রপূত রক্ষাকবচ[২] পড়ে আছে।” যে লোকটি মাদুলি পড়ে ছিল সে তার জোব্বার ভেতর হাত দিয়ে মাদুলিটি ছিড়ে ভেঙ্গে ফেলে শপথ গ্রহণ করল। নাবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরপর বললেন, “যে ব্যক্তি তাবিজ পড়ল, সে শির্ক করল।”[৩]

সৌভাগ্য আনয়নের জন্য কিংবা অমঙ্গল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মাদুলি বা তাবীজে করে ক্বুর’আনের আইয়াত গলায় (শরীরের যে কোন জায়গায়) ঝোলান, অথবা বহন করার সাথে প্যাগানদের (পৌত্তলিক ধর্মবিশ্বাসি) এই রীতির তেমন কোন পার্থক্য নেই। নাবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সহচরবৃন্দের কেউই ক্বুর’আনের আইয়াতের এরূপ ব্যবহার করেন নি। বরং তিনি বলেছেন, “যে ব্যক্তি ইসলামে নতুন কিছুর প্রবর্তন করে যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা পরিত্যক্ত বলে গণ্য হবে [rejected][৪] তবে একথা সত্য যে ক্বুর’আনের আন-নাস ও আল-ফালাক্ব অধ্যায় দুটি সুনির্দিষ্টভাবে ঝাড়ফুঁকের (exorcism) জন্যই অবতীর্ণ হয়েছে (অমঙ্গলজনক যাদুটোনা, শয়তানের অনিষ্ট ও কুদৃষ্টি থেকে মুক্তির জন্য)। কিন্তু এগুলো ব্যবহারের পদ্ধতিও নাবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সঠিকভাবে দেখিয়ে গেছেন। একবার যখন তাঁর ওপর যাদু করা হয়েছিল তখন তিনি ‘আলী ইবনু আবী ত্বলিবকে এই অধ্যায় দুটির আইয়াত একে একে আবৃত্তি করতে বলেছিলেন। অসুস্থ অবস্থায় তিনি নিজে নিজেই আবৃত্তি করতেন।[৫] কিন্তু কোন অবস্থাতেই তিনি এগুলো লিখে তার গলায় ঝুলিয়ে রাখেন নি, কিংবা হাতে বা কোমড়ে বেধে রাখেন নি, এবং কাউকে এগুলো করতেও বলেন নি।


বর্ণনা করেছেন ইবনু ‘আব্বাস এবং সংগ্রহ করেছেন আত-তিরমিয্বী। See Ezzeddin Ibrahim and Denys Johnson -Davies, An-Nawawi’s Forty Hadith, (English Trans.), (Damascus, Syria: The Holy Koran Publishing House, 1976), p.68, no.19.

সৌভাগ্য আনয়নের জন্য কিংবা অমঙ্গল প্রতিহত করার জন্য যে তাবিজ পড়া হয়।

মুসনাদ আহমাদ, ৪/১৫৬।

বর্ণনা করেছেন ‘আ’ইশাহ এবং সংগ্রহ করেছেন আল-বুখারী (Sahih Al-Bukhari, (Arabic-English), vol.3, p.535, no.861), মুসলিম (Sahih Muslim, (English Trans.), vol.3, p.931, no.4266 and no.4267) and আবু দাঊদ (Ahmad Hasan, Sunan Abu Dawud (English Trans.), (Lahore: Sh. Muhammad Ashraf Publishers, 1st. ed., 1984), vol.3, p.1294).

বর্ণনা করেছেন ‘আ’ইশাহ এবং সংগ্রহ করেছেন আল-বুখারী (Sahih Al-Bukhari, (Arabic-English), vol.6, p.495, no.535) and Muslim (Sahih Muslim, (English Trans.), vol.3, p.1195, no.5439-40).

মতামত দিন

Solve : *
14 × 27 =