সলাত

জামাতের আর ১৫ মিনিট বাকি

আমরা সকল ভালো কাজে এগিয়ে থাকতে চাই। শয়তান আমাদের পিছিয়ে দিতে চায়। এই যে নামায; ঈমানের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল। এক্ষেত্রে এগিয়ে থাকার চেষ্টা করি আমরা। আর শয়তান চেষ্টা করে আমাদেরকে এ আমলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে পিছিয়ে দিতে।
মাসবূক শব্দটি আমরা শুনেছি। মাসবূক শব্দের অর্থ- যে পিছে পড়ে গেছে। যে জামাতের নামাযে পিছে পড়েছে। আর এ হাদীসও আমরা শুনে থাকবো- ‘কিয়ামতের দিন সর্ব প্রথম হিসাব হবে নামাযের।’
এবার একটু ভাবি; কিয়ামতের দিন যে আমলের হিসাব হবে সবার আগে, সে আমলের ক্ষেত্রে কি আমি পিছিয়ে থাকবো? এ হতে পারে না!

জামাতের আর ১৫ মিনিট বাকি। এমন বাক্য সচরাচর আমরা শুনি না। হাঁ, সাহরির আর ১৫ মিনিট বাকি- এ কথা শুনেছি। রমযান মাসে এ কথা শোনার সাথে সাথে সকলে নড়েচড়ে বসে, দ্রুত সাহরি খেয়ে নেয়। কারণ এখন দেরি করলে আর সাহরি খেতে পারবে না। তেমনি জামাতের আর ১৫ মিনিট বাকি- এ বাক্য দ্বারাও উদ্দেশ্য হল, এখন নামাযের প্রস্তুতি নিতে হবে, দ্রুত মসজিদে রওয়ানা হতে হবে। এখন সব কাজ বাদ।
জামাতের সময় যত নিকটবর্তী হয়, শয়তান আমাদের কাজে আরো মনোযোগ বসিয়ে দেয়। বিভিন্ন কাজের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়; অমুক কাজটা সেরে নাও, এখনো জামাতের বেশ বাকি। আরও এক পৃষ্ঠা পড়া বাকি আছে, এটা শেষ করেই মসজিদে যাবে, এখনো এত মিনিট বাকি। ওযু করতে তো মাত্র দুই মিনিট সময় লাগবে। শয়তান হিসাব মিলিয়ে দেয়- দুই মিনিটে ওযু আর তিন মিনিটে মসজিদে চলে যেতে পারবে এবং তাকবীরে উলার সাথে জামাত আদায় করতে পারবে। অবশেষে কী হয়?
পাঁচ মিনিট আগে আর ওঠা হয় না। উঠতে উঠতে দেখা যায় জামাতের আর মাত্র তিন মিনিট বাকি। বাথরুমে গিয়ে দেখা যায় ভেতরে কেউ রয়েছে। ওযু খানায় ভিড়। সব মিলিয়ে ফলাফল- দুই রাকাত মাসবূক।
এ থেকে বাঁচার জন্য একটি পদ্ধতি অবলম্বন করা যায়- জামাতের ১৫ মিনিট আগে সব কাজ বন্ধ করে নামাযের প্রস্তুতি নেওয়া। তাহলে ওযুখানা বা বাথরুমে ভিড় হলেও তাকবীরে উলা পাওয়া যাবে, বাসায় পানি না থাকলেও মসজিদে গিয়ে ওযু করা যাবে। আর যদি আগ থেকে ওযু থাকে তাহলেও ১৫ মিনিট আগেই মসজিদে যাওয়ার এহতেমাম করি। মোটকথা নামাযের ১৫ মিনিট আছে তো সব কাজ বাদ, এবার মসজিদে।
শয়তান একটা ধোঁকায় ফেলতে পারে; ওযু তো আছেই, পাঁচ মিনিট আগে গেলেই চলবে, হাতের কাজটা আরেকটু এগিয়ে নাও। না, ও কথা শুনবো না। তাহলে দেখা যাবে পাঁচ মিনিটের জায়গায় দুই মিনিট আগে ওঠা হচ্ছে আর তাকবীরে উলা ছুটে যাচ্ছে অথবা মাসবুক হচ্ছি। সাথে সাথে আমি আরো বেশ কিছু ফযীলত থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। আমি যদি একটু আগে মসজিদে যেতে পারি তাহলে আমি-
১. তাকবীরে উলার সাথে জামাত আদায় করতে পারবো
আনাস রা. থেকে বর্ণিত, যে ব্যক্তি চল্লিশ দিন তাকবীরে উলার সাথে নামায আদায় করবে তার জন্য দু’টি মুক্তির পরওয়ানা লেখা হবে; এক. জাহান্নাম থেকে মুক্তি, দুই. মুনাফেকী থেকে মুক্তি। -জামে তিরমিযী, হাদীস২৪১
