বৈকালিক মাদরাসা যেভাবে পরিচালনা করবেন

বাংলাদেশে সাধারণত স্কুলগুলোতে ৬দিন পুর্ণ ক্লাস হয়। যদি কোথাও ৫দিন হয় আর শুক্র শনি বন্ধ থাকে তখন প্রভাতকালীন ছবাহী মক্তব সম্ভব হবে। আপাত বৈকালিক মাদরাসা ক্লাস বা আফটার স্কুল ইসলামিক ক্লাস কিভাবে পরিচালনা করবেন তারই পরিকল্পনা পেশ করছি।

প্রয়োজন একটি স্বাস্থ্য সম্মত পরিবেশ। তা মসজিদ মাদরাসা কিংবা কোনো হল ভাড়া করে হতে পারে। তবে শহর কেন্দ্রীক মসজিদ কিংবা মাদরাসা গুলোতে এই ক্লাস পরিচালনা করা খুব সহজ। নীচে বসে হউক কিংবা চেয়ার টেবিলে পরিচ্ছন্ন ব্যবস্থা চাই। ক্লাসের স্থান ভাড়া অথবা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে চলতে পারে। তারপর প্রয়োজন শিক্ষাসামগ্রী। শাদা বোর্ড, কলম সহ সম্ভব হলে কম্পিউটার আইপেড প্রজেক্টর ইত্যাদি। অত:পর একটি সিলেবাস। সিলেবাস রাখবেন সহজ অল্প ও বোধগম্য সহজ পাঠ্য।

যেমন:

ইসলামিক স্টাডিজ- ফিক্বহ, আক্বাঈদ, সীরাহ, ইসলামের ইতিহাস, আদাব ও আখলাক্ব সংক্রান্ত বই। এখানে বয়স অনুপাতে তাদের জন্য আসবাক্ব বা পাঠ নির্ধারণ করবেন। ৫-৭ এবং ৮-১০ তারপর ১১-১৬ বয়সের ছেলে মেয়েদের বয়স অনুপাতে পাঠ তৈরি করবেন। টার্গেট হবে প্রাইমারী ও হাইস্কুলের ছাত্র/ছাত্রী।

ক্বায়দা- বাজারে ক্বায়দার অভাব নেই। তবে আপনি এমন একটি ক্বায়দা নির্বাচিত করবেন যাতে তারা লিখাসহ পড়ার সুযোগ পাবে। সাথে থাকবে শিক্ষকদের জন্য পাঠ নির্দেশিকা। উন্নত মানের ছাপা হতে হবে। পাশে যে ক্বায়দার শেষে মসনুন দোয়াসহ কালিমা সমূহ আছে তা নেয়া ভাল। অথবা দোয়া ও কালিমা সমূহের জন্য আলাদা বই নিতে পারেন। লন্ডনে সাফার একাডেমির ক্বায়দা যেমন চলে তেমনি আমার লিখিত একটি ক্বায়দাও বেশ কার্যকর।

যুজ আম্মা/কোরআন মজীদ- ছাত্র/ছাত্রী ভাল করে ক্বায়দা শেষ করলে আম্মাপারা বা যুজ আম্মা পড়বে। প্রথম সবক হবে সুরা ফাতিহার পর সুরা ফীল থেকে নাস পর্যন্ত। তারপর সুরা জোহা থেকে হুমাজাহ পর্যন্ত। অত:পর সুরা নাবা থেকে সুরা লাইল এভাবে পড়াবেন।

মুখস্থ বা মাশক্ব- মাশক্ব হলো খুবই জরুরী বিষয়। মাশক্বের উপর ছাত্রদের তিলাওয়াতের সৌন্দর্য নির্ভর করে। নামাজের তাসবিহাত, কালিমা সমূহ, মাসনুন দোয়া, এবং ধাপে ধাপে পুরা যুজ আম্মা মুখস্থ করাবেন।

আরবি ভাষা- ছাত্র/ছাত্রীদের আরবি ভাষা শিখানোর প্রচলন শুরু করতে হবে। নাহু সরফের প্রয়োজন নেই। কোরআনিক শব্দগুলোর অর্থের সাথে পরিচিতি লাভের জন্য আমরা কালিমা সমূহ, ১০টি হাদীস এবং শেষ দশটি সুরা অর্থসহ মুখস্থ করাই। আর ইহা বেশ ফায়দাকর। প্রয়োজনে আবুতাহের মিসবাহ সাহেবের আরবি বই ফলো করবেন।

আপনাকে মার্কেট ঘুরে ঘুরে যাচাই বাছাই করে বই সিলেকশন করতে হবে। বই সিলেকশন শেষে পাঠের টার্গেট বা আসবাক নির্ধারণ করতে হবে। প্রয়োজেন নিজে বসে বসে কম্পিউটার করে বিভিন্ন বই ঘাটাঘাটি করে আপনরার পছন্দের পাঠ রেডি করুন।

মনে রাখবেন এইসব ক্লাসের শিক্ষক যারা হবেন তারা সহীহ শুদ্ধ করে শুধু কোরআন তিলাওয়াত জানলে হবেনা, জানতে হবে বিশুদ্ধ বাংলা, ও সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতির উপর অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। শিক্ষকদের জন্য ইংরেজী জানাও জরুরি। কারণ ভাল ভাল সোর্স আজকাল ইউটিউব ও গুগলে ইংরেজীতে থাকে। তো সেখান থেকে ফায়দা হাসিলের জন্য এবং স্কুলের ছাত্র/ছাত্রীদের উপর প্রভাব ফেলতে তা খুবই জরুরী।