২. মাসবুক হওয়া থেকে বাঁচতে পারবো
কিয়ামতের দিন যে আমলের হিসাব হবে সবার আগে সে আমলে আমি এগিয়ে থাকতে পারবো।
৩. সুন্দর মতো সুন্নাতে রাতেবা আদায় করতে পারবো
উম্মুলমু’মিনীন উম্মে হাবীবা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি প্রতিদিন ১২ রাকাত (ফজরের আগে দুই রাকাত, যোহরের আগে চার রাকাত, পরে দুই রাকাত, মাগরিবের পর দুই রাকাত, এশার পর দুই রাকাত) সুন্নত আদায় করবে তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর বানানো হবে। (বর্ণনাকারী উম্মে হাবীবা রা. ও আরেক বর্ণনাকারী আম্র রাহ. বলেন, আমি এই ফযীলত শোনার পর থেকে এ নামায নিয়মিত আদায় করি।) -সহীহ মুসলিম, হাদীস৭২৮
৪. তাহিয়্যাতুল মাসজিদ আদায় করতে পারবো
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখনই কেউ মসজিদে প্রবেশ করে, দুই রাকাত নামায আদায় করা ছাড়া যেন না বসে। -সহীহ বুখারী, হাদীস ১১৭১
৫. প্রথম কাতারে বা অগ্রবর্তী কাতারে নামায আদায় করতে পারবো
হাদীসে এসেছে, অগ্রবর্তী কাতারের উপর আল্লাহ তাআলা রহমত বর্ষণ করেন, ফিরিশতারা তাদের জন্য রহমতের দুআ করতে থাকে। -সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস৯৯৭
আরেক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, লোকেরা যদি আযান দেওয়া ও প্রথম কাতারের ফযীলত জানত এবং লটারি করা ছাড়া তা লাভ করা যেত না, তাহলে লটারি করে হলেও তা লাভ করার জন্য সচেষ্ট হত। -সহীহ বুখারী, হাদীস৬১৫
৬. নামাযের অপেক্ষায় বসে থাকার কারণে নামাযের সওয়াব লাভ করবো, ফিরিশতাদের দুআ পাবো
নবীজী বলেন, বান্দা যতক্ষণ ওযুসহ নামাযের অপেক্ষায় মসজিদে বসে থাকে ততক্ষণ সে নামাযে আছে বলে গণ্য হয়। ফিরিশতারা তার জন্য দুআ করে; হে আল্লাহ আপনি তাকে মাফ করে দিন, তার প্রতি দয়া করুন। -সহীহ মুসলিম, হাদীস৬৪৯
৭. সুন্নত বা তাহিয়্যাতুল মসজিদ আদায় করার পর সময় থাকলে তিলাওয়াত, জিকির বা দুআ করতে পারবো
পড়াশুনা বা অন্য ব্যস্ততায় অনেক সময় প্রতিদিনের নির্দিষ্ট পরিমাণ কুরআন তিলাওয়াত হয়ে ওঠে না। আমি যদি আগে আগে মসজিদে যাওয়ার এহতেমাম করি, তাহলে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের আগে পাঁচ মিনিট করে তিলাওয়াত করতে পারলেও কমপক্ষে আমার এক পারা তিলাওয়াত হয়ে যাবে। হাফেযগণ এ পদ্ধতিতে তাদের ন্যূনতম তিলাওয়াতের পরিমাণ আদায় করতে পারবেন।
নিজে আমল করি, অন্যকেও সহায়তা করি
মুসলিম তার ভাইয়ের কল্যাণ কামনা করে। আমার আরেক ভাইও যাতে তাকবীরে উলা পেয়ে যায় সে জন্য আমি নিজে আমল করার সাথে সাথে অন্য ভাইকেও আওয়ায দিই- ভাই জামাতের আর ১৫ মিনিট বাকি। তাহলে তার তাকবীরে উলার ছাওয়াবের অংশ আমিও পেয়ে যাবো। সাথে সাথে অন্যকে আহ্বান করলে আমার নিজের আমলের গুরুত্ব বাড়বে। আল্লাহ আমলের তাওফিক দান করুন। কিয়ামতের দিন যে আমলের হিসাব নেয়া হবে সবার আগে, সে আমলের ক্ষেত্রে আমাকে এগিয়ে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

— আবু আহমাদ

তথ্যসুত্রঃ
[ মাসিক আলকাউসার » যিলকদ ১৪৩৭ . আগস্ট ২০১৬ ]

মতামত দিন

Solve : *
3 + 23 =