সাপ্তাহিক ক্লাসের সময় বন্টন- প্রতি সপ্তাহে আফটার স্কুল ২ঘন্টা করে ১০ ঘন্টা। অর্থাৎ বিকাল ৫-৭টা। রবি থেকে বৃহস্পতি। অথবা ৪দিন করলে হবে আট ঘন্টা। রবি থেকে বুধ।

প্রচারপত্র:

প্রথমে সুন্দর করে পরিকল্পনা সহ একটি লিফলেট করুন। দু একটা বেনার লটকিয়ে দিন। কন্টাক্ট নাম্বার দিন। বিষয়টা ভাল করে বুঝিয়ে বলুন।

প্রাতিষ্ঠানিক ডকুমেন্ট: যেমন ভর্তি ফরম, ভর্তি ফিস, মাসিক ফিস, নীতিমালা, সবকিছু কম্পিউটারাইজ করে রাখবেন। শিক্ষক নিয়োগ ফরম ও নীতিমালা সবই রাখবেন। বিভিন্ন ব্যানার ফেস্টুন বাংলা আরবি ইংরেজীতে তেরী করে ডিসপ্লে করবেন।

ফিস এমন ভাবে করবেন যাতে অভিভাবকগণ বহন করে নিতে পারেন। ব্যবসায়িক নিয়ত না করে উম্মাহর প্রজন্মদের হেফাজতের নিয়তে ফিস চার্জ্য করবেন। যাতে পরিচালনার খরচ চলে আসে। রিসিট ভাউচার রাখবেন। শুরুতে হয়তো দানশীলদের দান খয়রাত দিয়েও হতে পারে। আগে আপনাকে অভিভাবকদের আকৃষ্ট করতে হবে।

ক্লাস রুটিন: প্রথম ৪৫ মিনিট ক্বায়দা/কোরআন মজীদ। পরবর্তি ৩০ মিনিট মাশক্ব বা মুখস্থ করানো। পরবর্তি ৪৫ মিনিটের ক্লাস হবে ইসলামিক স্টাডিজ তথা ফিক্বহ ও আক্বাঈদের। দুই ঘন্টা সমাপ্ত।

এভাবে চলবে চারদিন। ৫ম দিন শুধু শেষের ৪৫ মিনিট রাখবেন আরবি ভাষা শিখার ক্লাস হিসাবে। এটা চুড়ান্ত কোনো ফায়সালা না। আপনি স্থান কাল পাত্র ভেদে সময়োপযুগি সিলেবাস বা ক্লাস রুটিন প্রণয়ন করবেন।

শিশুদের অভিভাবকগণ এনে দিবেন এবং আবার নিয়ে যাবেন। তাদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন।

প্রয়োজনে নিজস্ব বেগ বেজ বা পরিচয় কার্ড বানাবেন। ইউনিফর্মের বিষয়ে খুব কড়া কড়িতে যাবেন না। মেয়েরা যেনো মাথা ঢেকে রাখে। বোরকা পরলে ফাবিহা ও নায়ীমা। ছেলেরা যেনো হাফপেন্ট পরে না আসে। সাবলিল ভদ্র পোষাক পরে আসতে বলে দিবেন। বিলেতে তো লম্বা তুব ও টুপি ছেলেদের জন্য আর মেয়েদের জন্য বোরকার ইউনিফর্ম চালু আছে। তারপরও আপনারা ভাব বুঝে ব্যবস্থা নিবেন। যেনো একটা শিশু বোরকা কিংবা তুব না পরার কারণে দ্বীনের জ্ঞান থেকে বঞ্চিত না হয়।

স্কুলের কার্যক্রমের সাথে মিল রেখে একাডেমিক কেলেন্ডর তৈরি করবেন।

বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে যেমন মোহাররাম ও আশুরা, সীরাতুন্নবী, মীরাজ রামাদান, ঈদুল ফিতর ঈদুল আজহা এমন দিন সামনে রেখে লিখা কালারিং প্রতিযোগিতা বক্তৃতা প্রবন্ধ লিখার আয়োজন করবেন।

অবশ্যই ৭ বছরের উপরের মেয়েদের জন্য মহিলা শিক্ষিকা রাখবেন। আর শিশু ক্লাসের জন্য মহিলা শিক্ষিকা খুবই উপযুগী।

শহরে যারা মাদরাসা পরিচালনা করেন তাদের জন্য ইহা একটি মহা সুযোগ। সাধারণ পাবলিককে কাছে নিয়ে আসার।

আবারও বলর্ছি আয়োজনটা যেনো মান সম্মত হয়। স্বাস্থ্য সম্মত হয়। পরিচ্ছন্ন হয়। আমাদের সাধারণ ভাবে মাদরাসা পরিচালনা ও পাঠদানের মতো তা করলে বদনাম ছাড়া কোনো উপকার হবেনা। তাই খুব ভেবে চিন্তে করবেন।

আজকের মতো এখানেই রাখছি।

লেখার সূত্র : 

সম্পাদকের মন্তব্য : সুন্দর পরিকল্পনা। আমাদের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এগিয়ে আসা উচিত। 

About WaytoJannah

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Solve : *
23 − 18 =